বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন ঘিরে দলের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা তুঙ্গে। এখন মূল বিতর্ক—কমিশন গঠন না প্রচলিত কাউন্সিল বা সিলেকশন পদ্ধতি, সিন্ডিকেট না মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব, ব্যর্থতার জবাবদিহি নাকি নতুনভাবে শুরু—কোন পদ্ধতিতে হবে নেতৃত্ব নির্বাচন? বিষয়টি নিয়ে দ্বিধায় বিএনপি।
তবে সব পক্ষের অভিন্ন দাবি— একটি সিন্ডিকেটমুক্ত, গ্রহণযোগ্য, শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা, সংগঠনগুলোর ভেতরে নেতৃত্ব নির্বাচন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটাতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি তুলেছে সংশ্লিষ্টদের বড় একটি অংশ। তাদের মতে, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ছাড়া কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব গঠন সম্ভব নয়। আবার আরেকটি অংশ এখনো আদি পদ্ধতি সিলেকশনের পক্ষেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের সাবেক এক সভাপতি বলেন, ৯০ দশকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যে গ্রহণযোগ্যতা সর্ব মহলে ছিল, তা ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়েছে। বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদল ক্যাম্পাসমুখী হতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের করুণ পরিণতির গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। জবাবদিহিতা দরকার।
আমাদের দরকার বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্রদলকে নিয়ে যে অপপ্রচার চলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার ও কাউন্টার ন্যারেটিভ দিতে সক্ষম ছাত্রনেতা। যে কারণেই হোক না কেন বাস্তবতা হলো ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আমরা হেরেছি। শিক্ষার্থীদের সমর্থন পুনরুদ্ধারে আন্দোলন সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল অতীতের পাশাপাশি মেধাবী, সৃজনশীল ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব হাইকমান্ড বেছে নেবে বলে মনে করি।-ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান
যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দলের আগের সেই আবেদন নেই জানিয়ে বলেন, বিএনপির প্রধান তিন সংগঠনের ঐতিহ্য ম্লান হয়েছে। তিন সংগঠন পুনর্গঠনের আগে একটি কমিশন গঠন হওয়া উচিত। কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংগঠন পুনর্গঠন হোক। সংগঠন শক্তিশালী না হলে সরকার বিপদে পড়লে আওয়ামী লীগের মতো করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে।
তিন অঙ্গ সংগঠন যে অবস্থায় আছে
ছাত্রদল
২০২৪ সালে মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাসির উদ্দিন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠিত হয়। সাধারণত দুই বছর মেয়াদি এ কমিটির মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবক দল
৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখ এস এম জিলানীকে সভাপতি ও রাজিব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে তিন বছর মেয়াদি (ত্রিবার্ষিক) কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে।
যুবদল
১০ জুলাই ২০২৪ তারিখে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি ও নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এ কমিটি এখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি।
কেন কমিশন গঠনের দাবি
দাবির পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে অনেক জেলা কমিটি স্থবির হয়ে আছে। নেতৃত্ব নির্বাচনে আছে ‘সিন্ডিকেট’ প্রভাবের অভিযোগ। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি তৃণমূলের কর্মীদের মূল্যায়ন না হওয়া এবং সাংগঠনিক জবাবদিহির ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে।
রয়েছে ভিন্নমত
তবে কমিশন গঠনের বিষয়ে সবাই একমত নন। ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাছির জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের কমিটির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ২০১৯ সালের কাউন্সিলে কাউন্সিলররা এ সংগঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার একক এখতিয়ার দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেওয়া হয়েছে। তিনি চাইলে যে কোনো সময় কমিটি হবে। আমরা সে সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছি।’
কমিশন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা নিষ্প্রয়োজন। এটা হলে সংগঠনের ঐতিহ্য থাকে না। দুভাবে আমাদের কমিটি হয়। একটা হচ্ছে কাউন্সিল, আরেকটা সিলেকশন। এই দুই প্রক্রিয়ার যে কোনো এক প্রক্রিয়ায় কমিটি হলেই আমি মনে করি শক্তিশালী হবে সংগঠন।
নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে নানা মত
