যে অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টির (জাপা) অটুট দুর্গ হিসেবে পরিচিত, সেখানে এবারের নির্বাচনে লাঙল প্রতীকের আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে। বিএনপি ও জামায়াত মনে করছে, জাপার প্রভাব কমে গেছে, এবং উত্তরবঙ্গের ৩৩টি আসনের অধিকাংশে তারা জয়ের সম্ভাবনা দেখছে।
নির্বাচনি পর্যবেক্ষক ও বিভিন্ন জরিপ মতে, বিএনপি ১৮টি আসনে এগিয়ে, জামায়াত ১০টিতে এবং জাপা মাত্র চারটিতে লিড করছে। তবে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের দাবি, তাদের ভোট বেড়েছে এবং দুর্গ আরও শক্তিশালী। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে এই অঞ্চলে ত্রিমুখী বা দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস মিলছে, যা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম জাতীয় নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
রংপুরের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে জাপার প্রতি অসন্তোষ স্পষ্ট। অনেকে বলছেন, ‘অতীতে কলা গাছ দাঁড়ালেও লাঙল জিততো’, কিন্তু এখন সেই পরিবেশ নেই। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করছেন, এলাকায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের অভাব, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে সরকারে থাকার কারণে দলের ‘বিরোধী’ ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়া, এবং নির্বাচিত এমপিদের এলাকায় অনুপস্থিতি।
রংপুরের শাপলা চত্বরে হাফিজুর রহমান নামে এক বৃদ্ধের সঙ্গে কথা হয় সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘এবার লড়াই হবে জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে। লাঙ্গলের মার্কেট নাই।’ বদরগঞ্জের ভ্যানচালক মতিয়ার মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘নৌকার (আওয়ামী লীগ) সঙ্গে অ্যাডজাস্ট হয়ে লাঙ্গলের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে।’
তবে সবাই একমত নয়। কেউ কেউ মনে করেন, জাপার ‘নীরব ভোটাররা’ শেষ মুহূর্তে লাঙ্গলকে জিতিয়ে দেবে। আব্দুল গাফফার নামে এক মুদি দোকানি সারাবাংলাকে বলেন, ‘রংপুর লাঙ্গলের এলাকা। এখানে লাঙ্গলের শক্তি বেশি।’ মাসুম নামে আরেক ব্যবসায়ী যোগ করেন, ‘লাঙ্গলের ভোটাররা নীরব থাকে, কিন্তু ভোটের দিন ঠিক জায়গায় সিল মারে।
এই মিশ্র মতামত থেকে স্পষ্ট যে, রংপুরে জাপার একচেটিয়া সমর্থন আর নেই। বিশেষ করে গত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর। যদিও সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তাদের ভোট জাপার দিকে ঝুঁকতে পারে, যা লাঙ্গলকে কিছুটা সুবিধা দিতে পারে।
জামায়াতের উত্তরবঙ্গ কৌশল
জামায়াতে ইসলামী উত্তরবঙ্গকে তাদের জয়ের মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখছে। রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে ২৯টিতে তারা জোটের পক্ষে প্রার্থী দিয়েছে; ছেড়েছে মাত্র তিনটি। দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর-৩ (সদর) আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, ‘লাঙ্গলের ঘাঁটি অনেক আগেই ভেঙে গেছে। ২০১৪ সালেই প্রকৃত ভোট হলে এ চিত্র দেখা যেত।’ জামায়াত মনে করছে, জাপার প্রভাব ক্ষীণ হওয়ায় ভোটাররা উন্মুক্ত, এবং তাদের নিজস্ব ভোট ব্যাংক এখানে শক্ত। গত দুই বছরে গ্রামাঞ্চলে কাজ করে তারা এই অঞ্চলে জয়ের সম্ভাবনা দেখছে।
দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান রংপুরসহ আশপাশের জেলায় প্রচার চালিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, বিভিন্ন প্রকল্প, কৃষি ইস্যু তুলে ভোট চেয়েছেন। দলটির নেতারা মনে করেন, জামায়াতের ১১-দলীয় জোটে ২১৫টি আসনে প্রার্থী, যা তাদের জাতীয় স্তরে শক্তি বাড়াবে। রংপুর-১ এবং রংপুর-৫ আসনে জামায়াতের শক্ত অবস্থান, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
বিএনপির আত্মবিশ্বাস
বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ দল বিএনপিও রংপুরে আগের চেয়ে বেশি সম্ভাবনা দেখছে। দলটির রংপুর মহানগরের সদস্য সচিব মাহফুজ উন নবী ডন সারাবাংলাকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টিকে আমরা আর কোনো ফ্যাক্টর মনে করছি না। ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।’
দলীয় নেতারা মনে করেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পক্ষে ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণে কৃষিভিত্তিক এই অঞ্চলে বিএনপির সমর্থন বাড়ছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান রংপুরে নির্বাচনি জনসভায় অংশ নিয়ে ৩৩টি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
রংপুরের ছয়টি আসনে দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী লড়াই হতে পারে। যেমন: রংপুর-১ আসনে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এই আসনে ইসলামী আন্দোলনেরও শক্ত অবস্থান রয়েছে। বিএনপি মনে করছে, জাপার এমপিরা এলাকায় সময় না দিয়ে উন্নয়নকে অবহেলা করেছে, যা ভোটারদের তাদের দিকে টানছে।
জাতীয় পার্টির প্রতিরক্ষা
জাতীয় পার্টি অবশ্য এসব দাবি উড়িয়ে দিচ্ছে। চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘দুর্গ আরও শক্তিশালী হয়েছে। আমরা অন্য যেকোনো বারের চেয়ে বেশি ভোট পাব।’ তিনি গত দেড়-দুই বছরের সাহসী রাজনীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘দেশ বাঁচানোর সংগ্রামে জাপা শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে।’
দলটি সারাদেশে ১৯২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে, এবং রংপুর বিভাগে কমপক্ষে ১২টি আসন জিতবে বলে দাবি করছে। সেইসঙ্গে তাদের অভিযোগ, বিএনপি, এনসিপি ও জামায়াত প্রশাসনের মদদ পাচ্ছে, যাতে জাপাকে ‘সাইড’ করা যায়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু সারাবাংলাকে বলেন, ‘জাপা একেবারে মাইনাস হয়ে যাবে না। তারা এখনো ফ্যাক্টর, এবং ভালো সংখ্যক আসন পাবে।’ তবে দলটি এখন ডোর-টু-ডোর প্রচারে মনোযোগ দিয়েছে, যা তাদের অবস্থানকে শক্ত করছে।
নির্বাচন বিশ্লেষক অধ্যাপক হারুন অর রশীদ চৌধুরীর মতে, রংপুরে কিছু আসনে জামায়াত হট ফেভারিট, কোথাও আবার বিএনপি। সামগ্রিকভাবে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং অতীতের বিতর্কিত নির্বাচনের ছায়া এই অঞ্চলের রাজনীতিকে নতুন মোড় দিয়েছে। চাহিদা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও ন্যায়বিচার এগুলোর দিকে চোখ এখন ভোটারদের। ফলাফল যাই হোক, উত্তরবঙ্গের এই লড়াই জাতীয় নির্বাচনের দিক নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।