Image description

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাড়তি সুদহারের প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় যেকোনো দেশের ছোট ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। সে হিসাবে এ ধরনের পরিস্থিতিতে তাদেরই বেশি ঋণখেলাপি হওয়ার কথা। যদিও দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে উঠে এসেছে বিপরীত চিত্র। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ব্যাংক খাতে ১ কোটি টাকার কম এমন ঋণের মধ্যে ১৬ শতাংশ খেলাপি। অন্যদিকে ৫০ কোটি টাকার বেশি এমন ঋণের প্রায় অর্ধেকই খেলাপির খাতায় উঠেছে।

ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের আকারের বিপরীতে খেলাপির হারের চিত্র তুলে ধরে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়, কীভাবে দেশের বড় উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেছেন। তথ্য বলছে, দেশের ব্যাংক খাতের বিতরণকৃত ঋণের ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশই গত বছরের জুন শেষে খেলাপি ছিল। তবে ছোট ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার এ গড় হারের অর্ধেকেরও কম ছিল। ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার ছিল ১৬ শতাংশ। ১ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণে খেলাপির হার ২৬ দশমিক ১ শতাংশ। আর ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণের ক্ষেত্রে ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশই খেলাপির খাতায় উঠেছে। তবে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির এ হার কিছুটা কম, ৩৮ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৪২ দশমিক ১ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণের ক্ষেত্রে এ হার আরো বেশি, ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ। খেলাপির হারের দিক থেকে শীর্ষস্থানে আছে ৫০ কোটি টাকার বেশি অংকের ঋণ। বড় ঋণ হিসেবে স্বীকৃত এ ঋণের ৪৮ দশমিক ২ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের গড় হারের চেয়ে বড় ঋণের খেলাপি প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি।

ব্যাংক নির্বাহীসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ ফেরত দেন। কিন্তু বড় উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেছেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের দেড় দশকে দেশের অর্ধেকের বেশি ব্যাংক থেকে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে ঋণের নামে অর্থ লোপাট করা হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ব্যাংক লুটেরা হিসেবে স্বীকৃত অনেক ব্যবসায়ী দেশ থেকে পালিয়েছেন। আবার কেউ কেউ গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। এ কারণে বড় ঋণ বেশি খেলাপি হয়েছে। বিপরীতে ছোট উদ্যোক্তারা অর্থনীতির স্থবির পরিস্থিতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাড়তি সুদহার মোকাবেলা করেও ব্যাংক ঋণ ফেরত দিচ্ছেন।

দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) সবচেয়ে বেশি ঋণ দেয় ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি। বেসরকারি এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার এখন আড়াই শতাংশেরও কম। এর মধ্যে আবার ছোট ঋণে খেলাপির হার ১ শতাংশের ঘরে বলে জানান ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তারেক রেফাত উল্লাহ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওর ৫০ শতাংশই সিএমএসএমই খাতের। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই খুবই ক্ষুদ্র ব্যবসায় দেয়া হয়েছে। এ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আমাদের আদায়ের হার সবচেয়ে ভালো। ছোট ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে যদি সঠিক ব্যক্তিকে বাছাই করা যায়, তাহলে কোনো ঋণই খেলাপি হওয়ার কথা নয়। আমরা দেখেছি, এ শ্রেণীর উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ পরিশোধের জন্য উদগ্রীব থাকেন।’

তবে ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণ পৌঁছানো সহজ কাজ নয় বলে মন্তব্য করেন এ শীর্ষ নির্বাহী। তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে সফল হতে হলে দেশজুড়ে নেটওয়ার্ক ও সশরীরে উপস্থিতি প্রয়োজন। এ ব্যবসায় ঋণ তত্ত্বাবধান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকৃত টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা ঘনিষ্ঠভাবে দেখতে হয়। এসবের জন্য আমাদের প্রায় ১০ হাজার ২০০ স্থায়ী কর্মী আছে। এর বাইরে আরো সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ আমাদের সঙ্গে কাজ করেন। এ কর্মী বাহিনীর বড় অংশই এসএমই খাতে নিয়োজিত। এতে আয়-ব্যয় অনুপাত তুলনামূলক বেশি হলেও এটাই ব্র্যাক ব্যাংকের সাফল্যের মূল ভিত্তি। শুরুতে এ খাতে বিনিয়োগে অনেকে ভয় পেলেও সময়ের সঙ্গে দক্ষতা বাড়লে খরচ কমে আসবে। তখনই মডেলটা লাভজনক হবে।’

