রেলের একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের জন্য ৪৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা অনুদান দিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু এই অর্থ খরচে স্বাধীনতা নেই বাংলাদেশের। পরামর্শক নিয়োগসহ সব ক্ষেত্রে খরচ করতে হবে কোরিয়ান কোম্পানির মাধ্যমেই। ‘অ্যাডভান্সড প্রজেক্ট অব রোলিং স্টক (ক্যারেজ) অপারেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ রেলওয়ে’ শীর্ষক প্রকল্পে এই অনুদান দেবে দেশটি। তবে পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৪৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর বাকি ৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে।
প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ের রেলিং স্টক (ক্যারেজ) ব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হবে। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীদের সক্ষমতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ এবং রেলওয়ের অপারেশন ও কারিগরি দক্ষতাও বাড়ানো হবে। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রকল্পটি নিয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) সভা। ওই সভা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী সোমবার যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের অনুদানে আমরা সাধারণত নিরুৎসাহিত করি। কেননা যারা অনুদান দেয়, তারাই সবকিছু খরচ করে। এখানে আমাদের কোনো স্বাধীনতা থাকে না। সাধারণত সম্ভাব্য সমীক্ষা বা প্রকল্পের প্রাথমিক কার্যক্রমের জন্য এমন অনুদান দেয় উন্নয়ন সহযোগীরা। কিন্তু এ ধরনের অনুদান দেওয়ার পেছনে তাদের অন্য উদ্দেশ্যও থাকে। অর্থাৎ পরে যখন মূল প্রকল্পটি হবে, তখন সাধারণত তাদের কাছ থেকেই ঋণ নেওয়ার একটা বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। এটা শুধু কোরিয়ার ক্ষেত্রেই নয়-বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ প্রায় সব উন্নয়ন সহযোগীই করে থাকে। তিনি আরও বলেন, তবে আরেক ধরনের অনুদান আছে, যেখানে তারা শুধু টাকা দেয়। প্রকল্প তৈরি থেকে খরচ করা পর্যন্ত আমরা আমাদের মতো করে করতে পারি। সেটি হলে ভালো হয়।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, বিশেষ প্রকল্প মূল্যয়ন কমিটির সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) এমএ আকমল হোসেন আজাদ। তিনি প্রকল্পটির ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে প্রকল্প পরিচালক জানান, কোরিয়া সরকারের মনোনীত প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল কন্ট্রাকটর অ্যাসোসিয়েশন অব কোরিয়া (আইসিএকে) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের জন্য পারামর্শক নিয়োগ দিয়েছে। পরামর্শক ব্যয়সহ অনুদানের সম্পূর্ণ ব্যয় আইসিএকের মাধ্যমে নির্বাহ করা হবে। তবে সংগ্রহ করা যন্ত্রাংশের সিডি-ভ্যাট এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা খরচ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে করতে হবে। এ সময় সভার সভাপতি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণের মানদণ্ড নির্ধারণ এবং প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল বাংলা ভাষায় তৈরির পরামর্শ দেন।
এসপিইসি সভায় ভৌত অবকাঠামো বিভাগের যুগ্ম প্রধান (রেল পরিবহণ উইং) মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের আওতায় যন্ত্রপাতি সরাসরি কোরিয়ার উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সরবরাহ করবে। ফলে কন্টিনজেন্সি বাবদ অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে না। এছাড়া ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে বৈদেশিক প্রশিক্ষণে ইআরডি, আইএমইডি এবং পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
প্রকল্পটির গুরুত্ব প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক এসপিইসি সভায় জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ে বাস্তবায়িত অন্য একটি প্রকল্পের আওতায় ২০টি ইঞ্জিন ও ১৬২টি বগি ইতোমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে। আরও ২০টি বগি আসছে। সংগ্রহ করা এসব ইঞ্জিন, বায়ো টয়লেট, অটোমেটিক স্লাইডিং ডোর, পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমসহ নতুন কিছু প্রযুক্তি সংযুক্ত করা হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীরা বগির এসব রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত দক্ষ নন। এ পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ কোরিয়ার ভূমি অবকাঠামো ও পরিবহণ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে। কোরিয়া সরকারের সহযোগিতায় সংগৃহীত ২০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন এবং ১৫০টি মিটারগেজ বগির টেকসই রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এ প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হলো-পরামর্শক সেবা গ্রহণ, ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টেস্টিং ইকুইপমেন্ট ও যন্ত্রাংশ সংগ্রহ এবং জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
কোরিয়া সরকারের ৪৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা সম্পর্কে এসপিইসি সভায় জানতে চান পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) কবির আহামদ। এ সময় ইআরডির প্রতিনিধি জানান, কোরিয়া সরকারের মিনিস্ট্রি অব ল্যান্ড, ইনফ্রাসট্রাকচার অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট (এমওএলআইটি) ২০২৪ সালের ৪ জুলাই অনুদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০২৫ সালের ৬ মে ইআরডিতে রেকর্ড অব ডিসকাশনের (আরওডি) ওপর একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রকল্পের কারিগরি প্রকল্প প্রস্তাব (টিএপিপি) অনুমোদন পেলে আরওডি স্বাক্ষর করা হবে।