ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দেশে ৩০০ আসনে জনগণের সরাসরি ভোটে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচার ও জনসভা শুরু করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গেল ২২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার তিনি সিলেট আলিয়া মাদরাসা মাঠে জনসভার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন। এরআগে তিনি হযরত শাহ জালাল (রহ.) ও শাহ পরান (রহ.) মাজার জিয়ারত করেন।
সিলেট থেকে শুরু করে মোট ৬টি জেলায় জনসভা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। এরপর চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লার তিনটি ও নারায়ণগঞ্জের পর গতকাল মঙ্গলবার ময়মনসিংহ, গাজীপুর এবং রাজধানীর উত্তরায় জনসভা করেন তিনি। তারেক রহমানের এইসব জনসভায় বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ জনতার উপস্থিতি দেখা গেছে। তার মঞ্চে ঘুরে ঘুরে সাধারণ আলাপের মতো ব্যতিক্রমধর্মী নির্বাচনী বক্তব্য গতানুগতি ধারার রাজনীতিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। জনসভায় বিশাল জমায়েত দেখে উপলব্ধি করা যায় যে, তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ ভোটারদের মাঝে তারেক রহমান ‘ক্রেজ’ কাজ করছে। আর জনতার এ উপস্থিতিতে দলটির সাধারণ নেতাকর্মীরা জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যাপক উজ্জীবীত হয়ে উঠছে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কানিজ ফাতিমা বলেন, এবারকার বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণায় মূল শক্তি তারেক রহমান। ১৭ বছর দেশের বাইরে নির্বাসিত ছিলেন, পুরো পরিবারসহ। ঢাকা-১৭ ‘র নির্বাচনী প্রচারণায় (রাজধানীর ভাষানটেক বস্তির বিআরবি মাঠে) তারেক রহমানের বক্তব্য আমাকে অভিভুত করেছে। কারণ তিনি যাদের উদ্দেশ্যে কথা বলতে এসেছেন তাদের কাছে থেকে সমস্যাগুলো শুনেছেন আর সমাধান কিভাবে হতে পারে তার পথরেখা জানতে চেয়েছেন তাদের। আপনিই বলুন, অতীতে এরকম কোনো পলিটিশিয়ান কী মানুষকে সেভাবে বিবেচনা করেছেন? করেন নাই। ইট ইজ ইউনিক।
চট্টগ্রামের হালিশহরে কলেজ শিক্ষার্থী তাবাসুম আহমেদ বলেন, আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বেশি লাইক করি। মিডিয়ায় প্রচারিত তথ্য চিত্র এবং সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব ভিডিও আপলোড হয়েছে তাতে এটা স্পষ্ট যে, সবগুলো স্পটে তারেক রহমানকে দেখতে মানুষের প্রচন্ড ভিড় ছিলো। সেই ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে সব শ্রেনীর মানুষজন তাকে দেখতেই এসেছেন এবং তার কথা শুনছেন। তারেক রহমানের বক্তৃতা দেয়ার স্টাইল, তার বক্তব্যের বিষয়বস্ত গতানুগতি ধারার বাইরে বলে আমরা মনে হয়েছে এটা আমার মতো সাধারণ ভোটার যারা কোনো দলের সমর্থক নই তারা এক্সসেপ্ট করছে।

হবিগঞ্জের চুনারিঘাটে স্কুল শক্ষিক আনিসুর রহমানও কথা এমনটি। তার ভাষ্য, সাধারণত. হবিগঞ্জ এলাকার মানুষ রাতে খুব একটা বাসা-বাড়ির বাইরে বিচরণ কম দেখা যায়। কিন্তু ২৫ জানুয়ারি রাতেও হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের উপজেলা মাঠে এতো তীব্র শীতের মধ্যেও মানুষ অপেক্ষায় ছিল কখন তারেক রহমান আসবেন? চারটার নির্ধারিত টাইম পেরিয়ে ৮ বেজে গেছে সেই অপেক্ষায়?
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী হাসিব আহমদের ভাষ্য, এবারের নির্বাচনে একটা বড় ব্যাতিক্রম হচ্ছে, বিএনপির যে নির্বাচনী সমাবেশটি হয়ে গেলো সেখানে মূল ফোকাস ছিলো তারেক রহমান। প্রার্থীরা সেভাবে নয়। কারণ কী জানেন? কারণ তারেক রহমান এখন একটা ক্রেজ। একজন স্কুল ছাত্রকে বলেন, একজন শ্রমিককে বলেন, একজন মেডিকেল স্টুডেন্টকে বলেন, তারা কী বলবেন? আমরা তারেক রহমানকে দেখতে এসেছি, তার কথা শুনতে এসেছি। দিস ইজ ফ্যাক্ট।
‘খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রচারণায় পার্থক্য কী?’
