রাজনৈতিক দলগুলোর পালটাপালটি অভিযোগে কঠিন চাপের মুখে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পোস্টাল ব্যালটে ধানের শীষ প্রতীক মাঝামাঝি রাখা, দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ থাকা প্রার্থীদের প্রার্থিতা বহাল বা বাতিল করা, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হওয়া, পক্ষপাত আচরণ, জাতীয় সংসদের আগে সব ধরনের নির্বাচন বন্ধ করা এবং পরবর্তী সময়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনের অনুমতি দেওয়াসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতায় এ চাপ তৈরি হয়েছে। কারণ, এসব ইস্যুতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ইসিতে গিয়ে কয়েকদিন ধরে পালটাপালটি অভিযোগ করে আসছে। এ দলগুলো ইসির নিরপেক্ষ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই ইস্যুতে দুদিন ধরে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
আইন অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য কারও বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ইসি সেটি যথাযথভাবে অনুসরণ করেনি বলে অভিযোগ করেছে জামায়াত ও এনসিপি। এমন পরিস্থিতিতে সোমবার অনেকটা হঠাৎ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন পুলিশের আইজি বাহারুল আলম। এছাড়া পোস্টাল ব্যালট সম্পর্কে ধারণা দিতে নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে আজ বৈঠক ডেকেছে ইসি।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসিকে নিয়ে এই অভিযোগ ও পালটা অভিযোগের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই দিকই রয়েছে। তাদের মতে, ইতিবাচক দিক হচ্ছে-প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে এ ধরনের অভিযোগ-পালটা অভিযোগ থাকবে। আর নেতিবাচক দিক হচ্ছে-কিছু গুরুতর অভিযোগ উঠছে, যাতে ইসির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। এমনকি সংসদ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে বলে তারা মনে করেন।
চাপের মুখে পড়ার কারণ হিসাবে ইসি নিজেই অনেকটা দায়ী মনে করেন সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি যুগান্তরকে বলেন, প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে এ ধরনের অভিযোগ-পালটা অভিযোগ থাকবেই। তবে অনেক কারণে ইসির কার্যক্রম প্রশ্নের মুখে পড়েছে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, নির্বাচনব্যবস্থায় অনেক সংস্কার প্রস্তাব করা হলেও ইসি তা আমলে নেয়নি। ঋণখেলাপিদের টাকা মনোনয়নপত্র দাখিলের ছয় মাস আগে পরিশোধের বিধান যুক্তের প্রস্তাব করা হলেও সেটিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বিষয় সহজ করার কথা বলা হয়েছিল। এসব প্রস্তাব নিলে এখন এমন পরিস্থিতির তৈরি হতো না। তিনি আরও বলেন, দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ থাকা প্রার্থীদের বিষয়ে ইসির অবস্থান অস্পষ্ট ছিল।
অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগে ইসি চাপে নেই বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। সোমবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইসি কোনো চাপে নেই। সবাই ইসিতে এসে নিজেদের অভিযোগ, পরামর্শ জানাচ্ছেন। এতে কমিশন সমৃদ্ধ হচ্ছে। ছোট সমস্যার সমাধান করে যাচ্ছে কমিশন। আমরা একদমই কোনো চাপে নেই। এখনো ইসি বড় কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়নি। আমরা রাজনৈতিক দলের বক্তব্য খতিয়ে দেখছি এবং ব্যবস্থা নিচ্ছি।
এই নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, আপিল শুনানিতে মনে হয়েছে, একটি ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হবে। সবাই চায় ভালো নির্বাচন, কমিশনও তা-ই চায়।
জানা যায়, নির্বাচন নিয়ে অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ জানিয়ে আসছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। তারা ইসির সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করে এসব বিষয় তুলে ধরেছে। তবে এ নির্বাচনের প্রার্থিতা বৈধ বা বাতিল করে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির শেষ দিনে রোববার অনেকটা হঠাৎ ইসি ঘেরাও কর্মসূচি পালন শুরু করে ছাত্রদল। একই দিন বিকালে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইসির কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর আগে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ইসিতে গিয়ে পোস্টাল ব্যালটের মাঝামাঝি ধানের শীষ এবং ব্যালটের ওপরের দিকে দাঁড়িপাল্লা রাখার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ইসির কয়েকটি সিদ্ধান্তের বিষয়ে আপত্তি জানায়।
