Image description

কীভাবে ভোট জালিয়াতি করবেন? আমার  ১৭ বছরের চাকরি জীবনে বেশ কয়েকবার স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ হয়েছিল। চাকরিকালীন সময়ে কখনোই সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমি কোথাও শেয়ার করিনি, কিন্তু আজকে আমার মনে হলো বাংলাদেশের নির্বাচনের দিনে কত ধরণের অনিয়ম হয় যা আমি নিজ চোখে দেখেছি, সেগুলো সবার জানা উচিত।


সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি কীভাবে নির্বাচনে বিভিন্নভাবে জালিয়াতি হতো। চলুন দেখে নেই নির্বাচনের জালিয়াতিগুলো কীভাবে হয়। যারা নির্বাচন সংক্রান্ত কাজে জড়িত আছেন তারা আমার এই লেখাটি সেভ করে রাখতে পারেন, ভোটের দিন খুবই কাজে দেবে।


জালিয়াতির সবথেকে কমন পার্ট হচ্ছে জাল ভোট দেওয়া। সব থেকে পুরনো টেকনিক হচ্ছে একজনের ভোট আরেকজন দেওয়া। সময় আর প্রযুক্তির আধুনিকতায় দিন দিন জাল ভোট দেওয়া এখন অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে, তারপরও এটি এখনো চালু আছে। এই জাল ভোট তখনই দেওয়া হয় যখন কেন্দ্রের ভেতর থেকেই একটা সিগন্যাল দেওয়া হয় যে জাল ভোট পাঠানো হোক। সব কিছু সাজানো থাকে, কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্ন করা হয় না। শুধু হাতের একটি স্লিপ নিয়ে আসলেই হয়, কোনো চ্যালেঞ্জ করা হয় না। তখন একই ব্যক্তিকে একটু পর পর বিভিন্ন জনের ভোট দিতে ভেতরে পাঠানো হয় এবং এই প্রক্রিয়া অবিরাম চলতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো প্রার্থীর এজেন্ট কাউকে চ্যালেঞ্জ না করে। তাই এজেন্টদের বলবো, সবার পরিচয় নিশ্চিত হোন।


এইবার আমি আমার একদম রিয়েল লাইফ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কিছু ঘটনা আপনাদের বলবো:
ঘটনা - ১ একটি কেন্দ্রে গিয়ে দেখলাম লম্বা লাইন। আমরা ভেতরে গিয়ে দেখলাম কোনো ভোটার নেই। আমার একটু খটকা লাগলো—বাইরে অনেক লম্বা লাইন কিন্তু ভেতরে বুথগুলো ফাঁকা, কেউ ভোট দিচ্ছে না। সব বুথ ঘুরে এক পর্যায়ে আমি পোলিং অফিসারকে জিজ্ঞেস করলাম, বাইরে এত লম্বা লাইন কিন্তু ভেতরে ভোট হচ্ছে না কেন? পোলিং অফিসার খুব চালাক মানুষ, উনি কোনো দায়-দায়িত্ব নিলেন না। উনি আমাকে বললেন, বাইরে কী হচ্ছে সেটা আমি জানি না, আমার দায়িত্ব ভোটকেন্দ্রের ভেতরে দেখা। কেন লাইনে দাঁড়ানো মানুষ ভোট দিতে ভেতরে আসছে না সেটা আমার জানা নেই।


আমি বের হয়ে আসলাম আসল ঘটনা জানার জন্য। আসল ঘটনা ছিল, প্রতিটা ভোটকেন্দ্রের লাইনে সকাল থেকে ২৫-৩০ জনের একটা দল দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের কাজ হলো লাইনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিন্তু ভেতরে ভোট দিতে না যাওয়া। অর্থাৎ কৃত্রিম একটা ট্রাফিক জ্যাম সৃষ্টি করা, যেন পিছনের লোকজন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে ভোট না দিয়ে বাড়ি চলে যায়। আমি লক্ষ্য করলাম মানুষ আসলেই ভোট না দিতে পেরে বাড়ি চলে যাচ্ছে।


