Image description

আমাদের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র জনতার হ ত্যার সাথে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত অন্ততপক্ষে ৭২ জন সেনা কর্মকর্তাকে তালিকাভুক্ত করে পঞ্চাশ পেজের একটি রিপোর্ট তৈরী করেছিল জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন; যা আমরা সবাই'ই কমবেশি পড়ে দেখার সুযোগ পেয়েছি। 

 

উক্ত ৭২ জন অফিসারের সবাই'ই কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে ছাত্র জনতার হ ত্যার সাথে জড়িত নয়, কারো কারো অপরাধের পরিমাণটা একটু কম। তবে গণঅভ্যুত্থানে হ ত্যাযজ্ঞের সাথে জড়িত সহ বিগত পনেরো বছরে রেজিম কর্তৃক সবচেয়ে বেশি বেনিফেসিয়ারি এবং রেজিমকে ইন্ডিমেনিটি দেওয়া অফিসারের সংখ্যাটা ২২। 

 

জাতিসংঘের রিপোর্ট প্রকাশিত হবার পর হতে ইন্টারিম সরকারের গুম খুন কমিশন এবং আইসিটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল ইউএনের রিপোর্টে উল্লিখিত ওই ৭২ জনকে বিচারের আওতায় আনা। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার চরম অসহযোগীতা ও অসহনশীল আচরণের দরুন সরকারের কমিশনগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগই পায়নি। দীর্ঘ একটি সময় যাবত সামরিক বাহিনীর সাথে স্নায়ু যুদ্ধ করে বিচারকার্য এগিয়ে নিতে হয়েছে কমিশনকে। কিন্তু সেনাবাহিনীর পক্ষ হতে অসহযোগীতা যখন মাত্রা ছাড়াতে শুরু করে তখন সরকার ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে তার নীতি বদলাতে বাধ্য হয়। 

 

খুব সম্প্রতি ইন্টারিম সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে সেনাবাহিনীর সাথে তিনটি বিষয়ে নেগোসিয়েশনে আসা হয়। সেই তিনটি বিষয়ের একটি হলো: “বিচারকার্যে সহযোগীতা”

 

সেটা কিরকম.?

 

উপরেই বলেছি, ইউএন এর রিপোর্টে তালিকাভুক্ত ৭২ জনের প্রত্যেকেই কিন্তু জুলাই আগস্ট হ ত্যাকান্ডে প্রত্যক্ষভাবে বা স্বেচ্ছায় যুক্ত ছিলেন না। যুক্ত ছিলেন: এমন অফিসারের সংখ্যা ২২। 

 

সরকারের সাথে সেনাবাহিনীর বোঝাপড়া হয় এই জায়গাটায়। সরকার বিগত পনেরো বছর সহ, সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানে যেসব অফিসার ম্যাস কিলিং চালিয়েছে তাদের বিচারের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। আর কম্প্রোমাইজ করা হয় যেসব অফিসার অপেক্ষাকৃত কম অপকর্মের সাথে যুক্ত— তাদের ক্ষেত্রে। আর ঠিক এজন্যই আমরা দেখতে পেয়েছি, সাবেক ডিএমও বা ডাইরেক্টর মিলিটারি অপারেশন্স জেনারেল নাজিম উদ্দৌলাকে পদোন্নতি দিয়ে বগুড়ায় ১১তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি করা হয়েছে এবং জেনারেল নাজিমউদ্দৌলাও ইউএন রিপোর্টের ওই ৭২ জন অফিসারের মাঝে একজন!

 

তো যা বলছিলাম.....

