Image description

পর পর দুই দিন একের পর এক ভুয়া হুমকির পর ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানে জরুরি অবতরণ ও পথ পরিবর্তনের তীব্র বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক দিনে ইউরোপের আকাশে অন্তত ৩৪টি বিমান ভুয়া বোমা আতঙ্কের মুখোমুখি হওয়ায় যাত্রীদের জন্য নজিরবিহীন বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

এটা কোনো পরিকল্পিত চক্রান্ত কি না, তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার ইতালি, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, স্পেন, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, ফ্রান্স, গ্রিস, সার্বিয়া এবং চেক প্রজাতন্ত্রের মধ্যে যাতায়াতকারী ফ্লাইটগুলো মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়।

আক্রান্ত এয়ারলাইন্সগুলোর তালিকায় রয়েছে রায়ান এয়ার, এয়ার লিঙ্গাস, উইজ এয়ার, ফিনএয়ার, ইজিজেট, এজিয়ান এয়ারলাইন্স, আইবেরিয়া, স্কাই এক্সপ্রেস, এয়ার সার্বিয়া এবং এলওটি পোলিশ এয়ারলাইন্স।

তবে সকল বিমান নিরাপদে অবতরণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং ব্যাপক তল্লাশির পর সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাজ্যের অন্যতম প্রধান বিমানবন্দর লন্ডনের হিথ্রো এবং বার্মিংহাম বিমানবন্দরও রাতারাতি একাধিক হুমকি বার্তা পেয়েছিল। তবে মেট্রোপলিটন পুলিশের অ্যারিয়েশন পুলিশ কমান্ডের বিশেষজ্ঞ তদন্তকারীদের সহায়তায় প্রাথমিক পর্যালোচনার পর জানা গেছে যে, সেগুলো সবই ভুয়া ছিল।

মেট কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, হিথ্রোতে ওঠা নামা করা চারটি বিমানে এমন হুমকির বিষয়ে মূল্যায়ন শেষে নিরাপত্তাজনিত কোনো ঝুঁকি পাওয়া যায়নি।

এর আগে মঙ্গলবারও একই ধরণের ভুয়া সতর্কবার্তা পাওয়ার পর ইউরোপে সাতটি বিমানে তল্লাশি বা সেগুলোর পথ পরিবর্তন করতে হয় এবং সোমবার যুক্তরাজ্য থেকে বুলগেরিয়াকামী একটি বিমানে ভিত্তিহীন এক হুমকির কারণে গন্তব্য বদলানো হয়েছিল। চলতি সপ্তাহে সর্বমোট অন্তত ৩৩টি বিমান এই ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ চক্রান্তের শিকার হয়েছে।

ঘটনাগুলোর পর তদন্তকারীরা জানান, এই ধরনের ভুয়া চক্রান্ত বা হুমকিসমূহ রাশিয়া বা ইরানের মতো কোনো শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ মদদে করা হচ্ছে কি না, তার নির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো মেলেনি।
যদিও মহাদেশজুড়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) এয়ারলাইন্সগুলোতে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিঘ্ন ঘটানোর তীব্র নিন্দা জানিয়ে হুমকির উৎস খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (অপারেশনস, সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি) নিক কেয়ারিন এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, নিরাপত্তা শিল্প খাতের প্রথম অগ্রাধিকার এবং যেকোনো হুমকিকেই সংস্থাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবহন কমিশনার অ্যাপোস্টোলোস সিটজিকোস্টাস মনে করেন, এই ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো পারস্পরিক সম্পর্ক আছে কি না তা চূড়ান্ত করে বলা এখনো সময়ের আগাম অনুমান হবে, তবে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে এমন যেকোনো হুমকিই সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

