গত মার্চের শুরুতে, যখন ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন জায়নবাদী লেখক ব্রেট স্টিফেন্স দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে নিয়মিত কলাম লেখেন। তিনি এমন এক ইসরায়েলকে সমর্থন করেন, যারা মানুষকে ধর্ষণের জন্য কুকুরকে প্রশিক্ষণ দেয়। সেখানে তিনি বলেছিলেন, খুব শীঘ্রই ইরান পরাজিত হবে এবং সেই পরাজয়ের পর কী কী অর্জন করা উচিত, তা তুলে ধরেন।
এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত অবসানের পর স্টিফেন্সের সেই বহুল আলোচিত, বিতর্কিত ও বাস্তবতা বিবর্জিত কলামটি আবারও খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
স্টিফেন্স ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সম্ভাব্য বিজয়ের চারটি সম্ভাবনা তুলে ধরেন। প্রথমটি ছিল শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন। তাঁর মতে, ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব আরও দুর্বল হলে এবং শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়লে ক্ষমতার পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া উচিত হবে না।
দ্বিতীয়টি ছিল শাসনব্যবস্থার পরিবর্তিত রূপ। অর্থাৎ, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সেটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবির কাছে নতি স্বীকার করবে। স্টিফেন্স লিখেছিলেন, এই চাপ আরও বাড়বে যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী খার্গ দ্বীপ দখল করে, কারণ ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের টার্মিনালের হিসেবে কাজ করে।
তৃতীয় সম্ভাবনা ছিল দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, যার শেষ পরিণতিতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানকে কার্যত ভেঙে ফেলা। ‘এই তৃতীয় পরিস্থিতি ইঙ্গিত করে যে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলেও তা কার্যত প্রাণহীন বা ‘জম্বি’ রাষ্ট্রের মতো টিকে থাকবে।’
চতুর্থ সম্ভাবনাটি ছিল ‘শাসন পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের পতন।’ তাঁর মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হতে পারতো সিরিয়ার ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধের মতো একটি চিত্র। যেখানে ইরানের সরকার দেশের কিছু অংশে টিকে থাকবে, অন্য অংশে নিয়ন্ত্রণ হারাবে, বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ বাড়বে এবং ভয়াবহ মাত্রায় প্রাণহানি ঘটবে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ামুখী শরণার্থীর ঢল নামবে। তিনি আরও লেখেন, ‘ইসরায়েল হয়তো এমন পরিস্থিতিকে পুরোপুরি খারাপ চোখে দেখবে না। কারণ তাদের মতে, খণ্ড-বিখণ্ড ইরান তখন অন্যদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।’
স্টিফেন্সের নিজস্ব ভাবনা কী? তিনি লেখেন, ‘এখন ট্রাম্প প্রশাসনের কী করা উচিত? আমার পরামর্শ হলো খার্গ দ্বীপ দখল করা, ইরানের অবশিষ্ট বন্দরগুলোতে মাইন পেতে দেওয়া বা অবরোধ করা এবং আগামী এক-দুই সপ্তাহে যতটা সম্ভব ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা। এর মধ্যে ইরানের অবশিষ্ট পারমাণবিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান ধ্বংস করতে ‘মিডনাইট হ্যামার’ ধরনের দ্বিতীয় একটি অভিযানও অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।’
ফারসি ভাষায় একটি প্রবাদ আছে: ‘উট তুলাবীজ খাওয়ার স্বপ্ন দেখে কখনও এক মুঠো করে, কখনও এক এক করে গোগ্রাসে গিলে ফেলে।’
ইরান টিকে রইল
এই জঘন্য কলামটি ইতিহাসে দলিল হিসেবে থেকে যাবে, যা গণহত্যাপ্রবণ মানসিকতার জায়নবাদীদের এক ঐতিহাসিক দলিল। যাদেরকে এই শহরে প্রতি সপ্তাহে বিভ্রমে আক্রান্ত জায়নবাদী চিন্তার প্রতিনিধিদের প্রতি একটি পূর্ণ কলাম দেওয়া হয়, যেখানে তারা অন্য জাতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ান এবং সেটাকেই গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ইসরায়েলের স্বার্থরক্ষার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
এবার বাস্তবতায় ফেরা যাক। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিনের পরের দিন ইসরায়েলের প্ররোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র ইরানের ওপর বোমা হামলায় যোগ দেওয়ার ১০৬ দিন হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ৮০ বছর ধরে ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান ও মিসরে হত্যা, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ভূমি দখলের অভিযোগে অভিযুক্ত ইসরায়েল এবার ইতিহাসের অন্যতম বড় পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে, আর ইরান টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে।
তারা আমেরিকানদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা ও বিচারের বিরুদ্ধে গিয়ে সরল বিশ্বাসী ও দাপুটে ট্রাম্পকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছে। কিন্তু তারপরেও ইসরায়েল তাদের ঘোষণাকৃত প্রায় সব লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তবুও তারা এবং যারা তাদের বর্ণবাদী পতাকা উড়িয়েছিল, তারা এক ঐতিহাসিক পরাজয় বরণ করেছে।
মোসাদ, হাসবারা, আইপ্যাক, অ্যান্টি-ডিফেমেশন লীগ অর্থের প্রভাবে প্রভাবিত মার্কিন রাজনীতিক, ইরানি রাজতন্ত্রপন্থী মিত্র কিংবা হুভার ইনস্টিটিউশনসহ বিভিন্ন থিংক ট্যাংকের সমর্থক সবাই মিলে চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের পরাজয়ের শিকার হয়েছে।
এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ইরান আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। দেশটির সরকার টিকে আছে, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি অর্জনের সার্বভৌম অধিকার বহাল রয়েছে এবং মূল্যবান হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত তার ভৌগোলিক অখণ্ডতাও আগের চেয়ে আরও সুসংহত হয়েছে।
হ্যাঁ, ইসরায়েল ট্রাম্পকে ব্যবহার করে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, জনস্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। মিনাবের একটি স্কুলের নিরীহ শিশুসহ বহু বেসামরিক মানুষও নিহত হয়েছে। কিন্তু এর শেষ পরিণতি কী? ইন্টারনেটে যেমন বানরের হাতে মেশিনগান দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালানোর ভিডিও দেখা যায়, এই কর্মকাণ্ডও তেমনই উদ্দেশ্যহীন ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়া আর কিছু নয়।
ইরানে ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনর্গঠিত হচ্ছে। অন্যদিকে, হামলায় নিহত শিশুদের শোকে এখনও কাতর অনেক পরিবার। তবে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ।
ইরান এই সংকট কাটিয়ে উঠবে এবং দেশটির জনগণ আবারও নিজেদের নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে সংগ্রাম শুরু করবে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের রাজতন্ত্রপন্থী ও ইসরায়েল-সমর্থক থিংক ট্যাঙ্কার এবং ইসরায়েলি প্রতিমার কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন।
গাজায় চলমান গণহত্যা ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখলের ঘটনার পর ইসরায়েল লেবানন ও ইরানেও নতুন করে সামরিক সংঘাতের সূচনা করেছে এবং সরল বিশ্বাসী, ট্রাম্পকে ধোঁকা দিয়ে এই যুদ্ধে যোগ দিতে রাজি করিয়েছেন।
এদিকে বিশ্ব যখন এই সংঘাত পর্যবেক্ষণ করছিল, তখন দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের ইসরায়েল সমর্থক হিসেবে পরিচিত দুই কলামিস্ট থমাস ফ্রিডম্যান ও ব্রেট স্টিফেন্স পরিস্থিতির ব্যাখ্যা ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। তারা এমন একটি বর্ণনা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন যেখানে ইসরায়েলকে তারা ন্যায়সঙ্গত অবস্থানে থাকার পরও তাকে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
ইরানকে ধারাবাহিকভাবে একটি ‘অশুভ রাষ্ট্র’ হিসেবে উপস্থাপন করে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সংবাদ ও মতামতের মাধ্যমে মার্কিন জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে ইরানই মূল সমস্যা, ইসরায়েল ন্যায়সঙ্গত অবস্থানে রয়েছে এবং ট্রাম্পের পদক্ষেপও সঠিক উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
আমেরিকানদের জন্য বিজয়?
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি দেখলে এবং মূলধারার মার্কিন গণমাধ্যম অনুসরণ করলে মনে হবে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একাই এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং পরে শান্তি আলোচনার সময় ইসরায়েলকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রেখেছিলেন। আসলে ঘটনাটি সম্পূর্ণ উল্টো।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান ট্রাম্পকে এই যুদ্ধে সম্পৃক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলই ইরান ও লেবাননে সামরিক হামলা অব্যাহত রাখার পক্ষে সবচেয়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত জনমতের চাপে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন শিথিল করে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে বাধ্য হন। টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ, সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এবং ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির মতো গণহত্যাবাদী জায়নবাদীদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের অপমানেরই সম্মুখীন হতে হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকানোর সময় বিশ্বকে তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। আমেরিকানরা বিপুলভাবে এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। এটি ছিল একটি অবৈধ যুদ্ধ, যার অনুমোদন মার্কিন কংগ্রেস দেয়নি এবং লক্ষ লক্ষ আমেরিকান সক্রিয়ভাবে এর বিরোধিতা করেছিল। সুতরাং এই বিজয়টি একটি ইরানি ও আমেরিকান বিজয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই বিজয় যুদ্ধবিরোধী কর্মী ও বৃহত্তর জনগণের। ইরানে এই বিজয় ইরানি জনগণের এবং গণহত্যার আদর্শে আচ্ছন্ন ইসরায়েলের নৃশংস আগ্রাসন প্রতিরোধের তাদের দৃঢ় সংকল্পের।
একটি বিদ্রোহী জাতির সার্বভৌমত্ব সেই দেশের জনগণের অধিকার এবং তা কোনো অস্থায়ী সরকারের একক সম্পত্তি নয়।
এই যুদ্ধে ইরান কী অর্জন করলো? যুদ্ধের মধ্যেও দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা অটুট রয়েছে। দেশটি ভেঙে পড়েনি বা অস্থিতিশীল হয়ে পড়েনি। ইসরায়েলি ভীতিপ্রদর্শনকারী রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাও কার্যত শেষ হয়ে গেছে।
দেশটির পারমাণবিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি অর্জনের অধিকার অটুট রয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সমালোচনা থাকলেও রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। ইসরায়েলের বিমান হামলার মুখেও ইরান দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে এবং পাল্টা জবাব দিয়েছে।
