মো. সাইফুল ইসলাম
গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিএনপির ফ্যামিলি কার্ডের ছবিতে সোশ্যাল মিডিয়া সয়লাব। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করে দেশের গরিবদেরকে খাওয়ানো পরানো হবে, আরো কত কী লিখছে বিএনপির অ্যাক্টিভিস্টরা।
আজকে আমরা এই ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে একটু পর্যালোচনা করব। দুইটি পার্সপেকটিভ থেকে অ্যানালাইসিস করব। এটি কি আসলেই শতভাগ স্বচ্ছ ও নিখুঁত উপায়ে বাস্তবায়ন সম্ভব এবং বাংলাদেশের জন্য এটি ফিজিবল কিনা?
প্রথমে একটু ফিজিবিলিটি টেস্ট করা যাক। দেখি এটিও আবার শুভংকরের ফাঁকি কিনা?
বিএনপির অ্যাক্টিভিস্টদের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে যে, এই কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি পরিবার সুবিধা পাবে। টাকার এমাউন্ট এখনো নির্ধারিত না হলেও গ্রাম অঞ্চলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতি মাসে দেওয়া টাকার পরিমাণ একেকজন একেক রকম বলছে। কেউ বলছে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে দেবে, কেউ আবার ৭ হাজার, এমনকি কেউ কেউ তো আবার ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেবে বলে দাবি করেছে। তর্কের খাতিরে ২ হাজার ধরে নিয়ে একটা সরল অঙ্ক করি।
-১টি পরিবার ১ মাসে পাবে ২ হাজার টাকা।
-তাহলে ২ কোটি পরিবার ১ মাসে পাবে মোট ৪০০০ কোটি টাকা।
মানে হিসাব জলবৎ তরলং, এই হিসেবে সরকারকে বছরে ব্যয় করতে হবে ৪৮,০০০ কোটি টাকা। আবার বলছি, ৪৮ হাজার কোটি টাকা। অনেক আবেগী নেতা কর্মী বলবে, এ আবার এমন কী। আসলেই এমন কী, কিন্তু এমনকিই।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেট কত জানেন?
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেট ৭.৯০ লাখ কোটি। সে ক্ষেত্রে ৪৮ হাজার কোটি কিন্তু এই বাজেটের ৬.০৮ শতাংশ। এটা অনেকেই বলবে সামান্য। সামান্যই, কিন্তু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের পুরো বাজেট এর চেয়েও কম।
যেমন ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাজেট ৪১,৯০৮ কোটি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট ৩৫,৪০৩ কোটি, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৪৭,৫৬৩ কোটি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২৭,২২৪ কোটি এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ২২,৩৭০ কোটি।
এরপরও যদি মনে করেন হুট করে ৪৮,০০০ কোটি টাকা শুধু ফ্যামিলি কার্ডে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব, তাহলে হয় আপনি দলকানা অথবা নির্বোধ।
কেননা, এসব সোশ্যাল সেফটি নেট প্রোগ্রাম বাংলাদেশে নতুন না। ইতিমধ্যে ভিজিএফ কার্ড, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ নানান ধরনের কার্ড কিংবা প্রোগ্রাম দেশে চালু আছে। যার আওতায় ৫৫ লাখ পরিবারকে ৩৪৩৩.০৪ কোটি টাকার (বাজেটের ০.৪৩ ভাগ) সুবিধা দেওয়া হয়।
এখন সেই সুবিধা ফ্যামিলি কার্ডের সর্বনিম্ন ২ হাজার করে দিতে গেলেও বাড়িয়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকা, বাজেটের ৬.০৮ ভাগ, করতে হবে। সে ক্ষেত্রে এই খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে ১৩৯৮.১৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১৪ গুণ।
বাজেটের সমানুপাত ধরে রেখে করলে বাজেট হতে হবে ১১০.৪৫ লাখ কোটি টাকা। অথবা বর্তমান বাজেটে অন্য সব খাত থেকে বিশাল অংশ এই খাতে নিয়ে আসতে হবে বা কিছু খাতকে নাই করে দিতে হবে।
এখন বিএনপিই জানে তারা বাজেট প্রায় ১৪ শতাংশ বাড়াবে নাকি অন্য খাতে বাজেট শূন্য করে দিয়ে তথাকথিত ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন করবে।
তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, তারা সবকিছু বাদ দিয়ে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন করবে।
এবার আসি, বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাস্তবে কী অবস্থা হবে?
