বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে “জাতীয় প্রতিবন্ধী নাগরিক শক্তি”। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর সমর্থনে সংগঠনটি দেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবে।
শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরি হলে “জাতীয় প্রতিবন্ধী নাগরিক শক্তি”-এর আত্মপ্রকাশ এবং “আগামী বাজেটে প্রতিবন্ধী নাগরিকের প্রত্যাশা” শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন।
এনসিপি’র পক্ষ থেকে ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক সামান্তা শারমিন, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক নাভিদ নওরোজ শাহ্ এবং এনসিপি’র ছায়া-বাজেট প্রণয়ন কমিটির উপ-প্রধান আবদুল্লাহ আল ফয়সাল।
সভায় বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রতিবন্ধী নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে শুধুমাত্র দান-অনুদানের দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে রাষ্ট্র ও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে সংগঠনের প্রস্তাবিত কমিটি ঘোষণা করা হয়। প্রস্তাবিত কমিটিতে রয়েছেন—
১। ইফতেখার মাহমুদ — আহ্বায়ক
২। মো. সাইফুল হক — যুগ্ম আহ্বায়ক
৩। বাপ্পি সরকার — সদস্য সচিব
৪। মোছা. চেনবানু — যুগ্ম সদস্য সচিব
৫। আমজাদ হোসেন — সদস্য
৬। মতিউর রহমান হৃদয় — সদস্য
৭। মো. জহিরুল ইসলাম — সদস্য
সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে—
১। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাংবিধানিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার ভূমিকা পালন করা।
২। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখা।
৩। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
৪। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পর্কে সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন করা।
৫। সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য, বঞ্চনা ও নেতিবাচক মানসিকতার বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলা।
৬। দেশ ও সমাজ পুনর্গঠনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সক্রিয় ও দৃশ্যমান অবদান নিশ্চিত করা।
৭। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নেতৃত্ব বিকাশ, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক দক্ষতা উন্নয়নে কার্যক্রম পরিচালনা করা।
৮। নারী, শিশু ও প্রান্তিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিশেষ অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করা।
৯। প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো, পরিবহন, প্রযুক্তি ও সরকারি সেবায় প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের দাবিতে কাজ করা।
১০। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক আইন, নীতি ও আন্তর্জাতিক সনদের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও তদারকিতে ভূমিকা রাখা।
১১। একটি বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা।
আলোচনা সভা থেকে আগামী জাতীয় বাজেট ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্য ১১ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। দাবিসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
১। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভাতা ২৫০০ টাকা করা এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিবন্ধিতার মাত্রা ভিত্তিক হার নির্ধারন করা।
২। প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদেরকে সহজ শর্তে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যংকে ১০০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করা।
৩। নারী উদ্যোক্তাদের ৭০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত কর ছাড়া ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ভেট ছাড়ের বিধানে প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদেরকে যুক্ত করা।
৪। জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযোগী জরুরী সহায়ক উপকরণের তালিকার ওপর আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা।
৫। মেহনতি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিশেষশত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, হকার, অটোচালকদের পূনর্বাসন ব্যাতীত উচ্ছেদ অবিলম্বে বন্ধ করা এবং তাদের পূনর্বাসনের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা।
৬। বেসরকারি খাতে ৩ শতাংশ নিয়োগ দিলে ২ শতাংশ কর ছাড়ের বিধানটি বাধ্যতামূলক করে শূন্যপদের বেতন সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে সেই অর্থে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়ক উপকরণ, বেকার ভাতা ও অন্যান্য সহায়তামূলক কাজে অর্থায়ন করা।
৭। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পিপিপি (PPP) পদ্ধতির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত প্রকল্পে ৫০০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করা।
৮। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থীদের বয়স সীমা ৩৪ করা এবং ৩ শতাংশ কোটা নির্ধারন করা।
৯। সরকারি চাকরিতে প্রতি দুই বছর পর পর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী পদ চিহ্নিত করে বিশেষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগের ব্যবস্থা করা।
১০। ট্রেনে ভাড়া ৫০ শতাংশ ছাড় বহাল রেখে মেট্রোসহ সকল গণপরিবহনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫০ শতাংশ ছাড় নিশ্চিত করা এবং অনলাইনে টিকিট কাটার ক্ষেত্রে ছাড়াের বিধান রাখা।
১১। সংসদে প্রতিবন্ধী নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আসন সংরক্ষণ করা।
বক্তারা আরও বলেন, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব বিকাশ এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের মাধ্যমেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
সভা শেষে সংগঠনের পক্ষ থেকে দেশের সকল প্রতিবন্ধী নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অধিকারভিত্তিক রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।