দেশের ব্যাংক খাতে ২০২১ সালের শেষের দিকে সিএমএসএমই ঋণের চেয়েও ক্ষুদ্র ঋণ চালু করে সিটি ব্যাংক পিএলসি। জামানতবিহীন এ ঋণের নাম দেয়া হয়েছে ডিজিটাল ন্যানো লোন বা অতিক্ষুদ্র ঋণ। বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল এ ঋণ নিতে আলাদা কোনো নথিপত্রের প্রয়োজন হয় না। যেকোনো সময় মাত্র কয়েক ট্যাপে তাৎক্ষণিক ৫০০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত এ ঋণ নেয়া যায়। এ ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ মেয়াদ তিন মাস।

সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘অতিক্ষুদ্র এ ঋণ প্রকল্প বিপুল সাফল্য পেয়েছে। এরই মধ্যে ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ডিজিটাল ন্যানো লোন বিতরণ হয়েছে। প্রতিটি ঋণের গড় স্থিতি মাত্র ৪ হাজার টাকা। প্রতিদিন ২৫ হাজারের বেশি গ্রাহক এ সেবা গ্রহণ করছেন। একজন গ্রাহক গড়ে সাতবারের বেশি ঋণ সুবিধাটি উপভোগ করেছেন। গত তিন মাসের গড় ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৫০ কোটি টাকা, যা চলতি মাসে বেড়ে ৫৫০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ৮০ লাখ গ্রাহক এ ঋণ পাওয়ার যোগ্য এবং এখন পর্যন্ত ২১ লাখ গ্রাহক এ সুবিধা ভোগ করেছেন। নির্দিষ্ট সময়ে ফেরত দেয়ায় বর্তমানে ন্যানো লোনের স্থিতি মাত্র ৭১০ কোটি টাকা। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের মধ্যেও ঋণ পণ্যটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অতিক্ষুদ্র এ ঋণে খেলাপির হার মাত্র দশমিক ৭ শতাংশ।’

দেশের ব্যাংক খাতের দুর্দশার মধ্যেও সিটি ব্যাংক অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। এ বিষয়ে মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘ঋণের ক্ষেত্রে সঠিক গ্রাহক বাছাই করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। গত দেড় দশকে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক বিপর্যয়ের মধ্যেও আমরা করপোরেট সুশাসন মেনে চলেছি। সঠিক গ্রাহককে ঋণ দেয়ায় আমাদের খেলাপি ঋণের হার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বড় গ্রাহক নয়, বরং ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা এ মুহূর্তে সিএমএসএমই ও রিটেইল খাতকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।’

গত বছরের জুনের পর দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকাই ছিল খেলাপি। সে হিসাবে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশই খেলাপির খাতায় চলে গেছে। খেলাপি ঋণের এ উচ্চ হার এ মুহূর্তে গোটা বিশ্বের মধ্যেই সর্বোচ্চ। এমনকি প্রায় চার বছর ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের চেয়েও বেশি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ দেশের খেলাপি ঋণের হার ২৬ শতাংশ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও খ্যাতিমান গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের যে হার, সেটি এখন গোটা বিশ্বেই সর্বোচ্চ। এমনকি বিশ্বের কোনো দেশেরই খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশের বেশি পাওয়া যায়নি। কয়েক বছর ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দায় থাকা দেশগুলোর খেলাপি ঋণের হারও এখন বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে বিধ্বস্ত হওয়া লেবাননে খেলাপি ঋণের হার ২৪ শতাংশের নিচে রয়েছে। আর ইউক্রেনের সঙ্গে প্রায় চার বছর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া রাশিয়ায়ও খেলাপির হার মাত্র ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। যদিও ঐতিহাসিকভাবে অলিগার্ক প্রভাবিত রাশিয়ায় খেলাপি ঋণের হার বরাবরই উচ্চ ছিল।

এক দশক আগে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ইউরোপের দেশ গ্রিসের খেলাপি ঋণের হার এখন ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও স্থানীয় মুদ্রার রেকর্ড পতনের মুখে থাকা আর্জেন্টিনার ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। যেখানে চলতি শতাব্দীর শুরুতেও লাতিন আমেরিকার দেশটিতে খেলাপির হার ২০ শতাংশের বেশি ছিল।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের যে হার সেটি দক্ষিণ এশিয়ার সবক’টি দেশের তুলনায় বেশি। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে কেবল শ্রীলংকায় খেলাপি ঋণের হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ রয়েছে। যদিও অর্থনৈতিক সংকটে পড়া দেশটি তিন বছর আগে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছিল। অর্থনীতির পাশাপাশি চরম রাজনৈতিক সংকটেও ছিল দ্বীপরাষ্ট্রটি। কিন্তু গত তিন বছরে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও স্থিতিশীলতা নিয়ে আসতে পেরেছে শ্রীলংকা।

