Image description

সংস্কার নিয়ে বিএনপি সরকার জনগণের সাথে প্রতারণা করছে। নির্বাচনের আগে জনগণের সাথে তারা যেসব প্রতিশ্রুতি করেছে, এখন তারা সে জায়গা থেকে সরে এসেছে। এভাবে চললে সরকার কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠবে।

রোববার রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা হলে জাতীয় নাগরিক পার্টির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনে বক্তারা এমন কথা বলেছেন।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী সেশনে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন এনসিপির যুগ্ম আহবায়ক এবং সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির সহ-প্রধান সারোয়ার তুষার।

এছাড়া প্যানেলিস্ট হিসেবে আলোচনা করেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক এবং এমপি আব্দুল হান্নান মাসউদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী এবং সমাজবিজ্ঞানী মির্জা হাসান।

আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনের পরেই আমি বলেছি, এটা প্রতারণা ও প্রবঞ্চণার সংসদ। আমি কেন এলাম এই সংসদে এবং কী পেলাম? যে অধ্যাদেশগুলো আইন করলে সরকারের ক্ষমতা বাড়বে, সেগুলোকে তারা আইনে পরিণত করেছে। কিন্তু যেগুলো সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে, সেগুলো তারা ল্যাপস করে বাতিল করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সময়ে ভোট চুরি করে নির্বাচিত বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিনিধিদের সরাতে একটি বিশেষ মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, নির্বাচিত সরকার এসে সেটিকে আইনে পরিণত করেছে। যার মাধ্যমে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই তারা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অপসারণ করতে পারবে। ফলে বিরোধী দলের কাউকে তাদের অপছন্দ হলে তাকে সরিয়ে পছন্দমতো প্রশাসক বসাতে পারবে।

তিনি বলেন, আমাদের কিছু দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও বিএনপির প্রস্তাবনা অনুযায়ী পুলিশ কমিশন হয়েছে। কিন্তু সরকারে গিয়ে এটি বিএনপির পছন্দ হচ্ছে না। তারা গুম কমিশন বাতিল করেছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিএনপিই চাচ্ছিল। কিন্তু সরকারে গিয়ে তা বাতিল করল। সংবিধান সংস্কারের যে কথা এসেছে, সেখান থেকেও বিএনপি সরে গেছে। আমরাও তাহলে নতুন সংবিধানের দাবিতে ফিরে যাব।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, ১৯৯১ সালে রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে যেসব সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে তার একটিও বাস্তবায়ন করেনি। ২৪’র অভ্যুত্থানের পর কী ফল হলো? আমরা একটা প্রতারণামূলক দলের সাথে আমরা কাজ করছি। যারা প্রথম থেকে ম্যাটিকুলাসলি প্ল্যান করেছে যেন অভ্যুত্থানের পর আমরা যে স্বপ্ন দেখেছি, তা ভেস্তে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের এলিট, সিভিল-মিলিটারি-বুরোক্রেসি ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। সেকারণে তারা সংস্কারকে ভণ্ডুল করেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে দাড়িয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, কানাডায় যদি কোনো মন্ত্রী এরকম মিথ্যা কথা বলত, তাকে সেদিনই পদত্যাগ দিতে হতো।

তিনি বলেন, নির্বাচনে দুমাসও যায়নি। এরমধ্যে আমাদের আলোচনা করতে হচ্ছে। জুলাই সনদে ও অধ্যাদেশে রেখে যাওয়া গুম, মানবাধিকার, দুদক, বিচার বিভাগসহ একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাতিল করছে সরকার। কাউন্সিল গঠন করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। যার ফলে প্রতিষ্ঠান স্বাধীন থেকে নির্বাহী বিভাগের বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারবে। কিন্তু সেটিও হয়নি। এগুলো না হলে প্রধানমন্ত্রী কতৃত্ববাদী হয়ে উঠবে। ফলে সরকারকে জুলাই সনদ ও গণভেট মানতে হবে। তা না হলে তারা হাসিনার সরকারের দিকেই ফিরে যাবে।

সমাজবিজ্ঞানী মির্জা হাসান বলেন, জুলাই সনদে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য বিষয়। যার মূল কথা হলো রাষ্ট্রের যে প্রধান তিনটি অঙ্গ রয়েছে তথা বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ঠিক রাখা।

তিনি বলেন, সাংবিধান সংস্কার কমিটির প্রথমদিকে যে কথা বলেছে, তার অনেককিছু র‍্যাডিকেল ছিল। বিশেষ একই ব্যক্তি সরকার প্রধান এবং দলের প্রধান হতে পারবে না। সেখানে বিএনপি চাপ তৈরি করার কারণে কম্প্রমাইজ করা হয়েছে। এরপরও যেটি রক্ষা হয়েছে, সেটিও অনেক বড় অর্জন ছিল। সেটাও যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারতাম!

