শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড ঠেকাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম জুয়েলকে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহমেদের বিরুদ্ধে।
এ নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস, প্রতিবাদে দুপুরের পর থেকে চলেছে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ।
বুধবার সকাল ৯টার দিকে নিয়োগ বোর্ডে উপস্থিত হওয়ার জন্য বিভাগের সভাপতি ঝিনাইদহের নিজ বাসা থেকে বের হলে তাকে সাহেদ একটি বাইকে তুলে নেন বলে জানা গেছে। সিসিটিভি ফুটেজে একটি মোটরসাইকেলে সাহেদকে হেলমেট পরিহিত অবস্থায় চালকের ভূমিকায় থেকে ওই শিক্ষককে পেছনে বসিয়ে নিয়ে যেতে দেখা যায়। এরপর থেকে ওই শিক্ষকের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেলে তিনি অপহৃত হয়েছেন বলে দাবি করে ওই শিক্ষকের পরিবার।
এদিকে এর প্রতিবাদে দুপুর ১টা থেকে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে উভয়পাশের গেটে তালা দিলে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আটকে পড়েন।
প্রতিবেদন লেখার সময় বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। পরে শাপলা ফোরাম, বঙ্গবন্ধু পরিষদসহ আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সব সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, যেকোনো পরিস্থিতিতে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু রাখা, আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে অপহরণের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার নিশ্চিত, আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে বিগত সময়ের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ ও ট্যুরিজম বিভাগের সভাপতিকে বুধবার রাত ৮টার মধ্যে ক্যাম্পাসে হাজির করার দাবি জানিয়ে কর্মসূচি স্থগিত করেন।
জানা যায়, বুধবার সকাল ১০টায় বিভাগের প্রভাষক নিয়োগ নির্বাচনী বোর্ড থাকায় ট্যুরিজমের সভাপতি শরিফুল ইসলাম সকাল ৮টার দিকে বাসা থেকে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে বের হন। এ সময় ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহমেদ তাকে মোটরসাইকেলে উঠিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান।
এদিকে সকাল ১০টায় বোর্ডের সময় নির্ধারিত থাকলেও ঘণ্টাখানেক পরে বিভাগের সভাপতি ছাড়াই বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়ে লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়। পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা আটকে পড়ায় এখনো পর্যন্ত মৌখিক পরীক্ষা হয়নি।
এদিকে অপহরণের বিষয়টি প্রথমে সাংবাদিকদের কাছে অস্বীকার করলেও পরে বেলা ১টার দিকে সাহেদ ওই শিক্ষককে তার বাসায় পৌঁছে দিয়ে ফেসবুকে লেখেন- ‘জুয়েল নিরাপত্তাহীনতায় থাকায় আমাকে সকালে ফোন দিয়েছিল এবং আমি নিজে সশরীরে গিয়ে তাকে নিয়ে আসি।’
পরে তিনি ওই শিক্ষকের বাসায় থাকা অবস্থায় তাকে নিয়ে লাইভে এলে ওই শিক্ষক লাইভে বলেন, ‘আমি বাসায় নিরাপদে আছি, আমাকে কেউ অপহরণ করেনি।’
পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঝিনাইদহ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সর্বশেষ বিকেল সাড়ে ৫টায় তাকে ক্যাম্পাসে আনতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির একটি টিমকে সেখানে পাঠানো হয়েছে।
শরিফুল ইসলামের ছোট ভাই জাহিদ সোহেল জানান, সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ডে উপস্থিত হওয়ার জন্য কল দিলেও তিনি অসুস্থ থাকায় প্রথমে যেতে পারবেন না বলে জানিয়েছিলেন; কিন্তু বারবার কল দেওয়ায় পরে তিনি অসুস্থ অবস্থায় ক্যাম্পাসের উদ্দেশে বেরিয়ে যান। পরে একটা মোটরসাইকেলের শব্দ শুনে তারা সেটাকে ক্যাম্পাসের গাড়ি ভেবেছিলেন; কিন্তু এর প্রায় আধঘণ্টা পর হাসমত নামের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গাড়িচালক কল দিয়ে তাকে নিতে আসার কথা জানালে ‘তিনি আগেই চলে গেছেন’ বলে জানায় পরিবার। এরপর থেকে তার নিজস্ব ও অফিসের মোবাইল নম্বরে কল দিলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে সিসিটিভি ক্যামেরায় ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদকে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার ফুটেজ পাওয়া গেলে অপহরণের বিষয়টি জানাজানি হয়।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, জুয়েল সকালে আমাকে ফোন দিয়ে তার নিরাপত্তাহীনতার কথা জানালে আমি তাকে নিয়ে আসি। পরে আমি তাকে আবার তার বাসায় রেখে এসেছি। অপহরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে তিনি কোনোভাবেই বাসা থেকে তুলে নিয়ে যেতে পারেন না। তদন্ত কমিটি করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মাহফুজ আফজাল বলেন, আমরা পৃথকভাবে উভয়কেই জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী তারা পরস্পর মিউচুয়াল আন্ডারস্টান্ডিংয়ের মাধ্যমে গিয়েছিলেন। এখানে অপহরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমরা তাকে পরিবারের জিম্মায় দিয়ে দেব।