ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের নির্বাচনি মাঠ এখন প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভাসছে। ভোটে অংশগ্রহণকারী দলের শীর্ষ নেতা থেকে দলীয় প্রার্থীরা গ্রাম থেকে শহর সবখানেই সভা, সমাবেশ আর পথসভায় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের আশ্বাস দিচ্ছেন। প্রতিদিনই তাদের নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি যুক্ত হচ্ছে প্রচারে। ঘোষণা করা হচ্ছে দলীয় ইশতেহারও। জোর দেওয়া হচ্ছে দুর্নীতি দমন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের ওপর। তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা সহায়তার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে প্রায় সব দলের বক্তব্যে। যা প্রশ্নও তুলছে বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে। সব মিলিয়ে নির্বাচনি মাঠ এখন প্রতিশ্রুতির জোয়ারে মুখর। শেষ পর্যন্ত কোন প্রতিশ্রুতি ভোটারদের মন জয় করবে এবং কোনটি শুধু কথার ফুলঝুরি হয়ে থাকবে- তা জানা যাবে ভোটের ফলাফলের মধ্য দিয়েই। গত বৃহস্পতিবার নওগাঁ জেলা বিএনপি আয়োজিত নির্বাচনি সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, কৃষক ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে। বিএনপি জয়ী হলে দেশের সব স্তরের কৃষকদের কৃষি কার্ড দেওয়ার মাধ্যমে অন্তত একটি ফসলের যাবতীয় বীজ, সার ও কীটনাশক তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এ ছাড়াও ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করাসহ বেকারদের কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন করা হবে।
গতকাল নোয়াখালীতে নির্বাচনি জনসভা করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। জনসভায় তিনি স্থানীয়দের জানান, তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে নোয়াখালীকে বিভাগ করা, সিটি করপোরেশন করার দাবি বাস্তবায়ন করবেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নোয়াখালীবাসীর অনেক ন্যায্য দাবি আছে। আমি সেই দাবিগুলো এখানে পেয়েছি। নোয়াখালীবাসী বিভাগ চায়, সিটি করপোরেশন চায়। আমরা ক্ষমতায় গেলে ইনসাফের মাধ্যমে আপনাদের এই প্রাণের দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করব ইনশা আল্লাহ।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম গতকাল ঢাকা-১১ আসনের নির্বাচনি এলাকা আফতাবনগরে গণসংযোগ করেন। এ সময় তিনি সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে আপনাদের আর রাজনৈতিক নেতাদের কাছে জিম্মি থাকতে হবে না। কোনো সমস্যার জন্য কোনো দলের নেতার দরজায় ধরনা দিতে হবে না; আপনারা সরাসরি থানায় যাবেন এবং থানার ওসি আপনার সমস্যার সমাধান দেবেন। সাধারণ মানুষের জন্য প্রশাসনের দরজা উন্মুক্ত থাকবে। বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে, তাঁদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে যা যা করা প্রয়োজন, সবকিছু করা হবে বলে জানিয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের বোঝা নয়। তাঁরা আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই ভাই, আমাদেরই আত্মীয়। গতকাল বিকালে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ঢাকা বধির হাইস্কুলে বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মির্জা আব্বাস এ কথা বলেন। বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থার বধির জনগোষ্ঠী আয়োজিত এ সভায় প্রায় ২০০ জন বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা-৫ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নবীউল্লাহ নবী ডেমরা থানার ৬৬ নম্বর ওয়ার্ডের অলিগলিতে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ব্যাপক গণসংযোগ করেন। এ সময় এখানে বিভিন্ন নাগরিক বিড়ম্বনা ও সমস্যার কথা শোনেন। বিজয়ী হতে পারলে জনগণের সঙ্গে থেকে এলাকার সমস্যার সমাধান করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এ ছাড়া এ আসনের প্রতিটি মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার আশাবাদ ব্যক্ত করেন নবীউল্লাহ নবী। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও আমার ওপর আস্থা আমাকে আশাবাদী করেছে। এ আসনের প্রতিটি মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকতে চাই।
নির্বাচিত হলে চট্টগ্রাম নগরীর দীর্ঘদিনের প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ড. এ কে এম ফজলুল হক। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নগরীর সমস্যা ও সমাধান তুলে ধরে ড. ফজলুল হক বলেন, চট্টগ্রাম শহরের প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা। বর্তমানে শহরের খালগুলো বর্জ্যে পরিপূর্ণ। এই সমস্যা সমাধানে একটি কার্যকর বর্জ্য অপসারণ নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাস্তাগুলো পরিষ্কার রাখা এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করা জরুরি।
