Image description

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আর ২২ দিন বাকি। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের কাউন্টডাউন। নতুন সরকারকে বরণের প্রস্তুতিও চলছে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তর ও অধিদপ্তরে। দাপ্তরিক কার্যক্রমে স্থবিরতা এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অনুবিভাগসহ বিভিন্ন দপ্তর ঘুরে এমন দৃশ্য চোখে পড়ছে।


অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেড় বছর অতিবাহিত হলেও প্রশাসনিক সংস্কার হয়েছে নামেমাত্র। আমলাতন্ত্র আর 'লালফিতা'র দৌরাত্ম্য রয়ে গেছে আগের মতোই। জনভোগান্তি কমেনি, ক্ষেত্রবিশেষে বেড়েছেও। প্রশানিক কাজে নিরপেক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি আর দাবি আদায়ের নামে প্রশাসনকে অচল করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে এ সময়ে।


জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে বিশাল সুযোগ তৈরির পরও প্রশাসনিক সংস্কার - না হওয়ার জন্য সরকারের দুর্বল পদক্ষেপ ও আমলাতন্ত্রের ওপর অতিমাত্রায় ভরসা করাকে দায়ী করছেন সাবেক আমলারা। পাশাপাশি আমলাতন্ত্রকে নিজেদের পক্ষে নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর অসুস্থ প্রতিযোগিতাকেও দায়ী করছেন তারা।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলেন, তিন ধারায় বিভক্ত প্রশাসন দেশ ও জাতির স্বার্থ রক্ষার চেয়ে পদোন্নতি, পদায়ন ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে পুরো সময় পার করে। সম্ভাব্য ক্ষমতাসীনদের কাছে ঘেঁষে পদ টিকিয়ে রাখা ও নতুন পদে বসার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে আরো আগে।


তবে, প্রশাসনেরে সব স্তরে স্থবিরতা বিরাজ করছে- এমনটি মানতে নারাজ খাদ্য মন্ত্রণালয় ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসন সাজানোর দায়িত্ব পালনকারী এ উপদেষ্টা আমার দেশকে বলেন, প্রশাসনে আমরা কোনো ধরনের স্থবিরতা দেখতে পাচ্ছি না। সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে বর্তমান প্রশাসন। সবাই এখন নির্বাচনমুখী হওয়ায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম মনে হতে পারে।


মুয়ীদ কমিশনের প্রস্তাবনায় ক্ষুব্ধ প্রশাসন
জনপ্রশাসনকে অন্তর্বর্তী সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে মুয়ীদ কমিশন- এমন অভিযোগ প্রশাসনের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের। জনপ্রশাসনকে সরকার থেকে দূরে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের অপরিপক্ক ও অন্যায্য প্রস্তাবনাকে দায়ী করেন তারা। এ বিষয়ে একাধিক সচিব আমার দেশকে জানান, জুলাই বিপ্লবে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এর কয়েক দিনের মাথায় গণমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে সাবেক সচিব আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এ কমিশন ওই বছরের ১৭ডিসেম্বর সচিবালয়ে একটি সভায় খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করে। এতে বলা হয়, পরীক্ষা ছাড়া সিভিল সার্ভিসের উপসচিব এবং যুগ্ম-সচিব পর্যায়ে কেউ পদোন্নতি পাবেন না। পাশাপাশি উপ-সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য ৫০ এবং অন্য ক্যাডার থেকে ৫০ শতাংশ কর্মকর্তাদের নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ৭৫ শতাংশ এবং অন্য ক্যাডার থেকে ২৫ শতাংশ কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়ে থাকেন। এছাড়াও জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের মতো স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে ক্যাডার সার্ভিস থেকে আলাদা করার প্রস্তাব করা হয় ওই খসড়ায়। সেই সঙ্গে প্রশাসন ক্যাডারের বাইরে ২৭টি ক্যাডারকে পাঁচটি গুচ্ছ ক্যাডার করে সুপারিশ করার কথা বলা হয় খসড়া প্রস্তাবনায়।