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভয়াবহ দমন নিপীড়নের মধ্যেও বুক চিতিয়ে লড়াই করা সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এমনকি জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও সবচেয়ে বেশি শহীদের সংগঠন, সবচেয়ে বেশি জুলুমের শিকার হওয়া সংগঠন।’
‘আমাদের দরকার বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্রদলকে নিয়ে যে অপপ্রচার চলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার ও কাউন্টার ন্যারেটিভ দিতে সক্ষম ছাত্রনেতা। যে কারণেই হোক না কেন বাস্তবতা হলো ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আমরা হেরেছি। শিক্ষার্থীদের সমর্থন পুনরুদ্ধারে আন্দোলন সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল অতীতের পাশাপাশি মেধাবী, সৃজনশীল ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব হাইকমান্ড বেছে নেবে বলে মনে করি’-বলেন আমান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে দুই মাস আগে। বর্তমান কমিটি কলেজ ইউনিভার্সিটিসহ কিছু কমিটি দিতে পারলেও অধিকাংশ জেলা কমিটি দিতে পারেনি। ফলে অধিকাংশ জেলায় পাঁচ থেকে আট বছরের কমিটি বিদ্যমান।
অধিকাংশ জেলায় দীর্ঘদিনের পরিশ্রমী ও আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত অনেকে পদবঞ্চিত দাবি করে বলেন, ছাত্রদলের স্বার্থে আরও একটি কমিটি সিনিয়র থেকে হওয়া উচিত। কিন্তু একটা সিন্ডিকেট চাচ্ছে বর্তমান কমিটির মাধ্যমে কিছু জেলা কমিটি দিয়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে নিজেদের বলয়ে এই কমিটি নিতে। নিজেদের দেওয়া কমিটির মাধ্যমে কাউন্সিল হলে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ছাত্রদলের কমিটি কুক্ষিগত করা যায়।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলো সুনির্দিষ্ট ঘোষণাপত্র, গঠনতন্ত্র অনুসরণ করেই দলগুলো প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালিত হয়ে আসছে। ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র সময় উপযোগী করার জন্য কখনো কখনো সংশোধিত হয়েছে। সে কারণে কমিশনের কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করি না।’
বিদ্যমান ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতেই আগামী দিনে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর কমিটি গঠন হবে বলে জানান তিনি।
মহানগর কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক নেতাদের সমালোচনা করে আরেকটি সূত্র জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান নেতৃত্বের ব্যক্তিগত স্বার্থে ঢাকা মহানগরকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। ফলে মহানগর ছাত্রদলের ঐতিহ্য ও যৌবন হারিয়ে গেছে। মহানগরের নেতৃত্ব ও কর্মীদের দাবি ঢাকা মহানগরকে দুই ভাগে ভাগ করে মহানগরের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা।
নেতৃত্বের মানদণ্ড নিয়ে যত মত
ছাত্রদল নেতা শরীফ শুভ বলেন, যারা দেশপ্রেমিক, বাংলাদেশকে ভালোবাসে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে ভূমিকা রাখতে চায়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, সুশাসন চায়—সেরকম সৎ, উদ্যমী, সাহসী, দেশপ্রেমিক ছাত্রদের জন্য ছাত্রদল অপেক্ষা করছে।
ছাত্রদলের সহ-সভাপতি সাফি ইসলাম বলেন, ‘যারা বিগত আন্দোলন সংগ্রামে পরীক্ষিত, সংগঠনকে ধারণ করে—এমন ব্যক্তিত্বদেরই ছাত্রদলের নেতৃত্বে আসা উচিত। সংগঠনের ওপর কাউকে বসিয়ে দিলে সংগঠন সক্রিয় থাকে না।
স্বেচ্ছাসেবক দল নেতারা যা বলছেন
স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান বলেন, আমাদের অভিভাবক বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংগঠনের যাকে দায়িত্ব দেবেন, সংগঠনের প্রতিটি নেতাকর্মী সেটি মেনে নেবেন।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, গত ১৭ বছরের আন্দোলনে যাদের সাহসী ভূমিকা ছিল, আমাদের চেয়ারম্যান মহোদয় তাদের বিষয়টি বিবেচনা করবেন—এটাই আমাদের বিশ্বাস।
যুবদল নিয়েও আলোচনা
যুবদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হতে এখনো প্রায় এক বছরের কিছু বেশি সময় বাকি। তারপরও সংগঠনটির নেতৃত্বে আসার প্রত্যাশায় এখনই নতুন কমিটি গঠনের দাবি তুলছেন সম্ভাব্য নেতারা।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে ভেতরে ভেতরে আলোচনা জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে যারা পরবর্তী কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে আগ্রহী, তারা এখন থেকেই তৎপরতা বাড়িয়েছেন।
সংগঠনের একটি অংশ বলছে, নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে সংগঠনকে আরও গতিশীল করা সম্ভব হবে। তাদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শক্তিশালী ও কর্মঠ নেতৃত্ব প্রয়োজন, যা নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে আসতে পারে।
তবে আরেকটি অংশ বলছে, নির্ধারিত সময়ের আগেই কমিটি পরিবর্তন করলে সংগঠনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে এবং চলমান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এ বিষয়ে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে চাইছেন না।