Image description
বছরে খরচ ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির ঘোড়াশালে ১৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রে ৭টি ইউনিট আছে। এর মধ্যে একটি ইউনিট নষ্ট। বাকিগুলোও গ্যাসের অভাবে এখন বন্ধ। অথচ বছরে এ কেন্দ্রে শুধু বেতন-ভাতায় খরচ হয় ৫৫০ কোটি টাকা। এভাবে পিডিবির ৫০টি কেন্দ্রের মধ্যে ঠিকমতো চালু থাকে মাত্র ৯টি। ২০টি বয়সের ভারে বা নষ্ট হওয়ায় বেশির ভাগ সময় অলস বসে থেকে। অপর ২১টি কেন্দ্র বছরের কোনোদিনই চালু হয় না। ফলে পিডিবির নিজস্ব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রতি ইউনিট ৩১ দশমিক ৩১ টাকার বেশি। অথচ তারা বিক্রি করে ৬ দশমিক ৬৩ টাকায়। তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন পিডিবির বোঝায় পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল, অপরিণামদর্শিতা ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে যেখানে-সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদান দেওয়া হয়েছে।

পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম যুগান্তরকে বলেছেন, আগের সরকারের ভুল নীতির কারণে পুরো জাতি এখন মাশুল দিচ্ছে। তবে বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমিয়ে পিডিবির কেন্দ্র সচল রাখতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ম তামিম জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার কমপক্ষে ৪০ শতাংশ উৎপাদন করতে পারলে সেটি দেশের জন্য সাশ্রয়ী। সেই হিসাবে গত অর্থবছরে কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ, ঘোড়াশাল ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট (এখন এগুলো বন্ধ), সিলেট পিকিং প্ল্যান্ট, ভোলা সিসিপিপি, বিবিয়ানা-৩, বিবিয়ানা সাউথ, শিকলবাহা সামিপুর, বড়পুকুরিয়া ২৭৪ মেগাওয়াট কেন্দ্র ৪০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করেছে। অন্যদিকে, বায়ুবিদ্যুতের তিনটি কেন্দ্র-ঘোড়াশাল ১ থেকে ৩ ও ৭ নম্বর ইউনিট, শাহজীবাজার (পুড়ে যাওয়ায় বন্ধ), ভেড়ামারা পাওয়ার স্টেশন, বরিশাল গ্যাস টারবাইন, সৈয়দপুর গ্যাস টারবাইন, রংপুর গ্যাস টারবাইন, কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ, হাতিয়া ডিজেল জেনারেটর, শিকলবাহা পাওয়ার স্টেশন, শিকলবাহা ২২৫, খুলনা ৩৩০ সিসিপিপি, ডিজিডি ঢাকা ও এসবিইউ হরিপুর কেন্দ্র যান্ত্রিক কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ।

সরকারি কর্মকর্তারা জানান, এতে দেশের ক্ষতি বাড়ছে। কারণ, বিভিন্ন কেন্দ্র নামমাত্র উৎপাদন করলেও বছরে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। যেমন বাঘাবাড়ি ১৭১ মেগাওয়াটের কেন্দ্রে বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে এর সক্ষমতার মাত্র ১ শতাংশ। কিন্তু ব্যয় হয়েছে ৬০ কোটি টাকা, এভাবে সিদ্ধিরগঞ্জ কেন্দ্র তেমন একটা না চললেও খরচ হয়েছে ১ বছরে ১০৪ কোটি টাকা, টঙ্গী ১০৫ মেগাওয়াটের কেন্দ্রে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও ব্যয় ৪৪ কোটি টাকা। এছাড়া শাহজীবাজার কেন্দ্র আগুনে পুড়ে গেলেও ওই কেন্দ্রে খরচ হয়েছে ২২৫ কোটি টাকা। গোপালগঞ্জ পিকিং প্ল্যান্টে এটির সক্ষমতার মাত্র ৮ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। খরচ হয়েছে ১৮৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এ কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬১ দশমিক ৬০ পয়সা। এভাবে কোনো কেন্দ্র সারা বছর উৎপাদন না করলেও সরকারকে খরচ করতে হচ্ছে। পিডিবি জানিয়েছে, গেল বছরে পরিচালন ব্যয় হিসাবে সংস্থাটি ব্যয় করেছে ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