সচিবরা আরো জানান, মুয়ীদ কমিশনের এ প্রস্তাব প্রশাসন ক্যাডারের সব ঘরের কর্মকর্তাদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। নিজেদের মধ্যকার ভেদাভেদ ভুলে সবাই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় এক কাতারে চলে আসে এবং খসড়া প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনকে টিকিয়ে রেখে সুবিধা নেওয়া কর্মকর্তা এবং ওই আমলের বঞ্চিত ও হয়রানির শিকার কর্মকর্তাদের মাঝখানের দেয়ালটি আর থাকল না। এক পর্যায়ে জনপ্রশাসনে অচলাবস্থার তৈরি হয়।

গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, এই অচলাবস্থা আর কাটিয়ে ওঠা সরকারের পক্ষে সম্ভব হয়নি।


সম্পদের হিসাব চেয়ে বিরাগভাজন সরকার
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. মো. মোখলেস উর রহমানকে। ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের হিসাব দিতে বলা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও এটি তাদের ভীষণভাবে নাড়া দেয়। ওইদিন সিনিয়র সচিব কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে সাংবাদিকদের বলেন, 'সম্পদের হিসাব জমা না দিলে খবর আছে, সোজা কথা। আইনানুগ খবর আছে।'


সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকরা স্বাগত জানালেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভালোভাবে নেয়নি বলে জানান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আমার দেশকে ওই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এর মধ্যে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তা প্রায় এক লাখ ১১ হাজার। দশম থেকে ১২তম গ্রেডের কর্মকর্তা দুই লাখ ৯৩ হাজার। ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের কর্মচারী ৬ লাখ ২১ হাজারের মতো এবং ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী তিন লাখ ১৪ হাজারের কিছু বেশি। এত বিপুল পরিমাণ কর্মকর্তা-কর্মচারীর হিসাব বিবরণী নেওয়া ও সেগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করার মতো সক্ষমতা ওই সময়ে সরকারের ছিল না। ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি ভীতির সৃষ্টি করে।
তিনি আরো বলেন, বিদ্যমান সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা অনুযায়ী পাঁচ বছর পরপর সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদ বিবরণী দাখিল এবং স্থাবর সম্পত্তি অর্জন বা বিক্রির অনুমতি নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন এ বিধান মানেননি।  এটি বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করার বিষয়ে এর আগে কোনো সরকারই উদ্যোগ কিংবা তদারকি করেনি। এ ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারকে নিজেদের * বিপক্ষ শক্তি মনে করতে থাকেন সরকারি চাকরিজীবীরা। তাদের ধারণা রাজনৈতিক সরকার এলে হয়তো এ ধরনের ঝামেলায় আর পড়তে হবে না।

দ্বৈত নাগরিকত্ব ও বিদেশে পরিবারের তথ্য
বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা চাকরিবিধি লংঘন করে অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন। পাশাপাশি ওইসব দেশে স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের সদস্যদের স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৃথকভাবে চিঠি দিয়ে তথ্য চেয়েছে। আমার দেশকে এ নিশ্চিত করেছেন দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তবে, এ চিঠির ভিত্তিতে অনুসন্ধান তো দূরের কথা কোনো তথ্য দেওয়ার বিষয়েও আগ্রহ দেখায়নি মন্ত্রণালয় দুটি।

দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, কয়েক হাজার সরকারি কর্মকর্তার বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে, তাদের পরিবারের সদস্যরা - উন্নত দেশগুলোতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। প্রথমে তারা তাদের সন্তানদের পড়ালেখার জন্য পাঠিয়েছেন। পরে ধীরে ধীরে তারা সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন। তাদের কেউ কেউ নাগরিকত্বও নিয়েছেন। এদের মধ্যে রাজস্ব কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত প্রকৌশলীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।


তিনি আরো বলেন, এমন কর্মকর্তাদের তথ্য চেয়ে দুদকের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। মন্ত্রণালয়গুলো তাদের অধীন বিভাগ, অধিদপ্তর ও উইংয়ে এ বিষয়ে নিজ নিজ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে আমাদের জানাতে বলা হয়েছে ওই চিঠিতে। এখনো পর্যন্ত ওই চিঠির জবাব আসেনি বলে জানান তিনি।


এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, আমরা দুদকের এমন একটি চিঠির কথা শুনেছি। দুদকের এমন উদ্যোগ দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে এ কর্মকর্তা জানান, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে বিদেশে নাগরিকত্ব রয়েছে কি না, সেখানে সন্তানরা পড়ছে কি না বা সেখানে কর্মকর্তাদের সম্পদ রয়েছে কি না- এমন তথ্য উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা থাকাটা জরুরি। এ বিষয়গলো 