স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর বিএনপির হাল ধরেন গৃহবধু বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮৩ সালে। এরপর ৯১ সাল থেকে সব কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে তার নেতৃত্বে। ওসব নির্বাচনে ছিলেন এমন একাধিক ব্যক্তির কাছে প্রশ্ন ছিলো এমনটি। তুলনামূলক বিষয়টা তুলে ধরেন ৭১ বছর বয়সী অবসর প্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম হাফিজুর রহমান যিনি ঢাকার পুরানা পল্টনের বসবাস করেন।
হাফিজুর রহমান বলেন, বেগম খালেদা জিয়ারও ইমেজ ছিলো বিশাল-বিস্তৃত। তার ইমেজকে ব্যবহার করে বিএনপি বার বার সামনের দিকে এগিয়ে গেছে, দলটির জনপ্রিয়তা বেড়েছে তার সময়েই। তিনি যথন প্রচারণার সমাবেশে মঞ্চে উঠতেন তখন জনস্রোত যেন সমুদ্রের টেউয়ের মতো আন্দোলিত হতো। শ্লোগানের শ্লোগানে সরব থাকতো নেতা-কর্মীরা। ম্যাডামের সামনে দলের প্রার্থীরা বক্তব্য দিতেন, ম্যাডাম প্রার্থীদের বক্তব্যে সমাবেশের মানুষের রেসপন্স দেখে আঁচ করতে পারেতেন কোনো প্রার্থী কি অবস্থা? কিন্তু এবারকার দৃশ্যপট ভিন্ন।
তিনি বলেন, তারেক রহমানকে দেখতে মানুষের আগ্রহ আপনারা দেখছেন। তবে তিনি যখন আসেন তার উপস্থিতিতে কী প্রার্থীদের বক্তব্য দেয়া দেখেছেন? দেখেননি। কারণ মানুষ শুধু তারেক রহমানের কথাই শুনতে চাই। তার বক্তৃতার স্টাইলই আলাদা।
হাফিজ বলেন, আমার বউ মা এবং নাতি দুইজন তারেক রহমানেকে ভীষণ লাইক করে। তাদেরকে বলেছিলাম, কেনো? তারা বললো, তারেক রহমান গতানুগতি ধারার রাজনীতিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছেন। দেশের নেতৃত্ব দেবেন আপনি? আপনার পরিকল্পনাটি বলুন, বাস্তবায়ন কীভাবে করবেন বলুন? নিউ জেনারেশনের এটি নিউ থট, আই অলসো লাইক দিস।
তারেক রহমান সিলেট থেকে শুরু করেছিলেন নির্বাচনী প্রচারাভিযান। বাবা জিয়াউর রহমান ও মা বেগম খালেদা জিয়া দুই জনই রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন, দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তা্রা নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু করতেন সিলেট থেকে হয়রত শাহ জালাল (রহ) ও হয়রত শাহ পরান(রহ) মাজার জিয়ারত করে। তারেক রহমানও বাবা-মায়ের পথ ধরে ২১ জানুয়ারি রাতে সিলেট আসেন। মাজার জিয়ারত করে সেই ঐতিহাসিক আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে জনসভা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রী রোকেয়া বেগম বলেন, সিলেটে ম্যাডাম যখন আসতেন তখনও সিলেট মিছিলের শহর ছিলো, এবারও তারেক রহমান এসেছেন সিলেটে মানুষের ঢল নেমেছে আগেরই মতো। এই পুণ্যভূমি বিএনপির ঘাঁটি। এখানকার মানুষ ধর্মপ্রাণ কিন্তু ধর্মান্ধ না। সেজন্য বিএনপির সমর্থন সিলেটে বেশি। তবে এবার তারেক রহমানের সিলেটে আসা নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এক তিনি আমাদের সিলেটিদের জামাই যাকে ভালো বাংলায় বলা যায় পরম আত্বীয়। তিনি ১৭ বছর পর সিলেটে আসছে সেজন্য সিলেটিদের আলাদা আগ্রহ আছে বৈকি। তাই বলে বেগম খালেদা জিয়াকে পেছনে ফেলা যাবে না। সত্যিকার অর্থেই জিয়া পরিবারের ক্রেজ আলাদা মাত্রায় নিয়ে গেছে বিএনপিকে।
তারেক রহমান এই পর্যন্ত তিনটি নির্বাচনী প্রচারাভিযান করেছেন। একটি সিলেট থেকে শুরু করে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাক্ষণবাড়ীয়া, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়নগঞ্জ হয়ে ঢাকা। দ্বিতীয়টি চট্টগ্রা্ম থেকে ফেনী,কুমিল্লা, নারায়নগঞ্জ হয়ে ঢাকা এবং সর্বশেষটি ময়মনসিংহ থেকে গাজীপুর, ঢাকার উত্তরা হয়ে ঢাকা।
বৃহস্পতিবার রাজশাহী থেকে নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু করবেন তারেক রহমান। শহরে সমাবেশ করে নওগাঁও হয়ে বগুড়ায় আসবেন তিনি। এই তিনটির প্রচারাভিযানে দেখা গেছে যে, ব্যাপক মানুষের উপস্থিতির কারণে তারেক রহমান প্রতিটি সমাবেশে আসতে ৩/৫ ঘন্টা বিলম্ব হয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত মানুষজন বসে ছিলো তারেক রহমানের অপেক্ষায়।