Image description

প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের ধকল নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে জনতা ব্যাংক। মোট ঋণের ৭৩ দশমিক ১৮ শতাংশ খেলাপি হওয়ায় অস্তিত্বের সংকটে আছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এ প্রতিষ্ঠান। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ৪৪ কোটি টাকার এক ঋণখেলাপিকে প্রায় সাড়ে ২২ কোটি টাকা সুদ মাফ (মওকুফ) করে দিয়েছে জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা। সুদ মওকুফের আবেদনের এক সপ্তাহের মধ্যে অস্বাভাবিক গতিতে ফাইল নিষ্পত্তি করেছে ব্যাংকটি। রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে তড়িঘড়ি করে এমন সুবিধা পাওয়া ব্যক্তি মির্জা ফয়সাল আমিন। তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি এবং দলের কেন্দ্রীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আপন ছোট ভাই। আওয়ামী লীগের সময়ে ব্যবসা বঞ্চিত হওয়ার দাবি করে এই সুবিধা নিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে আওয়ামী লীগের সময়েই ঋণ সুবিধা নিয়েছেন প্রায় ১১ কোটি টাকা।

 

নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মির্জা ফয়সালের মালিকানাধীন নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ২০ বছর আগে প্রথমবার ঋণ দেয় জনতা ব্যাংক। সেই ঋণ শোধ করতে না পারলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রতিষ্ঠানটিকে আবারও ঋণ দেওয়া হয়। এরপর ১৭ বছর পুরোপুরি বন্ধ ছিল নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর নতুন করে আলোচনায় আসে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো। অল্পদিনের মধ্যেই বিপুল অঙ্কের সুদ মওকুফের সুবিধাও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

 

 

এদিকে সুদ মওকুফ করানোর প্রেক্ষাপট সৃষ্টির জন্য নিশ্চিতপুর অ্যাগ্রো গত বছরের নভেম্বর মাসে কয়েক দফায় প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যাংকে জমা দিয়েছে। ১৭ বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে হঠাৎ কীভাবে এত নগদ টাকা এলো তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

 

নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রোর একাল-সেকাল

 
 

 

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শুরুতে কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেই সময়কালে কৃষিভিত্তিক নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড গড়ে তোলেন তার ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন। ফয়সাল ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

 

 

এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র এক মাস আগে ২০০৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নিশ্চিন্তপুরকে ১০ কোটি ৯৭ লাখ টাকার প্রকল্প ঋণ অনুমোদন করে জনতা ব্যাংক। এ ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। ওই ঋণ অনুমোদনের সময় জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের (২০০১-০৬) পরিচালক ছিলেন মুহ. ফজলুর রহমান। এখন ২২ কোটি টাকা ঋণ মওকুফের সময় তিনিই জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন।

 

বিএনপির সময়ে শুরু হলেও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নিশ্চিন্তে জনতা ব্যাংক থেকে নানা সুবিধা পেয়েছে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিস্তি পরিশোধে অতিরিক্ত সুবিধো দিয়েছে জনতা ব্যাংক। এমনকি ব্যবসা শুরুর জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় ওই সময় আরও প্রায় ১১ কোটি ঋণ দেওয়া হয় মির্জা ফয়সালের প্রতিষ্ঠানটিকে। নতুন করে এই টাকা পাওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু বিগত ১৭ বছরে সেই ঋণ পরিশোধের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো তৎপরতাও দেখা যায়নি।

 

 

পটপরিবর্তনের পর সুর বদল

 

আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ঋণ পুনঃতফসিল এবং নতুন ঋণ বাগিয়ে নেওয়ার পরও ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর নতুন দাবি করে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০০৭ সাল থেকে তারা রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে ব্যবসা করতে পারেনি।

 

জনতা ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ১৭ বছর খবর না থাকলেও ৫ আগস্টের পর থেকে সক্রিয় হয়ে ওঠেন মির্জা ফয়সাল। ২০২৫ সালের ৯ ও ২৭ নভেম্বর দুটি আবেদন করে সুদের টাকা মওকুফের আবদার জানান তিনি। আবেদনপত্রে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির এই শীর্ষ নেতা দাবি করেছেন, ২০০৭ সালের পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি ও তার প্রতিষ্ঠান ফ্যাসিস্ট সরকারের রোষানলে পড়ে। এর ফলে ব্যবসায়িকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাংকের সঙ্গে স্বাভাবিক লেনদেন করতে পারেননি। এ ছাড়া তার প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় এবং সারের দাম কমে যাওয়ার কারণেও লোকসানে পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে জনতা ব্যাংকের নিজস্ব পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিশ্চিন্তপুরের কারখানা ১৭ বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে (ডেড প্রজেক্ট)।

 

 

এশিয়া পোস্টের ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে ব্যাংকের প্রতিবেদনের সত্যতা পেয়েছেন। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জগন্নাথপুরের ডোডাপাড়া এলাকায় গিয়ে জানা যায়, ২০১১ সাল থেকে এই কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। মিশ্র সার উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া কারখানাটিতে একসময় ২০-৩০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। কিন্তু সার বিক্রি না হওয়ায় কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সেই থেকে এই স্থাপনা অকেজো হয়ে পড়ে আছে।

 

