বন্ধু মাওলানা সাজিদুর রহমান টঙ্গী এক মসজিদের ইমাম। তার সঙ্গে কখনো-কখনো আমার গল্প হয়। এবার এক গল্প বলে আমাকে চমকে দিলেন।
গল্পটা সাজিদের মুখে শুনে আসি, ২০১৬ সালে বেশ কজন মুসল্লি নিয়ে হজে গেলাম। কাফেলায় মসজিদের সেক্রেটারি ও তার স্ত্রী আছেন। হজের দিনে মিনায় গেলাম। মিনা থেকে মুজদালিফা যাব কঙ্কর নিক্ষেপ করতে। লাখো মানুষ। পথে প্রচণ্ড ভিড়। এর মধ্যে সেক্রেটারি তার স্ত্রীকে হারিয়ে ফেললেন। তিনি তো রীতিমতো কান্না জুড়ে দিলেন। আমরা তাকে কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছিলাম না। গাড়িতে ওঠা তো দূরের কথা, সামনেও যেতে পারছিলাম না।
আমরা তার স্ত্রীকে খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু এভাবে খুঁজে কী আর পাওয়া যায়! এত মানুষ, সবার একরকম পোশাক। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার নারীদের পেছন থেকে ডাক দিয়ে লজ্জিত হয়েছি। এদিকে সেক্রেটারি শিশুর মতো কেঁদে চললেন। বললেন, আমি বউ ছাড়া বাঁচব না হুজুর। প্রায় ৪ ঘণ্টা খোঁজখুজির পর আল্লাহর বান্দিকে পাওয়া গেল। দুজন দুজনকে ধরে এমন কান্না; আমরা যারপরনাই আশ্চর্য হয়েছি।
রাতের খাবার-দাবার সেরে বিছানায় বসে আছি। সেক্রেটারি এলেন। মজার ছলে এটাসেটা বলে তাকে খোঁচাতে লাগলাম। বললেন, হুজুর শুনেন, আমাদের বিয়ে হয়েছে আজ ৪৫ বছর। ৪৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের প্রতিটা রাত আমার সামনে এভাবে আসত, রাত ১১টা বাজতেই আমাদের রুমের দরজা বন্ধ করে দিত সে। প্রতিরাতে সে নিয়ম করে গোসল করত। আলমারিতে যত্নে তুলে রাখা শাড়ি পরত। আমার সন্তানরাও জানে, রাত ১১টার পর তাদের মা আর রুম ছেড়ে বের হবেন না। ৪৫ বছরের জীবনে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। সে বিছানায় এসে আমাকে বলে, সারাদিন আপনার ওপর কত ধকল গেছে, আপনি আরাম করে ঘুমান, আমি আপনার হাত-পা টিপে দিই।
এরপর ধরুন, আমরা কারও বাড়িতে বেড়াতে গেছি, কিংবা বাড়িতে মেহমান, একসঙ্গে থাকা যাচ্ছে না। রাত গভীর হলে সে আমার ঘুমানোর ঘরে আসে, এসেই আমার পা টিপতে শুরু করে। আমি দিশা পেলে বলে, আমি। আপনি ঘুমান। বলেন তো হুজুর, ওরে ছাড়া আমি কেমনে থাকি! ওর জন্য মন পুড়বে না তো কার জন্য পুড়বে!’
আমি কিছুক্ষণ থ হয়ে রইলাম। এ-ও কি সম্ভব! দুনিয়ায় এখনও এমন স্ত্রী আছেন! একটানা এত বছর এক রকম রুটিন পালন করা যায়!
আমাদের প্রিয়নবি মুহাম্মাদ (সা.)-এর চোখে এমন স্বামীপরায়ণ, সচ্চরিত্র ও ভালো নারীই সর্বশ্রেষ্ঠ। সচ্চরিত্র নারীর মতো মূল্যবান সম্পদ পৃথিবীতে আর নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়ার সবকিছুই (তুচ্ছ ও ক্ষণস্থায়ী) ধন-সম্পদ। (এর মধ্যে) মুসলিম সচ্চরিত্র রমণী সর্বশ্রেষ্ঠ ধন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৭)