এটা করার কারণ হলো, এই কেন্দ্রগুলোতে তাদের প্রতিপক্ষ প্রার্থীর অনেক ভোট আছে। এখন এইভাবে মানুষকে ভোট দিতে না দিয়ে বাড়ি পাঠাতে পারলে দিনশেষে তারাই জিতবে। এটা ছিল তাদের সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিং। আমি লাইনে দাঁড়ানো দুই একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন? কেন ভেতরে যাচ্ছেন না? তারা কোনো উত্তর না দিয়ে একবার মোবাইলে তাকায় তো একবার উপরে তাকায়। বাধ্য হয়ে একজন ভেতরে গেলেন ভোট দিতে, কিন্তু তিনি ভোট দিয়ে এসেই আবার সেই লাইনের পিছনে দাঁড়িয়ে গেলেন। এটা যে কত বড় সূক্ষ্ম কারচুপি তা কেউ খেয়ালই করতে পারবে না।


নারী ভোটারদের লাইনেও একই অবস্থা ছিল। তবে মহিলাদের চিল্লাচিল্লিতে লাইন কিছুটা আগাচ্ছিল। কিন্তু তারা ভেতরে গেলে আরেক ধরণের হয়রানি করা হতো। যে স্লিপ নিয়ে তারা ভেতরে যেতেন, তাদের বলা হতো এই রুমে না, অন্য রুমে যান। এভাবে সব রুম ঘুরিয়ে ভোট না দিয়ে তাদের চলে যেতে বলা হতো। এভাবেই গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো ভোট না দিয়ে বাড়ি চলে যায়।


ঘটনা - ২ ভোটকেন্দ্রের এজেন্ট নিয়ে যে কী পরিমাণ লুকোচুরি করা হয়, তার কিছু বিচিত্র অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। আমরা যখনই আমাদের টিম নিয়ে কোনো কেন্দ্রে হাজির হতাম, ভেতরে গিয়ে দেখতাম সব প্রার্থীর এজেন্ট আছে কি না। দেখা যেত প্রভাবশালী দলের এজেন্ট আছে কিন্তু অন্য প্রার্থীর এজেন্ট নেই। জিজ্ঞাসা করলেই বলা হতো তারা এইমাত্র বাইরে গেছে বা খেতে গেছে, বাথরুমে গেছে ইত্যাদি । কিন্তু আসল ঘটনা ছিল, সকালেই তাদেরকে হুমকি-ধমকি বা মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।


এক কেন্দ্রে গিয়ে দেখলাম সব এজেন্ট আছে। আমি অবাক হলাম যে এই কেন্দ্র এত ভালো! আমি একজনের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কোন দলের এজেন্ট? তিনি বললেন আওয়ামী লীগের। আরেকজনকে বললাম আপনি কার এজেন্ট? তিনি বললেন অমুক প্রার্থীর। আমি তার গলার ব্যাজটা দেখে বললাম, আপনার গলায় তো নৌকা প্রতীকের ব্যাজ! তখন তিনি আর কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। আমি একটা মুচকি হাসি দিয়ে বেরিয়ে আসলাম। তাড়াহুড়া করে ডামি এজেন্ট সাজাতে গিয়ে তারা গলার ব্যাজটা খুলতেও ভুলে গিয়েছিল।


ঘটনা - ৩ ভোটকেন্দ্রের মহিলা বুথগুলোর অবস্থা ছিল আরও খারাপ। একটি বুথে গিয়ে দেখি একজন মহিলা গোপন কক্ষে অবস্থান করছেন। যে ভোটাররা গোপন কক্ষে ভোট দিতে যাচ্ছেন, তাদের তিনি কোথায় ভোট দিতে হবে তা দেখিয়ে দিচ্ছেন বা বাধ্য করছেন। আমি গিয়ে প্রশ্ন করলাম, আপনি এই গোপন কক্ষে কী করছেন? এখানে ভোটার ছাড়া কারো থাকার কথা না। তিনি উত্তর দিলেন, বয়স্ক ভোটারদের হেল্প করছেন। আমি কথা বলার সময় পোলিং অফিসার তাকে ধমক দিয়ে বের করে দিলেন।

