Image description

দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত দলীয় কার্যালয়ের তালা খুলে আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা শুরু করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ভাঙচুর ও বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, ব্যানার টানানো এবং সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে উপস্থিতি জানান দেয়া হচ্ছে। তবে কোথাও কোথাও বাধা, ভাঙচুর ও পুলিশি অভিযানের ঘটনাও ঘটছে।

দলীয় সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ তৃণমূল ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীদের সক্রিয় করা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রস্তুতি হিসেবে সীমিত পরিসরে কার্যালয়গুলো সচল করার চেষ্টা চলছে। নিরাপত্তা ও আইনি ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গণমাধ্যমকে জানান, শেখ হাসিনার নির্দেশে ধানমন্ডি ৩২-সহ বিভিন্ন কার্যালয়ে যাতায়াতের কথা বলা হয়েছে। যদিও কেউ কেউ বলছেন, সরাসরি নির্দেশ না থাকলেও সক্রিয় হওয়ার তাগিদ রয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিনই প্রথম পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধানের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একটি কার্যালয়ের তালা খোলেন। এ সংক্রান্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরে আবু দাউদ প্রধান দাবি করেন, সেটি আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় নয়, বরং একটি গুদামঘর।

তিনি আরও বলেন, তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে।

খুলছে অফিসের তালা, ফিরছে আওয়ামী লীগ!

গত রোববার ছয় জেলায় এবং সোমবার চার জেলায় পরিত্যক্ত কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ, জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি টানানোর মাধ্যমে নেতাকর্মীরা উপস্থিতি জানান দেন। এরপর একে একে নোয়াখালী, বরগুনা, কুড়িগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর, হবিগঞ্জ, রাজবাড়ী, চট্টগ্রাম এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুরে কার্যালয়ের তালা খুলে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে আওয়ামী লীগ। কোথাও কোথাও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশও করা হয়। পরে এসব ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে আটক করেছে।

সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় পটুয়াখালীর দশমিনায় উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে ধোয়া-মোছা শেষে দোয়া-মোনাজাত করেন নেতাকর্মীরা। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়ে ভাঙচুর চালিয়ে আবার তালা লাগিয়ে দেন।

দশমিনা উপজেলা ছাত্রলীগের কর্মী সোহাগ জানান, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল মনে হওয়ায় তারা অফিস খুলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার নামে দোয়া ও মোনাজাত করেন। পরে ছাত্রদল ও যুবদলের কর্মীরা এসে ভাঙচুর চালান। এ ঘটনায় পুলিশ অভিযান শুরু করেছে।

সোমবার দুপুরের পর বরগুনার বেতাগী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। সেখানে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙিয়ে আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড লাগানো হয়। তবে রাতে কার্যালয়টি আবার ভাঙচুর করা হয়।

সোমবার বিকেলে খুলনা মহানগরীর শঙ্খ মার্কেটে আওয়ামী লীগ অফিস খুলে প্রবেশ করেন নেতাকর্মীরা। কিছুক্ষণ অবস্থান করে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবিতে মালা দেন এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে আবার তালা লাগিয়ে চলে যান।

মঙ্গলবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত অফিস চালু করা হয়। আগাছায় ভরা ও ভাঙাচোরা অফিস পরিদর্শন শেষে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এম. এ. মনজুর তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘আজ সকাল থেকে আওয়ামী লীগের অফিস পরিষ্কারের কাজ শেষ হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ।’

বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের তালা ভেঙে ব্যানার ঝুলিয়ে দেয় ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা। কিছুক্ষণ পর ব্যানার সরিয়ে নেয়া হয়। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আটক করেছে সুধারাম থানা পুলিশ।

একই দিন বরগুনা জেলা কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শেখ হাসিনার ছবি টানানো হয়। জড়িতদের শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে বলে জানান বরগুনা সদর থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুল আলীম।

খুলছে অফিসের তালা, ফিরছে আওয়ামী লীগ!

কুড়িগ্রাম জেলা কার্যালয়েও জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও ব্যানার টানানোর ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. মাসুদ রানা জানান, পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে পাঁচ কর্মী দলীয় স্লোগান দিয়ে মহানগর কার্যালয়ের সামনে ব্যানার টানান। শরীয়তপুরে পালং বাজারে জেলা কার্যালয় খুলে ছবি টানানোর ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

হবিগঞ্জ জেলা কার্যালয় খোলার কয়েক ঘণ্টা পর সেখানে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা ধোঁয়া দেখে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন।

রাজবাড়ী জেলা কার্যালয়েও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি টানানো হয়। দিনাজপুরের পার্বতীপুরে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে পুলিশ অভিযান চালিয়ে পাঁচ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে।

চট্টগ্রাম মহানগরের নিউমার্কেট এলাকার একটি কার্যালয়ে নামফলক লাগানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি বলে জানান কোতোয়ালি থানার ওসি মো. আফতাব উদ্দিন।

বৃহস্পতিবার ভোরে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে দলীয় ব্যানার টানিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন নেতাকর্মীরা। ভিডিওতে দেখা যায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক সাইফুল ইসলাম তালুকদার সুরুজের নেতৃত্বে ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’ লেখা ব্যানার টানানো হয়।

আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আরটিএনএনকে বলেন, ‘কিছু জায়গায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। সরকার যদি আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে গ্রিন সিগনাল দিয়ে থাকে, তবে সেটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা হবে। গণহত্যার অভিযোগে বিচার চলাকালে পুনর্বাসনের সুযোগ দেয়া অশনিসংকেত।’

দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) এ.এইচ.এম. শাহাদাত হোসাইন আরটিএনএনকে বলেন, ‘পুলিশের কাজ হলো আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করা। দেশে নতুন সরকার এসেছে—এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে মন্ত্রণালয় থেকে। আমরা নির্দেশনা মেনে চলব এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’  আরটিএনএন