 

সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় নেওয়া হলে সবার মধ্যে একটি বার্তা যেত। তিনি বলেন, প্রশাসনকে বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন এমন কর্মকর্তাদের বেশিরভাগেরই সন্তান ও পরিবারের সদস্যরা বিদেশে বসবাস করছেন। তারা শুধু চাকরির জন্যই এ দেশে রয়েছেন। চাকরি শেষে তাদের বেশিরভাগই পরিবারের কাছে চলে যাচ্ছেন। দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য এটি বড় ধরনের বাধা। এ ধরনের কর্মকর্তাদের প্রভাবের কারণেই এখন প্রশাসনজুড়ে স্থবিরতা বিরাজ করছে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।


উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ে আমলাতন্ত্র ক্ষমতাবান
অন্তর্বর্তী সরকার ও আমলাতন্ত্রের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উপদেষ্টা পরিষদের তুলনায় আমলাতন্ত্র ক্ষমতাবান হওয়ায় সরকার নতিস্বীকার করেছে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ে আমলাতন্ত্রের একটি অংশ বেশি প্রভাবশালী। উপদেষ্টা পরিষদ কোন কাগজে স্বাক্ষর করবে, কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, সেটি আসলে উপদেষ্টা পরিষদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এ সিদ্ধান্ত নেন আমলাতন্ত্রের ভেতরের। অত্যন্ত ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা।'
তিনি বলেন, আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী মহলের অন্তর্ঘাতমূলক অপশক্তির কাছে সরকার নতিস্বীকার করেছে। ফলে সংস্কার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।

ত্রিধাবিভক্ত প্রশাসন
বিপুল জনমত নিয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পরও প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরাতে না পারার জন্য সরকারের দুর্বল নীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতা ও নিজেদের লোক বসানোর প্রতিযোগিতাকে দায়ী করছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।


তাদের মতে, জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পরও তার রেখে যাওয়া প্রশাসনকে কিছুটা কাটছাঁট করে প্রশাসন সাজায় অন্তর্বর্তী সরকার। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের উপরের দিকে রদবদল হলেও অধিকাংশ মন্ত্রণালয় আগের অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়। এতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদোন্নতি বঞ্চিতদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। পাশাপাশি সুবিধা আদায়ে জোরেশোরে মাঠে নেমে পড়ে বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। আন্তঃক্যাডার দ্বন্দ্ব কোনো কোনো পর্যায়ে সংঘাতেও রূপ নেয়। মন্ত্রণালয়ের বাইরেও অধিদপ্তরগুলো পুরোপুরিই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রভাবাধীন থেকে যায়।


গত সাড়ে ১৫ বছর বঞ্চিত থেকে ক্ষোভ ও চরম হতাশা নিয়ে সম্প্রতি অবসরে যাওয়া একজন সচিব আমার দেশকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার কিছু ভালো পদক্ষেপ নিলেও সেগুলো জুলাই বিপ্লবে বিশ্বাসী ও দক্ষ কর্মকর্তার অভাবে কার্যকর হয়নি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেগুলোকে পুঁজি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের টানা স্বৈরশাসনের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের নিজ নিজ পদে বহাল রাখা অন্তর্বর্তী সরকারের বড় ধরনের ভুল পদক্ষেপ ছিল উল্লেখ করে অবসরপ্রাপ্ত ওই সচিব বলেন, সরকারের উচিত ছিল আগের সরকারের অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের চিহ্নিত করে কমপক্ষে পাঁচশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে দেওয়া। এতে দেশের আমলাতন্ত্র একটি সঠিক কাঠামো ও ভিত্তির ওপর দাঁড়াত। এটি দেশের ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য একটি শিক্ষা হতো। এটি না করায় উল্টো সরকারই তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে।