নির্বাচন কমিশনের ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর চাপ অব্যাহত থাকলে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতিতে ধাক্কা লাগতে পারে বলে মনে করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. আব্দুল আলীম। তিনি যুগান্তরকে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সবার প্রত্যাশা। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনকে সব দলের সহযোগিতা করা দরকার। কিন্তু কিছু বিষয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তা ভোটগ্রহণের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে ইস্যুতে মতভিন্নতা : নির্বাচন সামনে রেখে কিছু রাজনৈতিক দলের চাপের মুখে ঢালাওভাবে দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় ইসির কাছে অভিযোগ করেছে জামায়াত ও এনসিপি। অন্যদিকে বিএনপি বিষয়টি নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি না করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রায় দুই ডজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। সেই সঙ্গে একটি দলের চাপের মুখে ঋণখেলাপিদেরও নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়ার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। নির্বাচনি আইন অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য কারও বিদেশি নাগরিকত্ব থাকলে সেটি ত্যাগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ইসি সেটি যথাযথভাবে অনুসরণ করেনি বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। ইসির এ সিদ্ধান্তের ফলে উচ্চ আদালতে রিটের সংখ্যা বাড়বে বলেও জানিয়েছেন আইনজীবীরা। যদিও ইসি বলছে, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক করতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা নমনীয় হয়েছেন।
অবশ্য গত ১৩ জানুয়ারি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে দলটির একটি প্রতিনিধিদল সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে দলের অবস্থানের কথা জানান। তিনি ইসিকে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি না করার জন্য অনুরোধ করেন।
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিএনপির আপত্তি : পোস্টাল ব্যালটের মাঝামাঝি ধানের শীষ প্রতীক রাখা এবং কয়েকটি দেশে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের কাছে ব্যালট পাওয়ার বিষয়ে অভিযোগ করেছে বিএনপি। বাহরাইন, কাতারসহ কয়েকটি দেশের এ সংক্রান্ত ভিডিও ভাইরাল হলে এ অভিযোগ ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। যদিও ইসি দাবি করেছে, ওইসব ব্যালট খাম থেকে বের করা হয়নি। বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এদিকে ঠিকানা না পাওয়ায় মালয়েশিয়া ও ইতালি থেকে ৫ হাজার ৬০০ প্রবাসীর পোস্টাল ব্যালট ফেরত এসেছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। সোমবার তিনি বলেন, প্রবাসীদের সঠিক ঠিকানা না পাওয়ায় এসব ব্যালট পেপার সংশ্লিষ্ট দেশে ভোটারদের কাছে পৌঁছায়নি। ফেস ডিটেকশন প্রযুক্তির কারণে পোস্টাল ব্যালটে একজনের ভোট অন্য কেউ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলো দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও জানান তিনি।
ইসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তিন দলেরই : ইসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ করেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। রোববার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে কতগুলো বিষয় আমরা লক্ষ করছি, পক্ষপাতমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ দেখা যাচ্ছে। আমরা সেটিকে পরিত্যাগ করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাজ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি। বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘পোস্টাল ব্যালটের বিষয়টি এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত নিবন্ধিত ভোটারদের ব্যালট পেপার যেভাবে মুদ্রণ করা হয়েছে, তা সঠিক নয়। জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এখানে কোনো একটি দলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা এই ব্যালট পেপার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছি।’
একই দিন রাতে রাজধানীর মগবাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরও ইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি বিশেষ দলের প্রতি পক্ষপাত করছে। প্রধান উপদেষ্টা এর প্রতিকার না করলে জামায়াত শক্তিশালী পদক্ষেপ নেবে। ২০০৮ সালের মতো ভারসাম্যহীন নির্বাচন জামায়াত মেনে নেবে না বলেও জানান তিনি।
অপরদিকে সোমবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ইসির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিদের পক্ষে রায় দেওয়া হয়েছে। বিএনপি ও ছাত্রদল ইসির সামনে মব তৈরি করে ইসিকে দিয়ে এমন রায় দেওয়ানো হয়েছে। দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশ নিক, তা আমরা চাই না। আমরা আদালতে যাব।
তিনি আরও বলেন, ইলেকশন কমিশন সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। নিরপেক্ষতা না রাখতে পারলে প্রয়োজনে ইলেকশন কমিশনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। তবে আমরা মুখোমুখি অবস্থান চাই না।