অস্থির হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে র্যাবের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক আব্দুল মোতালেব নিহত হয়েছেন। তিনি ডেপুটেশনে বিজিবি থেকে র্যাবে যোগ দিয়েছিলেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। এ ছাড়া জিম্মি হওয়া র্যাবের তিন সদস্য ও এক সোর্সকে উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার পর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। র্যাব এ হামলার জন্য অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে খ্যাত সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের ‘স্থানীয় সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেছে।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, র্যাবের ওপর হামলার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। যৌথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
র্যাব ও পুলিশ সূত্রের দাবি, সেখানে থাকা সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি প্রকাশ্যে গুলি চালানো হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় আব্দুল মোতালেবকে সামরিক হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। বাকি আহত চারজন সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীতে অবস্থিত এই জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের জন্য মাথাব্যথার কারণ। ৩ হাজার ১০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই এলাকাটি মূলত ‘নিষিদ্ধ নগরী’ হিসেবে পরিচিত। গত চার দশক ধরে পাহাড় কেটে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এই অবৈধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে সেখানে গড়ে উঠেছে দুর্ধর্ষ সব সন্ত্রাসী বাহিনী।
এই অপরাধ সাম্রাজ্যের নেপথ্যে রয়েছে মূলত দুটি পক্ষ। ‘আলীনগর বহুমুখী সমিতি’র নেতৃত্বে রয়েছেন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ইয়াসিন মিয়া এবং ‘মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’ নিয়ন্ত্রণ করছেন কাজী মশিউর ও গাজী সাদেক। প্রায় ৩০ হাজার সদস্যের এই জনপদে প্রবেশের জন্য বিশেষ পরিচয়পত্র লাগে। বহিরাগত তো বটেই, এমনকি প্রশাসন ও পুলিশের প্রবেশাধিকারও এখানে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, র্যাব-৭-এর একটি আভিযানিক দল সোমবার সন্ধ্যায় জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল আবাসিক এলাকায় অভিযানে প্রবেশ করে। কিন্তু প্রবেশের মুখেই র্যাবের গাড়িটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত আক্রমণের মুখে পড়ে। পাহাড়ের সুবিধাজনক স্থানে অবস্থান নেওয়া সন্ত্রাসীরা আগ্নেয়াস্ত্র, ইটপাটকেল ও লাঠিসোঁটা নিয়ে র্যাবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা র্যাব সদস্যদের ঘিরে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে। এতেই গুলিবিদ্ধ হন র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব। বিশৃঙ্খলার মধ্যে সন্ত্রাসীরা তিন র্যাব সদস্য ও এক সোর্সকে ধরে পাহাড়ে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে জিম্মি সদস্যদের উদ্ধার করে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, র্যাবের সদস্যরা অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। আহত সদস্য ও সোর্সদের উদ্ধার করা হয়েছে, তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে একজন র্যাব সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ওই সদস্যের নাম ডিএডি মোতালেব বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে রাতেই অভিযানে নামে যৌথ বাহিনী।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম জানান, হামলার খবর পেয়েই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং বর্তমানে সেখানে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করে অভিযান চালানো হচ্ছে।
প্রশাসনের ভাষ্যমতে, প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনা এখানে নতুন নয়। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক এবং সীতাকুণ্ড থানার তৎকালীন ওসি তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছিলেন।
এর আগে ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি র্যাবের সঙ্গে এবং একই বছরের ২ আগস্ট ও ৮ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ওপর একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটে। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি সম্প্রতি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েও সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা।
পাহাড়ের প্রবেশমুখে থাকা পাহারাদারদের সংকেত পেয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আগেভাগেই পাহাড়ের ওপর অবস্থান নেয় এবং অতর্কিত হামলা চালায়, যা এবারের র্যাবের অভিযানেও দেখা গেছে। বর্তমানে পুরো এলাকাটি যৌথ বাহিনী ঘিরে রেখেছে এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনীতির পটপরিবর্তনের পর এ এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ, খুনোখুনির ঘটনা ঘটে চলছে। চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনো পাহাড় কেটে চলছে প্লট বাণিজ্য। আর এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। এলাকাটি সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে এসব সন্ত্রাসী। বাসিন্দাদের প্রবেশের জন্য রয়েছে পরিচয়পত্র। বাসিন্দা ছাড়া বাইরের কেউ এলাকায় ঢুকতে পারে না। এমনকি পুলিশ, জেলা প্রশাসনের লোকজনও এলাকায় প্রবেশ করতে গিয়ে অনেকবার হামলার শিকার হয়েছেন।
স্থানীয় তথ্যমতে, সম্প্রতি এলাকায় দখল-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, গোলাগুলি হয়। এতে একজন নিহত হন। পরদিন সেখানে প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারধরের শিকার হয়েছেন দুই সাংবাদিক।
উল্লেখ্য , চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি। এর বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গায় জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। সীতাকুণ্ডে এটির অবস্থান হলেও এটি অনেকটা নগরের ভেতরেই। এর পূর্ব দিকে রয়েছে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ থানা।
র্যাব-৭ সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এ আর এম মোজাফফর হোসেন গণমাধ্যমে বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনার সময় সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন র্যাব সদস্যরা। এতে চারজন গুরুতর আহত হন। এর মধ্যে একজন র্যাব সদস্য নিহত হন চিকিৎসাধীন অবস্থায়। বাকি তিনজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
র্যাব সদরদপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, বিকালে জঙ্গল ছলিমপুরে র্যাব-৭ অভিযানে যায়। সেসময় ‘স্থানীয় সন্ত্রাসীরা’ র্যাব সদস্যদের ওপর ‘অতর্কিত হামলা’ চালায়।