শ্রীলংকার মতো না হলেও চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে ছিল এ অঞ্চলের পাকিস্তানও। বর্তমানে পাকিস্তানের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার মাত্র ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। আর প্রতিবেশী ভারতের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার এখন ২ দশমিক ৩ শতাংশ। নেপালের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হার ৪ দশমিক ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অতীতে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ “‍কার্পেটের নিচে” চাপা দিয়ে রাখত। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দেয়া প্রভাবশালীদের ঋণ খেলাপি দেখানো হতো না। কিন্তু গত এক বছরে কার্পেটের নিচে চাপা দেয়া খেলাপি ঋণ বের হয়ে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেষ্টা ছিল ব্যাংকগুলোর প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন করার। এখন আমরা প্রকৃত চিত্র জানতে পেরেছি।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরো বলেন, ‘দেশের প্রকৃত উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা সবসময়ই ব্যাংকের ঋণ ফেরত দেন। এক্ষেত্রে সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তারাই এগিয়ে থাকেন। গত কয়েক বছর থেকে আমরা ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে আসছি। এতদিন সেটি খুব বেশি কার্যকর না হলেও গত বছর থেকে এ খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে। আশা করছি, আগামী বছরগুলোতে দেশের সিএমএসএমই খাত অর্থনীতিতে আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংক ঋণের বড় অংশ শিল্প ও ব্যবসা খাতে কেন্দ্রীভূত। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের বেশির ভাগও এ দুই খাতেই। বিতরণকৃত ঋণের দিক দিয়ে ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাত দ্বিতীয় অবস্থানে (৩৩ দশমিক ২ শতাংশ) থাকলেও খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে। এ খাতে খেলাপি ঋণের হার ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এককভাবে দেশের সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা খাত হলো শিল্প খাত। মোট ঋণের ৪২ শতাংশই এ খাতে বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এ খাতে খেলাপি ঋণের হার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

কৃষি, মৎস্য ও বনজ খাতে বিতরণ করা হয়েছে মোট ঋণের মাত্র ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। যদিও এ খাতের খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের জুন শেষে এ খাতের খেলাপি ঋণ ৩১ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নির্মাণ খাতে মোট ঋণের অংশ ৭ শতাংশ হলেও খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৭ শতাংশে। ভোক্তা ঋণের ক্ষেত্রেও খেলাপির হার ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। মোট ঋণের ১০ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে এ খাতে। পরিবহন খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ খুবই কম, মাত্র দশমিক ৬ শতাংশ। যদিও এ খাতে খেলাপি হার বেশ উচ্চ, ২২ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ও বিবিধ খাতে প্রায় ৩ শতাংশের মতো ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এ দুই খাতের খেলাপি ঋণের হার যথাক্রমে ১২ ও ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।

খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে ছোট গ্রহীতাদের অবদান অনেক কম হলেও ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদেরই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নানা ধরনের কাগজপত্র জোগান দেয়া থেকে শুরু করে নিয়ম-নীতির কঠোরতা ছোট ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ হয় সবচেয়ে বেশি। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ছোটরা প্রয়োজনীয় ঋণ থেকে বঞ্চিত হন।

এ বিষয়ে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এসএমই উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ঋণ আদায়ের হার ৯৮-৯৯ শতাংশ। অথচ তাদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে জামানত দিতে পারবে কিনা, ঋণ শোধ করতে পারবে কিনা এ নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা হয়। প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় মাত্র ৫-১০ লাখ টাকার ঋণের অভাবে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তেলা মাথায় তেল দিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। নারী উদ্যোক্তাদের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে। এ বিষয়ে অনেক ব্যাংকের শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানেনই না। আবার অনেক ক্ষেত্রে জানলেও না জানার ভান করেন। যারা বড় আকারের ঋণ নেয় তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। বরং ছোট আকারের ঋণগ্রহীতাদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। দেশের মোট শিল্পের ৯৮ শতাংশই এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশই এসএমই খাতে। বিবিএসের জরিপ অনুসারে, দেশে ১ কোটি ১৮ লাখ এসএমই ইউনিট রয়েছে এবং এতে কাজ করছে ৩ কোটি ৭ লাখ মানুষ। অথচ এসএমই খাতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনীহা সবচেয়ে বেশি।’