আবু সুফিয়ান
জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আজ (৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিতে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন। তার ভাষণ মূলত নির্বাচনী ও রাষ্ট্রনৈতিক রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ। এতে তিনি পুরনো ফ্যাসিস্ট শাসন ও ক্ষমতাসীন দলের কৌশলগত ব্যর্থতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নাগরিক সচেতনতা জাগানোর চেষ্টা করেছেন। ভাষণে তিনি জনগণকে ভয় ও আতঙ্কের পরিবর্তে স্বপ্ন ও আশার প্রতিফলন দিতে চেয়েছেন। নির্বাচন ও ভোটের গুরুত্বকে ‘গণতান্ত্রিক ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্নীতিবাজ, অসৎ ও রাষ্ট্র ধ্বংসকারী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভাষণটিতে একাধিক ভোটার গোষ্ঠীকে টার্গেট করা হয়েছে। তরুণ ভোটারদেরকে চাকরি ও সামরিক প্রশিক্ষণ, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য ও ঋণ, মধ্যবিত্তের জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সংস্কার এবং জাতীয়তাবাদী ভোটারদের কাছে আধিপত্যবাদ বিরোধী তুলে ধরেছেন। ভাষণটি একটি সংস্কারবাদী জনতাবাদী রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এটি জনগণের ক্ষোভ, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্রের স্বপ্ন - এই তিনকে একত্র করেছে।
ভাষণে নাহিদ চারটি আবেগ ব্যবহার করেছেন। ভুক্তভোগী জনগণের ক্ষোভ, রাষ্ট্র সংস্কারের আশা, জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ ও দুর্নীতিবিরোধী নৈতিক অবস্থান। এই অংশ ভাষণকে তিনটি ধারায় ফেলা যায়। Populist Welfare State Reform Speech, Anti-Corruption Governance Manifesto ও Post-Authoritarian Institutional Reset Proposal ।
নাহিদের ভাষণ কৌশল চলুন একনজরে দেখি।
তিনি ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানকে ‘জুলাই বিপ্লব’ হিসেবে ফ্রেম করেছেন। আন্তর্জাতিকভাবে এটি “Post-Regime Change Legitimacy Narrative” হিসেবে পরিচিত। এই ধরনের ন্যারেটিভ সাধারণত ব্যবহৃত হয়, আরব বসন্ত-পরবর্তী রাষ্ট্রগুলোতে এবং ল্যাটিন আমেরিকার সামরিক শাসন-পরবর্তী রাজনীতিতে।
তিনি রাষ্ট্রকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। ফ্যাসিস্ট/বেইনসাফ রাষ্ট্র এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র। এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাষণ কৌশল।
ভাষণে প্রায় সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
হাসিনা রেজিমের বর্ণনা ও রাজনৈতিক ভাষা
------------------------
নাহিদ বারবার ‘খুনি হাসিনা’, ‘ফ্যাসিস্ট শাসন’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। তিনি শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে দায়ী করেছেন। যেমন - বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা। তিনি তিনটি কৌশলগত বার্তা দিয়েছেন। তা হলো- সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, হাই-টেক বাহিনী গঠন ও জনভিত্তিক প্রতিরক্ষা কাঠামো।
পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ
-------------------------
এই অংশটি ভাষণের সবচেয়ে স্পষ্ট ভূরাজনৈতিক অবস্থান নির্দেশ করে। তিনি সরাসরি ভারতকে আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। এটি তিনটি বার্তা দেয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা, সার্বভৌমত্বের রাজনৈতিক ব্যবহার ও জাতীয়তাবাদী ভোটার টার্গেটিং।
তিনি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বৃদ্ধির কথা বলেছেন। এটি “Identity-based Foreign Policy Signalling”। সার্ক পুনরুজ্জীবন ও আসিয়ানে যোগদানের কথাও বলেছেন।
সামগ্রিক নীতিগত কাঠামো:
----------------
এই অংশে নাহিদ একটি ‘রাষ্ট্র বনাম সিন্ডিকেট’ রাজনৈতিক ফ্রেম তৈরি করেছেন। এখানে রাষ্ট্রকে জনস্বার্থের রক্ষক এবং ব্যবসায়ী-রাজনীতিক-আমলা জোটকে সংকটের উৎস হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এটি “Anti-Oligarchic Populist Governance Narrative” হিসেবে পরিচিত। এই অংশের মূল চারটি দর্শন হলো:- রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক কল্যাণ অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও বিচার ব্যবস্থার পুনর্গঠন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে ফ্রেম করা।
নাহিদ বাজারকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখার পক্ষে নন। তিনি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ সমর্থন করেছেন। এটি তিনটি মডেলের মিশ্রণ। Social Market Economy, Developmental State Model ও Populist Price Control Policy।
তিনি বিচার ব্যবস্থাকে ‘সিস্টেমিক ব্যর্থতা’ হিসেবে ফ্রেম করা হয়েছে। তিনি তিনটি সমস্যা তুলে ধরেছেন। দুর্নীতি, বিচার বিলম্ব ও রাজনৈতিক প্রভাব।
তিনি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের কথাও বলেছেন। এই অংশটি ভাষণের অন্যতম স্ট্র্যাটেজিক রাষ্ট্রদর্শন। তিনি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র থেকে স্থানীয় সরকারের দিকে ক্ষমতা সরানোর কথা বলেছেন। এটাকে জার্মান ফেডারেল মডেল, নর্ডিক লোকাল গভর্ন্যান্স বা ভারতীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সাথে তুলনা করা যেতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তা ও ভেজাল বিরোধী নীতির কথাও বলেছেন তিনি। এই অংশে তিনি খাদ্য নিরাপত্তাকে জনস্বাস্থ্য ও মানব নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে তুলেছেন। তিনি “Zero Tolerance Regulatory State” মডেল প্রস্তাব করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের Food Safety Governance মডেলের সঙ্গে মিল রয়েছে এর।
ভাষণের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ফ্যাসিবাদ বিরোধিতা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুনরুদ্ধার, বিদেশি আধিপত্য প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধি। এগুলো Welfare Nationalism নামে পরিচিত রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করে।
ভাষণে বারবার ব্যবহার হয়েছে— “লুটপাট”, “গণশত্রু”, “ফ্যাসিবাদ”, “খুনি সরকার”।