আরেকটি বুথে গিয়ে দেখলাম একজন জাদরেল টাইপের মহিলা ভোটারদের গোপন কক্ষে যেতেই দিচ্ছেন না। তার সামনেই ব্যালটে সিল মারতে বলছেন। আমি প্রশ্ন করায় তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে চলে গেলেন।
ঘটনা - ৪ ভোটকেন্দ্রে ভুয়া সাংবাদিকদের বিচরণ ছিল চোখে পড়ার মতো। আইন অনুযায়ী ভোটার, এজেন্ট আর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া কেন্দ্রে কেউ থাকতে পারবে না। কিছু সাংবাদিকের প্রবেশের অধিকার থাকে, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শত শত ভুয়া সাংবাদিক কার্ড ইস্যু করা হয়। এরা কেন্দ্রে ঘুরাঘুরি করে জালিয়াতিতে ব্যস্ত থাকে। এক ব্যক্তিকে দেখলাম ভোটারদের ইনফ্লুয়েন্স করছেন। জিজ্ঞেস করায় সাংবাদিক কার্ড দেখালেন। আমি তাকে বললাম, আপনার কাজ খবর সংগ্রহ করা, আপনি ভোটারদের কাজে হস্তক্ষেপ করছেন কেন? তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে বের হয়ে গেলেন। আসলে এরা পার্টির লোক, তাদের কাজ হলো ভোটারদের ভয় দেখানো।

ঘটনা - ৫ একটি কেন্দ্রে ভুয়া নির্বাচন পর্যবেক্ষক দেখলাম। এক ব্যক্তি ঘুরাঘুরি করছিলেন, আমার সন্দেহ হওয়ায় জিজ্ঞেস করলাম আপনি কোন সংস্থার? তিনি কোনো উত্তর দিতে পারলেন না, পরে নামসর্বস্ব একটা নাম বললেন যা আমি কখনো শুনিনি। আমি বললাম আপনি পর্যবেক্ষক হলে তো পর্যবেক্ষণ করে চলে যাওয়ার কথা, কিন্তু আপনি ভোটে হস্তক্ষেপ করছেন। তিনি আর কথা না বলে চলে গেলেন।


ঘটনা - ৬ আরেকটি কেন্দ্রে গিয়ে দেখলাম বাইরে প্রচুর মানুষ ঘুরাঘুরি করছে কিন্তু ভেতরে কেউ ভোট দিতে যাচ্ছে না। আমরা ১৫ মিনিট বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে ভেতরে গেলাম। পোলিং অফিসার বললেন তিনি জানেন না কেন মানুষ আসছে না। বাইরে এসে এক ছোট ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে? সে বললো এখানে মারামারি হয়েছে, কেউ ভেতরে গেলেই তাকে মারছে। তখন বুঝলাম ভেতরে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যেন কেউ ভোট দিতে না যায়।


ঘটনা - ৭ একটি কেন্দ্রে দেখলাম ভোটারদের গোপন কক্ষে সিল দিতে দেওয়া হচ্ছে না। এজেন্টের সামনেই সিল মারতে বাধ্য করা হচ্ছে যাতে তারা কনফার্ম হতে পারে ভোটটা তাদের দলেই পড়েছে। আমি জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে ভেতরে ঢুকলাম এবং প্রশ্ন করলাম। পোলিং অফিসার বললেন তিনি দেখেননি, হলে হয়তো একটা-দুইটা হতে পারে। এরপর আমাদের সামনেই একটা মিথ্যা বকাবকির নাটক সাজানো হলো—এটুকুই।
এগুলো হলো কেন্দ্রের ভেতরে ও আশেপাশের জালিয়াতি। এছাড়া কেন্দ্র থেকে ২ কিলোমিটার দূরে ভোটারদের থামিয়ে দেওয়া বা বাড়ি থেকে নারী ভোটারদের এনআইডি কার্ড কেড়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও আমি অনেক দেখেছি।
আমার খুব আশাবাদী এইবার এইসকল অনিয়ম গুলি হবে না, অনিয়মের চেষ্টা কিন্তু সব পক্ষ করেই যাবে।  


(মুহাম্মদ মঈন উদ্দিন সাবেক কর্মকতা আমেরিকান এ‍্যাম্বাসি ঢাকা, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আইয়া স্টেটে বসবাসরত)