ইরান ইসরায়েলের ওপর পাল্টা আঘাত হেনেছে, যা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বহু মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও হামলা চালানো হয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন। পরে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধের সিদ্ধান্তের কথাও তুলে ধরা হয়।
এই যুদ্ধ এবং গাজায় চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একের পর এক জরিপে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে ইসরায়েল হল সবচেয়ে ঘৃণিত এক ঔপনিবেশিক সত্তা।
একটি জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘গ্লোবাল কান্ট্রি পারসেপশনস ২০২৬’ শীর্ষক র্যাংকিংয়ে ইসরায়েল সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। ৪৬ হাজার ৬৬৭ জন উত্তরদাতার মতামতের ভিত্তিতে ১২৯টি দেশ এবং তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি বৈশ্বিক জনমত মূল্যায়ন করে এই র্যাংকিং প্রস্তুত করা হয়েছে।
ইরানের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের জনগণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয়। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে যে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার জন্য প্রধানত ইসরাইলকে দায়ী করেছেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি পিউ রিসার্চ সেন্টার জরিপে দেখা গেছে, ইসরাইল ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু সম্পর্কে মার্কিনিদের নেতিবাচক মনোভাব বেড়েছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে।
জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, যা গত বছরের ৫৩ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ৫৯ শতাংশ উত্তরদাতা বিশ্ববিষয়ক ইস্যুতে নেতানিয়াহুর সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার ওপর খুব কম বা কোনো আস্থা প্রকাশ করেননি, যা আগের বছরের ৫২ শতাংশের তুলনায় বেশি। উভয় প্রধান রাজনৈতিক দলের ৫০ বছরের কম বয়সী ভোটারদের মধ্যেও ইসরাইল ও নেতানিয়াহু সম্পর্কে নেতিবাচক মূল্যায়ন সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে।
বিভিন্ন তথ্য প্রমাণে এমন অভিযোগ উঠে এসেছে যে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ পরিচালিত কিছু আটককেন্দ্রে ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষদের ওপর যৌন নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে। তার মতে, এ ধরনের অভিযোগের কিছু দিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমসেও আলোচিত হয়েছে।
ফিলিস্তিন ও ফিলিস্তিনি জনগণ, লেবানন ও লেবাননের জনগণ, এবং ইরান ও ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের জন্য দেশটির একটি ঐতিহাসিক জবাবদিহি হওয়া প্রয়োজন।
ইরানিদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে
তবে এর অর্থ এই নয় যে, এখন ইরানে সব সমস্যা শেষ হয়ে গেছে বা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ইরানিদের এখন শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ইরান বর্তমানে গুরুতর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই দেশটির জনগণ ও নেতৃত্বের সামনে এখন স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করার বড় দায়িত্ব রয়েছে। ইরানিদের প্রতিও জবাবদিহি জরুরি
আমেরিকান অপরিপক্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানিরা এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে আরও উগ্রপন্থি হয়ে ওঠার কারণে নয়, যেমনটি কিছু মার্কিন বিশ্লেষক দাবি করেন, বরং এই যুদ্ধ তাদের মধ্যে গভীরভাবে উপনিবেশবিরোধী জাতীয়তাবোধকে আরও জাগ্রত করেছে।
ইরানিরা ইতিহাসজুড়ে একদিকে বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে।
দেশে ও দেশের বাইরে অবস্থানরত ইরানিদের নিজেদের সরকারের সমালোচনা করার এবং নাগরিক স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার দাবি করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, স্বাধীন গণমাধ্যমের অধিকার, স্বাধীন শ্রমিক ইউনিয়ন, ছাত্রসংগঠন এবং নারী অধিকারভিত্তিক সংগঠন গঠনের অধিকার।
এসব অধিকার ইরানিদের মৌলিক ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার। তবে সেগুলো কার্যকরভাবে অর্জন করা সম্ভব হবে তখনই, যখন দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ন থাকবে, বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না এবং বেসামরিক জনগণ ও অবকাঠামোর ওপর হামলার আশঙ্কা থাকবে না।
ইরানিদের সামনে এখনও দীর্ঘ ও কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একইভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের জনগণের কাছেও নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পরিবর্তনমুখী রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি, সরকার যেই ক্ষমতায় থাকুক না কেন।
- হামিদ দাবাশি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানি স্টাডিজ ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক। মিডল ইস্ট আই থেকে লেখাটি অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম।