
‘আমি আমার স্বামীকে বাঁচাতে চাই, কিন্তু ওষুধ কেনার টাকা নাই!’ এই মর্মন্তুদ কথা রাজশাহীর একজন গৃহিণীর, যার নাম সুমি আক্তার। ক্যান্সারে আক্রান্ত স্বামীকে (৫৫) চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে ঢাকায় নিতে হয়।
এতে চিকিৎসা ও ওষুধ মিলিয়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লাগে। এই ব্যয়বহুল চিকিৎসায় এই পরিবার এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে।
সুমি আক্তার বলেন, ‘একবার বাজারে ওষুধের দাম শুনে মনে হলো চিকিৎসা বাদ দিতে হবে। কিন্তু মন তো আর মানে না। স্বামী বলে কথা!’
দেশের নানা প্রান্তে সুমি আক্তারের স্বামীর মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে এমন লাখো মানুষ ধুঁকছে। তারা রাজধানীর বড় হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করাতে চায়, কিন্তু উচ্চমূল্যের ওষুধ ও চিকিৎসার কারণে অনেকে চিকিৎসা শুরু করতে পারে না বা মাঝপথে থেমে যায়।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে ওষুধ কম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ (এমআর), ডাক্তারদের একটি অংশের মধ্যে ওষুধের কমিশন বাণিজ্যের দুঃসহ বোঝা চেপেছে রোগীর কাঁধে। ওষুধ কম্পানিগুলো ডাক্তারদের উপহার, বিদেশভ্রমণ এবং নগদ সুবিধার মাধ্যমে প্রভাবিত করে তাদের ব্র্যান্ডের ওষুধ লিখিয়ে নেয়। একজন ডাক্তারের পেছনে তিনজন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজ করছেন। এতে রোগীদের অতিরিক্ত ওষুধ কিনতে হয়, যা আর্থিক চাপ বহুগুণ বাড়ায়।
শুধু ওষুধের প্রচারে কম্পানিগুলো বছরে শতকোটি টাকা খরচ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান।
ডা. মো. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন কম্পানির অডিট রিপোর্ট দেখেছি। প্রমোশন এক্সপেন্ডিচার বা প্রচারণা ব্যয় যাদের আছে, তাদের কারো কারো ব্যয় ১০০ কোটি টাকার বেশি। এখানে রিপ্রেজেন্টেটিভ বা প্রতিনিধিদের বেতন রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা—এই যে পাঁচতারকা হোটেলে আমরা আছি, এখানে একটি সেমিনারে কোটি টাকার বেশি খরচ হয়।
গালা নাইটে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। একসঙ্গে ৪০ থেকে ৬০ জন করে বিদেশ সফরে যান। এসব আমাদের কাছে নথিভুক্ত রয়েছে। সে টাকা কে পরিশোধ করেছে?’
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ‘রোগীদের অধিকার রক্ষায় এবং স্বাস্থ্যসেবাকে সবার জন্য সহজলভ্য করতে ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ’
অনেক বহুজাতিক কম্পানি এই অপ্রতিযোগিতামূলক ও অনৈতিক বাজারে টিকতে না পেরে দেশ ছাড়ছে। দেশের ওষুধশিল্পের স্থানীয় উৎপাদনে প্রায় শতভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, আন্তর্জাতিক রপ্তানি এবং ১৫০টির বেশি দেশে পৌঁছানোর সাফল্য অত্যন্ত গর্বের। কিন্তু সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে না পারলে এই অর্জন বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অসুস্থ সংস্কৃতির কবলে স্বাস্থ্য : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশের ২৪ শতাংশ মানুষ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ছে। শুধু চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রতিবছর ৬২ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। ১৬ শতাংশ খানা (এক পাকে খাবার খায় এবং একসঙ্গে বাস করে এমন পরিবার) বিনা চিকিৎসায় থাকছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস’-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ করতে হয়, টাকার অঙ্কে যা প্রায় ৫৪ হাজার কোটি। আর এই স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৪.৬ শতাংশই খরচ হয় ওষুধ কেনা বাবদ, টাকার অঙ্কে যা প্রায় ৩৬ হাজার কোটি।
ডাক্তারদের পেছনে এমআরদের দৌড়ঝাঁপ : ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশনকে ঘিরে এক অঘোষিত কমিশন বাণিজ্য তৈরি হয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশের হাসপাতাল, ক্লিনিকগুলোতে গেলে চোখে পড়বে বিভিন্ন ওষুধ কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য। ওষুধ কম্পানিগুলো নিজেদের বাজার বাড়াতে মরিয়া হয়ে থাকে। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য তারা এমআরদের মাধ্যমে চিকিৎসকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। কম্পানিগুলো এমআরদের জন্য বাড়তি বিক্রির লক্ষ্য বেঁধে দেয়, যা পূরণে তারা চিকিৎসকদের কাছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধের স্যাম্পল, উপহার, বিদেশভ্রমণ বা সেমিনারে অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেয়। এতে চিকিৎসকরা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় ওষুধও প্রেসক্রিপশনে যোগ করেন, যা রোগীর খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঢাকার এক অভিজ্ঞ চিকিৎসক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বললেন, ‘আমরা রোগীর সর্বোচ্চ স্বার্থে প্রেসক্রিপশন লিখি, তবে ওষুধ কম্পানির প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। কিছু কম্পানি ডাক্তারদের বিভিন্ন প্রলোভন দেয়। এটি শুধু ডাক্তারদের সমস্যা নয়। বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও রোগীর সচেতনতা—সব মিলিয়ে সমাধান খুঁজতে হবে। ’
সরবরাহ চেইনে উচ্চ মার্জিন ও বিপণন খরচ : চেইন পর্যায়ে উৎপাদক, ডিস্ট্রিবিউটর, হোলসেলার, রিটেইলার—প্রতিটি স্তরে নির্দিষ্ট মার্জিন থাকে, প্রথাগতভাবে ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশনে প্রভাব রাখতে ব্যয়বহুল মার্কেটিং করতে হয়। এর সব ব্যয় শেষ পর্যন্ত রোগীর পকেটে মিশে যায়।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বাপি) এক নেতা বলেন, ‘ডলার ও এপিআইয়ের (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রিডিয়েন্ট) উচ্চমূল্যে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, প্যাকেজিং, শক্তিতে মূল্যর চাপ এসেছে। এত খরচ-সংকট মোকাবেলায় না হলে ওষুধের উৎপাদন হুমকিতে থাকবে। ’
তবে ভোত্তা সংগঠনগুলো এই অজুহাত মানতে নারাজ। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বর্তমান ডিস্ট্রিবিউশন প্রথা চালু আছে, সেখানে রোগীর স্বার্থ সুরক্ষিত হচ্ছে না। ডাক্তারদের প্রমোশন, সেমিনার, গিফট, ফার্মেসিগুলোকে অধিক মার্জিন ও কমিশন প্রদানের যে বিপণন প্রথা চালু আছে, সেখানে রোগী মানহীন ওষুধও কিনতে বাধ্য হচ্ছে। ’
জানা গেছে, সরবরাহ চেইনে অতিরিক্ত মার্জিন ও বিপণন ব্যয়ও চূড়ান্ত খুচরা দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। ওষুধের দোকান, ডিস্ট্রিবিউটর ও হোলসেলার—সব স্তরে নির্দিষ্ট লাভ ধরা হয়, যা অনেক সময় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে যায়।
ঢাকার একটি বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কম্পানির উদ্যোক্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওষুধের দোকান বা হোলসেলারে মার্জিন অনেক সময় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত থাকে।
ঢাকার একটি ফার্মেসি মালিক বলেন, ‘আমরা উৎপাদকের দেওয়া দাম থেকে ২৫ শতাংশের ওপরে খুচরা দামে বিক্রি করি। এতে স্টাফের বেতন, বিদ্যুৎ, ভাড়া, ট্যাক্স সবকিছু আসে। রোগীর পকেটের ওপর এই চাপ পড়ে।