অপর একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রার শুরুর দিন থেকেই প্রশাসনে তিনটি বলয় তৈরি হয়। প্রথম বলয়টি হচ্ছে দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগীরা। এটিই শেষ পর্যন্ত টিকে যায়। অপর দুটি বলয় তৈরি হয় বিএনপি ও জামায়াতপন্থি কর্মকর্তাদের নিয়ে। গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে লোক বাছাইয়ের শুরুতে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। এদের দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়েছেন পূর্ব থেকে ওই পদে থাকা আওয়ামীপন্থি ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া কর্মকর্তা। এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে বলেও জানান সাবেক এ শীর্ষ আমলা।
সরকারের দুএকজন উপদেষ্টা বিগত সরকারের আমলের কর্মকর্তাদের নিজ নিজ পদে বহাল রাখার পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছেন বলেও জানান ওই সচিব। তিনি বলেন, রাজনৈতিক কারণে কর্মকর্তাদের শাস্ত্রির বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া উপদেষ্টারা যুক্তি দিয়েছেন-এমনটি করলে ভবিষ্যতে আরো খারাপ নজির স্থাপিত হবে।
ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া আমার দেশকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে একটি ভঙ্গুর প্রশাসন পেয়েছে। এ ভঙ্গুর প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর জন্য যে ধরনের দক্ষ, যোগা এবং অভিজ্ঞ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা প্রয়োজন ছিল, সেক্ষেত্রে বাছাই করে নিয়োগ দিতে ভুল করেছে। এসব কর্মকর্তা সরকারের নীতি-নির্ধারকদের সঠিক পরামর্শ না দিয়ে ভুল পরামর্শ দিয়েছেন। এসব কারণে আয়ে আয়ে প্রশাসনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের সভাপতি ও সাবেক সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার বলেন, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের দোসরদের অব্যাহতভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন। সরকার জনপ্রশাসনকে দক্ষতা ও সূচারুভাবে পরিচালিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। এটার খেসারত পুরো জাতিকে দিতে হচ্ছে এখন। 

নতুন সরকারের অপেক্ষায় প্রশাসন

প্রশাসনের মূল কেন্দ্র সচিবালয়সহ  সরকারি দপ্তরগুলোতে এখন আলোচনার প্রধান বিষয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আর নতুন সরকার। তফসিল ঘোষণার পর থেকে নীতি নির্ধারণী বিষয়গুলো এখন নির্বাচন কমিশনের হাতে। মন্ত্রণালয়গুলো কিছু রুটিন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য মন্ত্রণালয়গুলোতে অনেকটাই স্থবির অবস্থা বিরাজ করছে। গত কয়েকদিন ধরে এমন দৃশ্য চোখে পড়েছে সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ঘুরে।


এমন ঘটনাকে দেশের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জুলাই বিপ্লবের পর অনেক বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল পুরো প্রশাসন রাজনৈতিক কবল থেকে মুক্ত হবে। এটি আর হলো না। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে প্রশাসনই চায়নি। একই ঘটনা আগের আমলেও দেখা গেছে।


আমলাতন্ত্রকে রাজনীতি থেকে বের করতে না পারলে কোনোভাবেই কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় উল্লেখ করে মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া আমার দেশকে বলেন, গত সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে দেশের আমলাতন্ত্রের ওপর দিয়ে বঝড় বয়ে গেছে। প্রশাসনকে পুরো রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করা হয়েছে। এটার জন্য পুরো প্রশাসন কিংবা আমলাতন্ত্র দায়ী নয়। কিছু সুবিধাভোগী কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থে রাজনীতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এ সরকারের সময় এ ধারা থেকে বের হয়ে আসার অনেক সুযোগ ছিল। কিন্তু সরকারের কিছু ভুল নীতি ও অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত পুরো ব্যবস্থাকে লেজেগোবরে অবস্থায় নিয়ে গেছে।


ফিরোজ মিয়া বলেন, নির্বাচনের আর কয়েকদিন বাকি। কর্মকর্তারা এখন আগের সেই ধারায় বসে আছে। এটি আগামী সরকারের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। এ চ্যালেঞ্জ থেকে নতুন সরকার বের হতে না পারলে দেশ দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়বে। কারণ, সরকার নীতি গ্রহণ করে। আর তা বাস্তবায়ন করে আমলাতন্ত্র। সরকার যাবে, সরকার আসবে। কিন্তু আমলাতন্ত্রকে তার গতি ও প্রকৃতি বজায় রাখতে হবে। যেটা আমাদের সামনে আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কর্মকর্তাদের কেউ কেউ পদ ধরে রাখতে আবার কেউ কেউ ভালো পদে বসতে এখন থেকেই সম্ভাব্য ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এমন সংবাদ জাতির জন্য হতাশাজনক।