তিনি আরো বলেন, সুশীল সমাজ বলেছে, এই সনদের সাথে মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এটি ভ্রান্ত ধারণা। কারণ, ঐক্যমত কমিশনে আসার জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছে, জরিপ করা হয়েছে। সমালোচনা রয়েছে যে, মানুষ গণভোটে না বুঝে ভোট দিয়েছে। কিন্তু দেখবেন, ব্রেক্সিট যখন হলো, তখন একটি জটিল রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল। ১৯৯১ সালের গণভোটে সংবিধান থেকে একটি লাইন তুলে দেওয়া হয়েছে; যেটার জন্য সংবিধান সম্পর্কে জানতে হবে। ফলে মানুষ নিজেদের মতো করে বুঝতে পারে। তাদেরকে সম্মান করতে হবে। তাদের মতো করে তারা বোঝে।

আরেকটা কথা বলা হয়, আইন করে লাভ নেই, মানুষকে ভালো হতে হবে। এটা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য। কারণ মানুষ ফেরেস্তা না। ফলে তার হাত-পা বেধে দিতে হবে। এটাই সনদের মূলকথা।-যোগ করেন তিনি।

সরোয়ার তুষার বলেন, বিএনপি সরকার সংস্কার করতে চায় না। অনেকে এতদিন তাদের একটি ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রথম অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর এটা পরিষ্কার যে, বিএনপি সরকার আর সংস্কার করবে না। শুধু তাই নয়, দলীয় ও নির্বাচনী ইশতেহারে যে সংস্কারের কথা তারা বলেছে, সেখানে ফেরাও বিএনপির পক্ষে সম্ভব না। তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ইতেমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলসহ সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের মাধ্যমে তারা তা ভঙ্গ করেছে।

তিনি বলেন, একটা যুক্তি অনেকে দেন যে, আমাদের সরকার, তাই আমরা সব জায়গায় আমাদের লোক বসাব। কিন্তু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে আপনি দলীয় লেক বসাতে পারেন না। সব জায়গায় বিএনপি দলীয় লোক বসালেও রাষ্ট্রপতি বানানোর মতো একটি লোক বিএনপিতে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত এবং ইতোমধ্যে তিনি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন বলে বিএনপির লোকেরাই বলছেন। সংস্কার বাস্তবায়ন করা আমাদের দায়িত্ব এবং বিএনপি সংস্কার বাস্তবায়ন না করলে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সেশনের সভাপতি আখতার হোসেন বলেন, ক্ষমতায় বাহানায় বিএনপি সরকার আর সংস্কার করতে চায় না। তারা ক্ষমতা নিরঙ্কুশ উপভোগ করতে চায়৷ বিএনপি বারবার নেট অব ডিসেন্টের কথা বলছে। অথচ, ঐক্যমত কমিশনে বিষয়টি এমনভাবে এসেছে যে, মূল বিষয়ে সবাই একমত। কারও ভিন্ন কোনো মত থাকলে তা পাশে উল্লেখ করবে। অর্থাৎ নোট অব ডিসেন্ট মুখ্য নয়। তাছাড়া গণভোটের পর বিএনপির রাজি-না রাজি আর কোনো মুখ্য বিষয়ই নয়।

তিনি বলেন, বিএনপি বলেছে, চারটি প্রশ্নে আধাটায় তাদের আপত্তি। গণভেটের কোন আধাটা বিষয়ে আপনাদের আপত্তি, তা পরিস্কার করতে হবে। কারণ গণভোটের প্রশ্নগুলোতে খুব স্পষ্ট করে বলা ছিল যে একটা উচ্চ কক্ষ হবে ভোটের পিআর অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে নতুন একটা ফর্মুলা অনুযায়ী এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ হবে একটা নিরপেক্ষ বোর্ডের মধ্য দিয়ে। যে বিষয়গুলোতে আমরা সবাই একমত এরকম ৩০টি বিষয় সেখানে উল্লেখ করা ছিল।আর কিছু বিষয় ছিল যেগুলো রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার অনুযায়ী সেগুলোকে বাস্তবায়ন করতে পারতো।

তিনি আরো বলেন, এখানে আপনাদের আপত্তি কোথায়? তাহলে কি সংস্কারগুলো বিএনপি দেশের জন্য নেতিবাচক মনে করে? আমরা যে সাংবিধান বিষয়ে সংস্কারগুলোর কথা বলেছি, সেগুলো বেসিক স্ট্রাকচারকে লঙ্ঘন করে। তখনই প্রশ্ন এসেছিল, কেবল সংশোধন করে কী বিষয়টাকে টেকসই করা সম্ভব? তখন সংসদের মাধ্যমে সংশোধনী আর গণপরিষদের মাধ্যমে নতুন সংবিধান এর মাঝামাঝি একটা আইডিয়ার ব্যাপারে আমরা একমত হই, সেটাই ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ। কিন্তু বিএনপি এখন সেটা থেকে দূরে সরে এসেছে।

গণভোটের জনগণের রায়কে অমর্যাদা না করার আহবান জানিয়েছেন তিনি। সেশনটি মডারেট করেন জাতীয় নারীশক্তির আহবায়ক মনিরা শারমিন।