সমাধানের পথ : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতি কমিশনের লোভে ওষুধ লেখার সময় কম্পানির পরিবর্তে জেনেরিক নামে ওষুধ লেখার বাধ্যবাদকতা নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছ প্রাইসিং ফর্মুলা নিশ্চিত করতে কাঁচামাল, উৎপাদন, বিতরণ, মার্কেটিং সব ধাপে স্পষ্ট হিসাব প্রকাশ করতে হবে; উন্মুক্ত অনলাইন পোর্টালে প্রতিটি ব্র্যান্ড ও জেনেরিকের দাম প্রকাশ করতে হবে।
বিদায় নিচ্ছে বহুজাতিক কম্পানি : গত ২০ বছরে বাংলাদেশ থেকে অনেক বহুজাতিক ওষুধ কম্পানি বিদায় নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় অবৈধ কমিশন বাণিজ্য, অনৈতিক বিপণন কৌশল এবং স্থানীয় প্রতিযোগিতাই প্রধান ভূমিকা রেখেছে বলে দাবি তাদের।
পশ্চিমা বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন, নুভিস্তা ও সানোফির পর সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ছেড়েছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক নোভার্টিস এজি। নোভার্টিস বাংলাদেশ লিমিটেডে (এনবিএল) নিজেদের মালিকানাধীন শেয়ার দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের কাছে হস্তান্তর করবে। নোভার্টিস চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশে স্থানীয় কারখানা থাকা একমাত্র বিদেশি ওষুধ প্রস্তুতকারক কম্পানি হবে ভারতীয় সান ফার্মার সহযোগী প্রতিষ্ঠান সান ফার্মা বাংলাদেশ। বেশ কয়েক বছর আগেই ফাইজার, ফাইসন্স, স্কুইবসহ বড় বড় কয়েকটি বিদেশি ওষুধ কম্পানি বাংলাদেশ থেকে তাদের বিনিয়োগ গুটিয়ে নিয়েছে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ছাড়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ওষুধ কম্পানি গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল (অব.) ডা. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, ওষুধের দাম বাড়ানো নিয়ে চাপ রয়েছে। এ জন্য চিকিৎসকদের এগিয়ে আসতে হবে। সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন কম্পানি থেকে চিকিৎসকদের নেওয়া বিভিন্ন উপহার কমিয়ে দিতে হবে। অ্যাগ্রেসিভ মার্কেটিং থেকে সরে এসে ওষুধ কম্পানিগুলো যদি খরচ কমিয়ে দেয় তাহলে ওষুধের দাম কমে যাবে।
একটি শীর্ষ পর্যায়ের ওষুধ কম্পানির একজন বিপণন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ডাক্তারদের অনারিয়াম সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, বার্ষিকসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে হয়। যার রোগী যত বেশি, তার সম্মানী তত বেশি। কার্ডিয়াক ডাক্তারদের গাড়ি, ফ্ল্যাট দেওয়া হয়। কেননা হার্টের ওষুধগুলো একবার লিখলে সারা জীবন খেতে হয় রোগীদের। ’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন ও জাতীয় ঔষধ নীতি-২০১৬ প্রণয়নের বিশেষজ্ঞ কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক জানান, ডাক্তাররা গাড়ি-বাড়ি নিচ্ছে। আর লোন শোধ করছে ওষুধ কম্পানি। ঘুষ দেওয়ার খুবই আধুনিক একটা পদ্ধতি এটা। এগুলো ধরার উপায় নেই। এখন যতই সময় যাচ্ছে লোকজন বুদ্ধিমান হচ্ছে। এর মাধ্যমে দুটি ঝুঁকি। এক. দাম বেড়ে যাচ্ছে ওষুধের। আরেকটা হচ্ছে, কম কার্যকর, বেশি ক্ষতিকর, বেশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যুক্ত ওষুধ রোগীর শরীরে চলে যাচ্ছে। এতে রোগীর শরীরের কোনো অংশের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে, কিডনিসহ নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নষ্ট হতে পারে। মারাও যেতে পারে। ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতিতে অনৈতিক বিপণন বন্ধের কথা বলা হলেও বন্ধ হয়নি। সমস্যাটা এত ব্যাপক, এত গভীর এবং এত বেশিসংখ্যক লোক এটার সুবিধাভোগী, এতে নিয়ন্ত্রণ করাটা খুব কঠিন ব্যাপার। ’