ঢাকা-৫ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মীর আবদুস সবুর আসুদ গতকাল মাতুয়াইলে গণসংযোগ করেন। স্থানীয়দের সমস্যার কথা শোনেন এবং নির্বাচিত হতে পারলে গ্যাস, বিদ্যুৎ, জলজট, যানজট নিরসন, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজমুক্ত এলাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এ সময় তাঁর দলের নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
আসনে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ঢাকা-১৭ আসন বিএনপির নির্বাচনি পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম। তারেক রহমানের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণার পর থেকেই এলাকাজুড়ে ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। গতকাল ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমানের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারকালে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। আবদুস সালাম বলেন, সামনে সময় এসেছে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়বার। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। উন্নয়ন-সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হলে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে হবে। একমাত্র বিএনপিই পারে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন নির্বাচনি প্রচারে নেমে অনেক প্রতিশ্রুতি দেন। তার মধ্যে বেকারত্ব সমস্যা দূর করা, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত এলাকা গড়া, ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান করার প্রতিশ্রুতি দেন। রাজধানীর খিলক্ষেত থানার ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড ডুমনী পাতিরা এলাকায় নির্বাচনের প্রচার ও গণসংযোগ শুরুর আগে পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ঢাকা-৯ আসনে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব বাসাবো এলাকায় তাঁর নির্বাচনি প্রচার কাজে অংশ নিয়ে বলেছেন, তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি করবেন না। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট কেন্দ্রে সবাইকে একত্রে যেতে হবে। ঢাকাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে এবং ঢাকা-৯ এলাকায় মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গঠনের অঙ্গীকার করেন তিনি।
ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক বলেছেন, ভোটের দিন যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও বয়োবৃদ্ধ ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আনা-নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত রিকশার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেন তাঁরা নিরাপদে ভোট দিয়ে আবার বাড়ি ফিরতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। গতকাল নির্বাচনি প্রচারে মিরপুর-১১ নম্বর বাজার রোডে নাভানা ও তালতলা বস্তির সামনের এলাকায় গণসংযোগকালে তিনি এসব কথা বলেন।
গতকাল নির্বাচনি প্রচারে নেমে খুলনা-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, এবারের ভোটে আগ্রহ বেশি তরুণদের। তরুণরা জবলেস হয়ে গেছে। কাজ নেই, চাকরি নেই, লেখাপাড়ার ব্যবস্থা খুবই সীমিত। আমাদের নেতা তারেক রহমান তরুণদের জন্য নানা প্রশিক্ষণের নির্দেশনা দিয়েছেন। তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবসম্পদে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ফলে তরুণদের প্রত্যাশা- এবারের নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ গড়বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। খুলনার রূপসা পাইকারি মৎস্য আড়ত এলাকা, নতুন বাজার, ১ ও ২ নম্বর কাস্টম ঘাট এলাকায় গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণকালে তিনি এসব কথা বলেন।
রাজশাহী-১ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মজিবুর রহমান সকালে গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ও বিকালে দেওপাড়া ইউনিয়নে প্রচার চালিয়েছেন। ওই আসনের বিএনপি প্রার্থী শরীফ উদ্দিন একই উপজেলার পাকড়ী ইউনিয়নে প্রচার চালান। রাজশাহী-২ আসনের এবি পার্টির সাইদ নোমান চৌদ্দপাই হরিজন পল্লি, মেহেরচণ্ডী স্টেশন ও ভদ্রা এলাকায় গণসংযোগ করেন।
(এ প্রতিবেদন তৈরিতে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক খুলনা ও রাজশাহী সহযোগিতা করেছেন)