 

সবচেয়ে বেশি করাপ্টেড বা ম্যাস কিলার হিসেবে চিহ্নিত ওই ২২ জনের মাঝে ৫ জন অলরেডিই দেশের বাহিরে অবস্থান করছেন। বাকি থাকে ১৭ জন। এই ১৭ জনের ১৬ জনই সার্ভিং অফিসার; অর্থাৎ তারা এখনও চাকুরি করছেন এবং তারা যেনতেন কোনো অফিসার নন, প্রত্যেকেই হেভিওয়েট। যেমন: মেজর জেনারেল কবির আহমেদ (যিনি শেখ হাসিনার মিলিটারি এডভাইজার ছিলেন এবং বর্তমানে সিলেটে সেনাবাহিনীর স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি এন্ড ট্যাক্টিক্সের কমান্ড্যান্ট হিসেবে কাজ করছেন), মেজর জেনারেল মাকসুদুল হক, মেজর জেনারেল মাহবুবুর রশিদ, মেজর জেনারেল হাবিব উল্লাহ, মেজর জেনারেল আমিনুর, মেজর জেনারেল শেখ সারোয়ার, মেজর জেনারেল মামুন খালেদ, মেজর জেনারেল খালেদ আল মামুন আরো আরো কয়েকজন। 

 

সবচেয়ে দু:খজনক ব্যাপার, তারা প্রত্যেকেই জেনারেল ওয়াকারের আস্থাভাজন। কেউ ডান হাত, কেউ বাম হাত এবং স্বয়ং জেনারেল ওয়াকার উজ জামান তাদের বিচারকার্য সম্পাদনের সুযোগ দিতে চান না; যা চীফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, তার টিম এবং গুম খুন কমিশনের প্রতি সেনাবাহিনীর অসহযোগীতা মূলক আচরণেই প্রমাণিত।

 

তবে যেহেতু উক্ত ২২ জন অফিসারের নানাবিধ অপকর্ম সকল তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গেছে, তাই আইসিটি তাদের বিরুদ্ধে এরেস্ট ওয়ারেন্টও জারি করেছে। আর সমস্যাটা ঠিক এই জায়গাতেই। কারণ, এই সমস্ত হেভিওয়েট সার্ভিং অফিসাররা এরেস্ট হয়ে গেলে জেনারেল ওয়াকার তার মিশন ফুলফিল করতে বেকায়দায় পড়বেন। তাই তিনি কোনোভাবেই সহযোগীতা করছেন না। 

 

তবে সম্প্রতি চীফ প্রসিকিউটর সরকারের উচ্চপর্যায়ের আস্থার উপর নির্ভর করে তার কাজ গুছিয়ে নিতে শুরু করেছেন। অর্থাৎ এতদিন যাবত সেনাবাহিনীর অসহযোগীতা মূলক আচরণের জন্য যাদের এরেস্ট করা সম্ভব হচ্ছিল না, তাদেরকে এরেস্ট করার জন্য সমস্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। 

 

জেনারেল ওয়াকার বুঝেছেন তাদেরকে এরস্ট হওয়া থেকে আর বিরত রাখা সম্ভব নয়। তবে এরেস্ট করলেও খেলা এখনও বাকি। কারণ, যতই তথ্য প্রমাণ থাকুক, চীফ জাস্টিস কোনোভাবে ইনফ্লুয়েন্সড হলে ফেব্রিকেটেড রায় বা আসামীদের যথোপযোগী শাস্তি নিশ্চিত হবেনা। খুব সম্ভবত জেনারেল ওয়াকার সেই কাজটিই করার চেষ্টা করছেন, যাতে করে তার অফিসারদের প্রতি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা না হয়।

 

আর আজকের এই সাক্ষাৎকে ঘিরে যারা ক্যু এর ভয় পাচ্ছেন বা অযথা প্যানিকড হচ্ছেন তারা ভয় পাবেন না। ক্যু কখনও বলে কয়ে সাক্ষাৎ করে হয়না। তারচেয়েও বড় কথা, ক্যু করার মত মোরাল গ্রাউন্ড'ই আর্মির নেই। লেস দ্যান টুয়েন্টি পার্সেন্ট অফিসার সৈনিক এই গর্হিত কাজে এগ্রি করতে পারে, তবে মোর দ্যান ফিফটি পার্সেন্ট অফিসার সৈনিক ফান্ডামেন্টালি ডিসএগ্রি করবে। তারপরও যদি তারা এমন সিদ্ধান্ত বিবেচনায় রাখে, ইনশাআল্লাহ আমরা প্রস্তুত।

 

জান দেব, জুলাই দেব না।

 

ইনকিলাব জিন্দাবাদ।