কারখানার আশপাশের বাসিন্দাদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে চাইলে তারা রাজি হননি। কাঁটাতারে ঘেরা কারাখানার ভেতরে ঢোকার অনুমতি মেলেনি নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে থেকে। এমনকি ছবি তুলতে গেলেও তারা নিষেধ করেন।

 

সুদ মওকুফের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করা হয় যেভাবে

 

১৭ বছর কারখানা বন্ধ থাকার সুবাদে এই দীর্ঘ সময় জনতা ব্যাংকের সঙ্গে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রোর কোনো লেনদেন হয়নি। কিন্তু গত বছরের ৯ নভেম্বর সুদ মওকুফের প্রথম আবেদন জমা দেন মির্জা ফয়সাল আমিন। সেদিন থেকেই কয়েক দফায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

 

নথিপত্র থেকে জানা যায়, ৯ নভেম্বর প্রথম আবেদন জমার দিনে দুটি আলাদা কিস্তিতে ৫৬ লাখ ও ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা পরিশোধ করে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো। পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে পরিশোধ করা হয় আরও ৫০ লাখ টাকা। এরপর ২৭ নভেম্বর ঋণ মওকুফের জন্য দ্বিতীয় আবেদন করেন মির্জা ফয়সাল।

 

সুদ মওকুফের আবেদনের নথিপত্র
সুদ মওকুফের আবেদনের নথিপত্র

হিসাবের মারপ্যাঁচ ও অস্বাভাবিক গতিতে অনুমোদন

 

মির্জা ফয়সাল আমিনের আবেদনটি জমা দেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয় জনতা ব্যাংক। তাদের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রোর মোট দায়ের পরিমাণ ৪৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে মাত্র ২২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে অবশিষ্ট ২২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বা মোট দায়ের প্রায় ৫০ শতাংশই মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে মওকুফযোগ্য সুদের পরিমাণ ৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা, অনারোপিত সাধারণ সুদ ১ কোটি টাকা এবং অনারোপিত দণ্ড সুদ ২ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে মোট ২২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা মওকুফের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

 

 

 

একই সঙ্গে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে খেলাপি নিশ্চিন্তপুরকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) প্রতিবেদনে ‘এসএমএ’ (আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি নয়, তবে ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে প্রদর্শনের প্রস্তাব করা হয়। ব্যাংকারদের মতে, এ ধরনের শ্রেণিবিন্যাস প্রচলিত ব্যাংকিং নীতিমালার পরিপন্থি এবং এতে আর্থিক ঝুঁকি গোপনের প্রবণতা দেখা দেয়। কিন্তু ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৮৬৬তম সভায় এসব প্রস্তাব পেশ করা হলে তা অনুমোদন দেওয়া হয়।

 

সংকটে ধুঁকছে জনতা ব্যাংক

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, প্রভাবশালী গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে আগে থেকেই জিম্মি হয়ে আছে জনতা ব্যাংক। এ্যাননটেক্স, বিসমিল্লাহ, বেক্সিমকো, এস আলমসহ শীর্ষ ৯ ব্যবসায়িক গ্রুপের কাছেই আটকে আছে প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বের পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭০ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। মোট ঋণ ৯৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ জনতার ব্যাংকের খেলাপির হার ৭৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে আমানতের বিপিরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতি ৪৮ হাজার ৩১ কোটি টাকা।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র ব্যাংকার এ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এশিয়া পোস্টকে বলেন, জনতা ব্যাংকের মতো সংকটাপন্ন ব্যাংক তারল্য সংকটে থাকা অবস্থায় এমন ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে ঋণের মানদণ্ড শিথিল করা এবং সিআইবিতে ভুল তথ্য দেওয়া বড় ধরনের গুরুতর অপরাধ। এটি নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকদের ভুল বার্তা দিচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের মূলধনের ভিত্তিকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করেছে। দীর্ঘ সময় ব্যাংককে কোনো টাকা না দিয়ে এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে সুবিধা নেওয়ার বিষয়টিকে আইনি অপকৌশল বলেও অভিহিত করেন এই ব্যাংকার।

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, মওকুফের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর নির্ভর করে না। যে কোনো ব্যাংক চাইলে কোনো গ্রাহকের ঋণ মওকুফ করতে পারে। কোন প্রেক্ষাপটে এই মওকুফ করেছে, সেটা ওই ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা ভালো বলতে পারবেন। নীতিমালা মেনে করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু বলার নেই।

 

এর চেয়েও অনেক বেশি ছাড় দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে মন্তব্য করে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুজিবুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ’খেলাপি ঋণগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করেছে। এই সার্কুলার ও সব নীতিমালা মেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়েই কাজটি করা হয়েছে। এখানে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় আনা হয়নি। এর চেয়ে অনেক বেশি ছাড় দিয়ে হলেও ঋণ আদায়ের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।’

 

এ বিষয়ে কথা বলতে এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে মির্জা ফয়সাল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, বিগত বিএনপির সময়ে বা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি কোনো ঋণ পাননি। যে ঋণ পেয়েছিলেন তা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। আওয়ামী লীগের সময় ব্যবসা করতে না পারায় সম্প্রতি সুদ মওকুফের আবেদন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক তা আমলে নিয়ে সুদ মওকুফের অনুমতি দেয় এবং জনতা ব্যাংক সেটা চূড়ান্ত করে।