Image description
 

বিমা খাতে ইতিবাচক ভাবমর্যাদা গড়ে তোলা, সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভালো পারফরম্যান্সকারী বিমা কোম্পানিগুলোর অবদানকে স্বীকৃতি দিতে ‘আইডিআরএ ইন্স্যুরেন্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ প্রবর্তন করেছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। আর সেই অ্যাওয়ার্ডই পেতে যাচ্ছে ব্যাংকাসুরেন্সসহ নানা কাজে বিতর্কের জন্ম দেওয়া গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ‘আইডিআরএ ইন্স্যুরেন্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ এর জন্য মনোনীত করেছে লাইফ ও নন-লাইফ মিলিয়ে ১৩টি প্রতিষ্ঠানকে। গত ১৮ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত ঘোষণা দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। আইডিআরএ’র ঘোষণা দেওয়া ওই ১৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিতর্কিত গার্ডিয়ান লাইফও রয়েছে। কোন মানদণ্ডে, কীভাবে এবং কোন তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে গার্ডিয়ান লাইফকে নির্বাচন করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি কর্তৃপক্ষের কাছে।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া গার্ডিয়ান লাইফকে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করায় বিমা খাতজুড়ে বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিমা আইন লঙ্ঘন, ব্যাংকাসুরেন্স নীতিমালা পরিপন্থি কর্মকাণ্ড এবং পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে কর্মী হয়রানি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আর্থিক ক্ষতিসাধনের অভিযোগও রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়া কিংবা দীর্ঘদিন সিইও পদ শূন্য রাখার মতো গুরুতর অনিয়ম থাকা সত্ত্বেও এই প্রতিষ্ঠানকে ‘এক্সিলেন্স’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া পলিসি তামাদিতেও এগিয়ে আছে গার্ডিয়ান লাইফ। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত আইডিআরএ’র প্রতিবেদন অনুযায়ী দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) তিন মাসে কোম্পানিটির পলিসি বন্ধ হয়েছে ৬ হাজার ১’শ ৫৪টি। শুধু তাই নয়, মোটা অংকের বিমা দাবিও বকেয়া রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী গার্ডিয়ান লাইফের বকেয়া বিমা দাবির পরিমাণ ১০ কোটি ৯ লাখ টাকা।
খাদের কিনারায় থাকা বিমা খাতকে পুনঃরুদ্ধারে ব্যাংকাসুরেন্স একটি সম্ভাবনাময় নতুন দিগন্ত হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অতি আগ্রাসী ও অনিয়মতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের কারণে তা আজ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাংকাসুরেন্স মূলত ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প ব্যয়ে, স্বচ্ছতা বজায় রেখে ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে বীমা পলিসি বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে এ ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল। কিন্তু এই ব্যবস্থাপনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখাচ্ছে কোম্পানিটি। ব্যাংকাসুরেন্সের জন্য নীতিমালায় তিনটি ব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারিত্ব, কমিশন সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ এবং ব্যাংকের বাইরে কোনো ধরনের বাড়তি সুবিধা না দেওয়ার যে শর্ত স্পষ্ট করে দেওয়া আছে, গার্ডিয়ান লাইফ তা উপেক্ষা করছে বলেই অভিযোগ উঠেছে।

সম্ভাবনাময় এই নতুন দিগন্ত অতিরিক্ত লোভে ধ্বংস করছে গার্ডিয়ান লাইফ। ব্যাংকের শাখাগুলোতে গার্ডিয়ানের কর্মকর্তাদের দিয়ে বীমা ব্যবসা করায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাংকাসুরেন্সের মূলনীতি। এ ধরনের অনৈতিক প্রতিযোগিতা শুধু আর্থিক পরিবেশকে দূষিত করছে না, বরং ব্যাংকের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামোতেও বিরূপ প্রভাব পরছে। এমনকি গার্ডিয়ানের দেওয়া অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন ব্যাংকারদেরও লোভী করে তুলছে। এই অসম প্রতিযোগিতায় অন্য বীমা কোম্পানি জড়িয়ে পরলে হুমকির মুখে পরবে পুরো বীমা খাত।

খোঁজ নিয়ে ব্যাংকিং সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক কর্মকর্তাদের নির্ধারিত কমিশন ছাড়াও অতিরিক্ত ইনসেনটিভ, নগদ অর্থ, আইফোন, মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে বিদেশ ভ্রমণের অফার পর্যন্ত দিয়েছে শুধুমাত্র তাদের পণ্য বিক্রির লক্ষ্যে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গার্ডিয়ান লাইফ তাদের নিজস্ব কর্মকর্তা ও সেলস স্টাফদের ব্যাংকের ভেতরে বসিয়ে পলিসি বিক্রির কাজ করছে- যা ব্যাংকাসুরেন্সের মূলনীতির পরিপন্থী।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গার্ডিয়ান লাইফের এসব অনিয়মতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করে আছে বিমা উন্নয়নও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কর্মকাণ্ডে বিমা খাতের সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। অনেকে বলছেন, প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ড করার পরও গার্ডিয়ান লাইফকে ‘ইন্স্যুরেন্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডের’ জন্য মনোনীত করা একপেশে সিদ্ধান্ত। এতে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সততা এবং নিরপেক্ষতা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগে অনিয়ম করায় জীবন বিমা কোম্পানি গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। প্রায় চার বছর ধরে সিইও নিয়োগ না দিয়ে বিমা কোম্পানিটি বিমা আইন-২০১০ এর ৮০ ধারা লঙ্ঘন করায় সম্প্রতি এ জরিমনা করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি চিঠি গার্ডিয়ান লাইফের চেয়ারম্যানকে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রায় ৫ বছর ধরে গার্ডিয়ান লাইফে সিইও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এতে বিমা আইন-২০১০ এর ৮০ ধারা লঙ্ঘন করায় বিমা আইন-২০১০ এর ১৩০(খ) ধারা মোতাবেক কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) ১৭৮তম সভায় পাঁচ লাখ টাকা জারিমানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ খালি থাকার পর, সম্প্রতি গার্ডিয়ান লাইফসহ মোট পাঁচটি বীমা কোম্পানির সিইও নিয়োগ অনুমোদন দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) আইডিআরএ’র সিইও নিয়োগ অনুমোদন করে। এতে সিইও হিসেবে কোম্পানিটির কর্মকর্তা শেখ রকিবুল করিমের নিয়োগ অনুমোদন করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। আগামী তিন বছরের জন্য এ নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

পারফরম্যান্সে স্বীকৃতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ১৩ বিমা কোম্পানিকে দেওয়া অ্যাওয়ার্ড’র ঘোষণা আসে ১৮ জানুয়ারি রোববার আইডিআরএ’র নির্বাহী পরিচালক মনিরা বেগম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে বলা হয়, কর্তৃপক্ষের ১৯২তম সভার সিদ্ধান্তের আলোকে লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর সার্বিক সুশাসন, আর্থিক শৃঙ্খলা ও বিভিন্ন সূচকে পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে এই পুরস্কারের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। কোন মানদণ্ডে, কীভাবে এবং কোন তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে গার্ডিয়ান লাইফকে এই এওয়ার্ডের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে সে বিষয়ে জানতে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) পরামর্শক (মিডিয়া ও যোগাযোগ) ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমিকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এই বিষয়ে তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

শীর্ষনিউজ