গ্যাস পায় আইপিপি, বসে তাকিয়ে থাকে পিডিবি : চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস পায় না পিডিবি। যেটুকু পায়, এর বেশির ভাগ দিয়ে দিতে হয় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র আইপিপিকে। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে ৫০টি (সরকারি-বেসরকারি)। এর মধ্যে পিডিবির ২১টি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এসব কেন্দ্র চালাতে পিডিবির গ্যাসের দরকার হয় দৈনিক ১৫০ থেকে ১৬০ কোটি ঘনফুট। সেখানে এখন দেওয়া হচ্ছে ৭০ কোটি ঘনফুট। যার কারণে ভোলা, বিবিয়ানা, সিলেট, চাঁদপুর ও শিকলবাহা ছাড়া অন্য গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র বসে থাকে। এর পরিবর্তে আইপিপি মেঘনাঘাট ৪৫০, সামিটের বিবিয়ানা-১, সিরাজগঞ্জের সেমক্রপের কেন্দ্র, ইজিসিবির ৪১২, সিরাজগঞ্জের আরপিসিসিএলের ১০০ মেগাওয়াটসহ বিভিন্ন কেন্দ্র চলে।

আইপিপির কর্মকর্তারা জানান, পিডিবির গ্যাসভিত্তিক বেশির ভাগ কেন্দ্র পুরোনো। এগুলোয় বেশি গ্যাস দিয়ে কম বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। তাই এগুলো বসিয়ে রাখা হয়। তবে পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, ওই বক্তব্য পুরোপুরি ঠিক নয়। অনেক পুরোনো কেন্দ্র আছে এটা ঠিক, কিন্তু অনেক সক্ষম কেন্দ্রও আছে। যেমন: গ্যাসের অভাবে ঘোড়াশালের সব কেন্দ্র এখন বন্ধ। যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তা দিতে হচ্ছে আইপিপি এবং সরকারি অন্যান্য (পিডিবির নয়) বিদ্যুৎকেন্দ্রকে। কারণ, প্রতিমাসে তাদের মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয় ডলারে। তাই বাধ্য হয়ে পিডিবির কেন্দ্র বসিয়ে রেখে তাদের গ্যাস দিতে হচ্ছে।

পিডিবির চেয়ারম্যান যুগান্তরকে বলেন, শুধু আইপিপি নয়, সার কারখানা চালু হলেও অনেক সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গ্যাস পায় না। ঘোড়াশাল এর উদাহরণ। এখন ঘোড়াশালের কেন্দ্রের জন্য মনোহরদী দিয়ে আরও একটি পাইপলাইন বসানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠান থেকে ট্রেডিং সেন্টার : ষাটের দশকের প্রতিষ্ঠান পিডিবি। এখন দেশের বৃহৎ সরকারি প্রতিষ্ঠানের একটি। কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় ১২ হাজার। চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেটসহ হাতে গোনা কয়েকটি বিতরণ এলাকা ছাড়া ৫০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বদলে পিডিবি এখন বেশি ব্যস্ত থাকে সরকারি-বেসরকারি (আইপিপি) ও ভারত থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের হিসাবনিকাশ এবং তাদের বিল পরিশোধ নিয়ে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১০ বছর আগেও মোট সরবরাহের ২৬ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করত পিডিবি। ২০২০ সালে সেটি ২৪ এবং ২০২৫ সালে ১৩ শতাংশে নেমে আসে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, কোনোভাবেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে পিডিবির শেয়ার ৫০ শতাংশের কমে নামিয়ে আনা উচিত হয়নি।