১. এ দেশে দলীয় যেকোনো কিছু কিংবা নিজেদের বিশেষ প্ল্যান, সরকারে থাকলে তা দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে বাস্তাবায়ন করা হয়। এর ফলে কী হয়? প্রথমে অভুক্ত দলের কর্মীরা তা খায়। আবার নানা কায়দা করে অনেকেই একের অধিক কার্ড নেয় (এতদিন যেটা বয়স্ক ভাভা বা মুক্তিযোদ্ধ ভাতার ক্ষেত্রে হয়ে আসছিলো)। এতে করে সাধারণ মানুষকে এলাকার নেতার পেছনে ঘুরতে ঘুরতে স্যান্ডেলের তলা ক্ষয়ে করতে হয়। এই ফ্যামিলি কার্ডেও এর ব্যতিক্রম হবে না।
এরই মধ্যে বেশ কজন নেতা ঘোষণাও দিয়েছেন যে, তাদের নেতা কর্মীদের কাছে গেলে এই কার্ড করে দেবে। দিনশেষে দেখা যাবে এটা একটা দলীয় কর্মী মোটাতাজাকরণ প্রকল্পই হবে, যেমনটা বর্তমান সময়ে হয়। সাধারণ মানুষের বিশাল টাকা খরচ করে জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে কোনো দলের মোটাতাজাকরণ প্রকল্প কারোর কাম্য হওয়ার কথা না।
২. অধিকাংশ সময় এই ফ্রি কার্ডগুলো নিতেও নেতাদের টাকা দিতে হয়। সৌভাগ্যক্রমে পেয়ে গেলেও রেশন তুলতে গেলে রেশন কেটে রাখা হয়। অনেক সময় নেতারা ১০ ট্রাক চাল বরাদ্দ পেলে ৮ ট্রাকই নিজেদের গোডাউনে নিয়ে যায়। এই ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ কতটুকু?
৩. ফ্যামিলি কার্ড বা রেশন কার্ড বিএনপি এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন তারা নতুনভাবে এই ধরনের কার্ডের প্রবর্তন করেছে। অথচ বাস্তবতা হলো ৫৫ লাখ পরিবার এই ধরনের নানান কার্ডের সুবিধা পাচ্ছে। নতুন কার্ড হলে কী এরা বাদ যাবে? এদের কি অবস্থা হবে? নতুন কার্ড পেতে গেলে এদেরকেও বিএনপি করতে হবে?
৪. আরেকটা প্রশ্নটা হচ্ছে, পাওয়ার উপযুক্ত কারো কার্ড না থাকলে কী হবে? তারা বাদ, এই তো। তাদেরকে কার্ডের জন্য নেতার পেছনে দৌড়াতে হবে। হওয়ার কথা ছিল উল্টোটা, নেতারা কার্ড নিয়ে ঘরে ঘরে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশ বলে কথা! তুমি তো ভোট দাওনি, এখন কার্ডের জন্য আসছো কেন?
৫. সোশ্যাল সিকিউরিটি পাওয়া গরিব মানুষের অধিকার হওয়া উচিত। কিন্তু কার্ডকে শর্ত বানালে এগুলো হয়ে যায় অনুগ্রহ, আবার যেটা নিয়ন্ত্রণ করবে স্থানীয় ক্ষমতাবানরা। সেই রাজা-প্রজা খেলা।
৬. বাংলাদেশে কোনো কোনো সরকারি কাজ সম্পাদনের জন্য অনেক সময় এক যুগও লেগে যায়। সে ক্ষেত্রে এসব কার্ড দিয়ে মানুষকে সেবা দিতে কত সময় লাগবে, সেটা আদৌ বলা যাচ্ছে না। যেমন, দেড় বছরেও NID এর জন্য আবেদন করে পায়নি, এমন সংখ্যা নেহাত কম নয়। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার NID দেবে নাকি নতুন করে অনেক ধরনের কার্ড দেবে, এটাও একটা বড় প্রশ্ন।
সহজ কথায়, এই ফ্যামিলি কার্ড একটি পলিটিক্যাল টুল ছাড়া আর কিছুই না। ভিন্নভাবে বললে, "বাকিতে ভোট কেনা"। তুমি আমাকে ভোট দাও, আমি তোমাকে কার্ড দেব।
আওয়ামীলীগ তো নগদ টাকা দিয়ে ভোট কিনতো, বিএনপির ভাইয়েরা তাই বাকিতে ভোট কেনার ফন্দি করেছে। এই ফ্যামিলি কার্ড নতুন করে দুর্নীতি আর ধান্ধাবাজি করার নয়া পথ বৈ কিছুই না।