বায়ুদূষণে প্রায় প্রতিদিনই শীর্ষে থাকছে রাজধানী ঢাকার নাম। শব্দদূষণে ঝালাপালা কান। ওয়াসার পানির পাইপ দিয়ে মাঝে মাঝেই বের হয় ময়লা-দুর্গন্ধযুক্ত পানি। জার ও বোতলের পানিতে ভেসে বেড়ায় মলের জীবাণু। নানামুখী আন্দোলন আর বিশৃঙ্খল গণপরিবহনে প্রায় প্রতিদিন যানজটে ভুগছে নগরবাসী। দিনভর গ্যাসের তীব্র সংকটে জ্বলছে না রান্নার চুলা। এর মধ্যে দিনে-রাতে মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হচ্ছে মানুষ। এই পাঁচ চ্যালেঞ্জের বেড়াজালে জড়িয়ে গেছে রাজধানীবাসীর জীবন ও জীবিকা।
মশায় অতিষ্ঠ নগরবাসী : কিউলেক্স মশার প্রকোপে অতিষ্ঠ নগরবাসী। সন্ধ্যার আগেই বাসার দরজা-জানালা বন্ধ করা হয়। তার পরেও মশার কামড় থেকে রক্ষা নেই। ছেলেমেয়েরা পড়তে বসলে মশার কামড়ে হাত, পা, মুখে দাগ পড়ছে, ফুলে উঠছে, রক্ত বিন্দু জমে থাকছে। কিছুতেই মশার কামড় থেকে নিস্তার পাচ্ছি না বলে জানালেন রাজধানীর মহাখালী এলাকার বাসিন্দা সুরাইয়া আলম।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের তথ্য বলছে, ঢাকায় সংগৃহীত মোট প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৮৫ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। এটি কোনো পরিসংখ্যানগত কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এটি নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিফলন। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, বছরের পর বছর পরিষ্কার না হওয়া নালা, জলাবদ্ধ বেসমেন্ট ও পার্কিং এলাকা। সব মিলিয়ে ঢাকা শহর নিজেই যেন কিউলেক্স মশার জন্য এক আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।’
চরমে ঢাকার বায়ুদূষণ : তীব্র বায়ু দূষণের শহর হিসেবে ঢাকা প্রায়ই শীর্ষ অবস্থানে থাকছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ দূষণ চলতে থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বেন ঢাকার বাসিন্দারা। এতে বাড়ছে চর্মরোগ, ফুসফুসের ক্যানসার, শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. আতিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বায়ু দূষণের কারণে এমনিতে ফুসফুসের ক্ষতি হয়। এর ফলে ব্রংকাইটিস, হাঁপানিসহ বড় অসুখ যেমন হতে পারে, তেমনি ঠান্ডা-জ্বর, সর্দিকাশি, নিউমোনিয়ার মতো অসুখও হতে পারে। এতে ফুসফুস দুর্বল হয়ে যায়।
পানিদূষণ : ওয়াসার পানির নল থেকে অনেক সময় বের হয় ময়লা আর দুর্গন্ধযুক্ত পানি। মগবাজার এলাকার বাসিন্দা তৈয়ব আলী বলেন, পানির নল দিয়ে প্রায়ই ময়লা আসছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম ট্যাঙ্কি নোংরা হয়েছে। কিন্তু পরিষ্কার করার পরও তা বন্ধ হয়নি। আশেপাশের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে দেখি তারাও একই সমস্যায় ভুগছেন। তবে সবাই ওয়াসার স্থানীয় অফিসে জানানোর পরে সমস্যার সমাধান হয়েছে। তবে জারের পানিতেও যখন মিলছে মলের জীবাণু তখন নগরবাসীর উদ্বেগ বাড়ছে। রাজধানীর বাসাবাড়ি, অফিস-আদালতে সরবরাহ করা ৯৭ ভাগ জারের পানিতে ক্ষতিকর মাত্রায় মানুষ ও প্রাণীর মলের জীবাণু ‘কলিফর্ম’ পেয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) একদল গবেষক। কেবল জারের পানিতে প্রাণঘাতী জীবাণুর উপস্থিতিই নয়, বাজারে থাকা বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত পানিতেও বিএসটিআই নির্ধারিত মান না পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে এ গবেষণায়। এর ফলে বাড়ছে পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়া, জন্ডিস, টায়ফয়েড।
বিশৃঙ্খল গণপরিবহন : রাজধানীর সড়কজুড়ে রাত-দিন চলছে বাসের রেষারেষি, স্টপেজের বাইরে যত্রতত্র যাত্রী তোলা, চলন্ত গাড়ি থেকে যাত্রী নামিয়ে দেওয়াসহ আগের সব স্বেচ্ছাচারিতাই। অসহায় যাত্রীরাও রাস্তায় নেমে যেন সেই স্বেচ্ছাচারিতার সহযোগী হয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া রাজধানীর শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, প্রেস ক্লাব এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই আন্দোলনের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে নগরবাসীকে। কথায় কথায় সড়কে অবস্থান নেওয়ায় মাঝেমধ্যেই যানজটে স্থবির হয়ে পড়ছে ঢাকা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বলেন, ‘গণপরিবহনে আধুনিকায়ন ও শৃঙ্খলা ফেরাতে সমন্বিত উন্নয়নে নজর দিতে হবে। রাস্তা না বাড়লেও গাড়ি বাড়ছে প্রতিদিন। এতে যানজট বেড়ে প্রতি ঘণ্টায় গাড়ি মাত্র ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার যেতে পারছে। রাস্তা না বাড়িয়ে ডবল ডেকার বাসে বেশি যাত্রী পরিবহন করা যেতে পারে। সড়ক পরিবহনে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিবহন ব্যবস্থাকে এক ছাতার নিচে কেউ কখনো আনতে পারেনি।’
গ্যাসের তীব্র সংকট : রাজধানীতে এখন গ্যাস সংকটে ভোগান্তির বিষয়টি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত গ্যাস প্রায় থাকেই না। মাঝে মাঝে এলেও চুলা জ্বলে টিমটিম করে। শীতের তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস সংকটের তীব্রতাও বেড়েছে। ফলে বেড়েছে হয়রানি, নেমেছে অতিরিক্ত খরচের খড়গ। রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা সাজিয়া আক্তার বলেন, সকাল থেকেই গ্যাস থাকে না। ইদানীং সন্ধ্যার পরে কিছুটা আসে। গতকাল দুই ঘণ্টা লেগেছে মুরগির মাংস রান্না করতে। তিন বেলা রান্না-খাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাড়ছে চুরি ছিনতাই : প্রায়ই ছিনতাইকারীর ধারালো ছুরি, ব্লেডের আঘাতে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। চুরি-ছিনতাই ঠেকাতে কাজ করছে পুলিশ। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২০ ডিসেম্বর রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আশিষ জোয়াদ্দার (৩৩) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ সময় তার কাছ থেকে মোবাইল ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। নিহত আশিষ জোয়াদ্দার (৩৩) কাপড়ের ব্যবসা করতেন বলে জানা গেছে। রাত ২টার দিকে মাগুরা থেকে ঢাকার বাসায় ফেরার পথে যাত্রাবাড়ী পাইকারি বাজারের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘চুরি ছিনতাইসহ যেকোনো অপরাধ দমনে আমরা সব সময় সতর্ক রয়েছি। নিয়মিত প্রিভেন্টিভ কার্যক্রমের মাধ্যমে সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা হয়। এর পরও কোনো ঘটনা ঘটলে গুরুত্বের সঙ্গে সেগুলো তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’