১ নভেম্বর গোলাম পরওয়ারকে উদ্দেশ্য করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘জামায়াতের সেক্রেটারির নাকি ৭০০ অটোরিকশা আছে, আমি জামায়াতের সেক্রেটারিকে বলবো, আপনি আতঙ্কিত হবেন না, আপনিও ৫টি অটোরিকশার নিবন্ধন পাবেন বৈধভাবে’।
৪ নভেম্বর স্টার নিউজের একটি টকশোতে যুবদলের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুবকল্যাণ তহবিল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সদস্য অ্যাডভোকেট আশরাফ জালাল খান মনন বলেছেন, “এখন অটোরিকশা বন্ধ করে দেওয়ার ফলে দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত কারা হলো? গোলাম পরওয়ার সাহেবের নাম আসছে, কারণ তাঁর ৭,০০০ অটোরিকশা রয়েছে। ৭,০০০ অটোরিকশা মানেই সেখানে জামায়াতের ৭,০০০ কর্মী যুক্ত আছে। সুতরাং, আমরা মনে করছি এই আন্দোলনের সাথে সরাসরি জামায়াতের অবশ্যই ইন্ধন রয়েছে।”
গত ৮ অক্টোবর সময় টিভির একটি টকশোতে বিএনপিপন্থী সাংবাদিক ও কালের কণ্ঠের যুগ্ম সম্পাদক সাঈদ খান বলেছেন, “৮০০ অটোরিকশা ঢাকা শহরে জামাতের সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ারের চলে। যখনই সরকার সেগুলোকে উচ্ছ্বেদ করে ঢাকা শহরকে একটি ডিসিপ্লিনারে শহরে বানাতে চায়, তখন এই গুপ্ত এবং সুপ্ত মিলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে চায়।”
গত ৯ অক্টোবর জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারকে ইঙ্গিত করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন) বলেন, “একটা বড় রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক তিনি বললেন অটোরিক্সাওয়ালাদের যে দাবি সেটা সরকারকে মানা উচিত। পরে অনুসন্ধানে দেখা গেছে ওই নেতার নাকি ৭০০টা অটোরিক্সা আছে।”
বেঙ্গল লেন্স যাচাই করে দেখেছে, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এর বিষয়ে ছড়িয়ে পড়া দাবিটির পক্ষে কোনো তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যেখান থেকে সূত্রপাত
গত ৫ অক্টোবর অটোরিকশা চালকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আমি মনে করি অটোরিকশা চালকদের যেসকল দাবি রয়েছে, সরকারের সেগুলো মেনে নেওয়া উচিত এবং কেউ উস্কানি দেওয়ার সুযোগ পায়, এমন পরিস্থিতি আমাদের কারোরই সৃষ্টি করা উচিত নয়।”
এর পরদিনই ৬ অক্টোবর সকালে এক পোস্টে জামায়াত সেক্রেটারির একটি বক্তব্যের একটি ফটোকার্ড পোস্ট করে হকার ও অটোরিকশা বন্ধে সরব সোহানী শিফা লিখেছেন, “রাস্তায় সামনে দাড়িয়ে আমি অটোরিকশা মালিকদের ফেস করেছি। তারা ৯৫% মাদকাসক্ত। জামায়াত তাদের প্রোগ্রামে মাদক সরবরাহ করে। তাদের নেতাকর্মী মাদকাসক্ত।”
বিকেলে নিজের ফেসুবক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে প্রথমবারের মতো জামায়াত সেক্রেটারির ৭০০ রিকশার দাবিটি করেন সোহানী শিফা লিখেছেন, “পরওয়ার নিজেই ৭০০ অটোরিকশার মালিক!”
একইদিন রাত ১১টা ৩১ মিনিটে এক ভিডিও বার্তায় এই তথ্যের উৎস হিসেবে সোহানী শিফা বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছি রাস্তায়। যখন আমি শাহবাগে গণস্বাক্ষর নেই, তখন সেখানে রিকশাচালকদের মধ্যে একজন আমাকে বললেন, তিনি শাহজাহানপুর একটা গ্যারেজে তার রিকশা রাখেন। তিনি ওইদিন আমাকে এই কথাটা বলে গেছেন যে, 'আমার সামনের যে রিকশার গ্যারেজ, সেখানে এই যে গোলাম পরওয়ারের ২০০ রিকশা আছে। তার ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় সাত-আটশো রিকশা আছে'—এভাবে আমাকে বলে গেছিলেন।”
একই দাবি এনপিবির একটি পডকাস্টেও করতে দেখা গেছে সোহানী শিফাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ফটোকার্ড ও অপপ্রচার
এই দাবিটির পর সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন পেজ থেকে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়াতে দেখা যায়। ৯ অক্টোবর রিউমর স্ক্যানার একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে- আমার দেশ ও সময়ের আলোর ফটোকার্ড ব্যবহার করে ছড়ানো হয়েছে দুটো ফটোকার্ড ছিল ভুয়া। যার একটি লেখা ছিলো “জামায়াতের সেক্রেটারি গোলাম পরোয়ার একাই ৭০০০ অটোরিকশার মালিক”। অপরটির হেডিং ছিলো “একাই ৭১৪টি অটোরিকশার মালিক জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার”।
আরও পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে।
জামায়াত সেক্রেটারির চ্যালেঞ্জ
গত ৯ অক্টোবর এক ফেসবুক পোস্টে জামায়াতের সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার লিখেছেন, “৭০০–৮০০ রিকশা তো দূরের কথা, আমার নামে একটি রিকশা আছে—প্রমাণ দিন। কয়েক দিন ধরে ভুয়া ফটোকার্ড এবং একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রুপের পক্ষ থেকে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। অথচ যার নিজের একটি রিকশাও নেই, তিনি নাকি ৭০০–৮০০ রিকশার মালিক! এ ধরনের প্রচারণা মানুষকে অবাক করেছে, বিস্মিত করেছে।”
যা বলছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাটারিচালিত রিকশা/ইজিবাইক মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, “আমরা এ বিষয়ে দুইবার বক্তব্য দিয়েছি, আজও দিচ্ছি। মিয়া গোলাম পরওয়ার তো দূরের কথা, তাঁর বংশের কারও নামও আমাদের কাছে থাকা ঢাকা মহানগরের রিকশা মালিকদের তালিকায় নেই। এটা রাজনৈতিক কারণে ছড়ানো ভুয়া খবর।”
এ ব্যাপারে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, “না, আমাদের কাছে এমন কোনো ডেটাবেজ বা তথ্য নেই।”