ইতালির রোম ও বুলগেরিয়ার সোফিয়ার বিমানবন্দরে প্রেরিত ইমেইল বার্তার নেপথ্যে ‘মেল স্টেট’-এর নাম জড়িয়ে পড়েছে। রোম বিমানবন্দর পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ এবং এএফপি সূত্রের খবর অনুযায়ী, পাঠানো বার্তায় নিজেদের ‘মেল স্টেট’-এর যোদ্ধা দাবি করে হুমকিদাতারা উল্লেখ করে, আমরা আজ আমাদের কর্মের মাধ্যমে ইতিহাস তৈরি করব। আপনাদের এই নারীবাদী শাসনব্যবস্থা তা সারা জীবন মনে রাখবে। আগামী ৬০ মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটবে এবং আজ আপনাদের আকাশ লাল হয়ে উঠবে।

প্রসঙ্গত, মেল স্টেট ২০১৬ সালে ভ্লাদিস্লাভ পোজদনিয়াকভ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাশিয়ার একটি অতি-জাতীয়তাবাদী ও নারীবাদী-বিরোধী গোষ্ঠী। ইউক্রেন যুদ্ধের একজন প্রকাশ্য সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও পোজদনিয়াকভ টেলিগ্রামে এসব বার্তার দায় স্বীকার বা মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছেন।

আয়ারল্যান্ডের কর্ক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে বৃহস্পতিবার সকালে তারা টেলিফোনে একটি অজ্ঞাত পরিচয় হুমকি পেয়েছিল, যার ফলে বিমান চলাচলে বিলম্ব হয়। ধারণা করা হচ্ছে, উক্ত বিমানটি লন্ডন স্ট্যানস্টেড থেকে আসা রায়ান এয়ারের একটি ফ্লাইট ছিল। অন্যদিকে রায়ান এয়ারের পেসকারা-ব্রাসেলস রুটের একটি বিমানের পেছনের শৌচাগারের দেয়ালে বোমা শব্দটি লেখা দেখে বিমানটিতে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়। যদিও এই চরম ভোগান্তি মোট কার্যক্রমে খুব সামান্য প্রভাব ফেলেছে, কারণ ইউরোকন্ট্রোল-এর তথ্য অনুযায়ী ওই দিন ইউরোপের আকাশে প্রায় ২৭৪০০টি নির্ধারিত ফ্লাইট চলাচল করছিল। এছাড়া ডাবলিনের এক ঘটনায় এয়ার লিঙ্গাসের একটি এয়ারবাস এ৩২০ বিমান বোমার হুমকির পর ফ্রান্সের ইভ্রেক্স সামরিক ঘাঁটিতে ডাইভার্ট করা হয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে ওই ঘাঁটিতে অবতরণ করতে অস্বীকার করার অভিযোগে বিমানের পাইলটকে ফরাসি কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি সুপারমার্কেটের কোল্ড স্টোরেজ কুলিং সিস্টেমে সাইবার হামলার ঘটনার পরপরই বিমানে এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ অবশ্য রেফ্রিজারেটর হ্যাকিংয়ের দায় ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশাসনের ওপর চাপানোর ঘটনাকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে দাবি করেছেন।

সাংবাদিকদের পেসকভ বলেন, তাদের দেশের বিরুদ্ধে যেকোনো বিষয়ে এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলার একধরনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। রোমে ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেতো নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, প্রতিদিন ফ্রান্সের হাসপাতালের রক্তের সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত করা থেকে শুরু করে সাধারণ রেফ্রিজারেটর কিংবা এসব ভুয়া খবর তৈরি করার পেছনে তলে তলে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এই প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধের মাস্টারমাইন্ড কারা তা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এটিকে মূলত 'আন্ডার-থ্রেশহোল্ড ওয়ারফেয়ার' বলা হয় কারণ এর মূল অপরাধীকে সরাসরি শনাক্তের মাত্রার নিচে রেখে পরিকল্পনাগুলো রূপায়ণ করা হয়, যাতে স্পষ্ট করে কারও ওপর দায় চাপানো সম্ভব না হয়।

আক্রান্ত ফ্লাইটগুলোর একটি বড় অংশ স্বল্প খরচের ক্যারিয়ার বা বাজেট এয়ারলাইন্সের হলেও ঘটনার প্যাটার্নে কোনো নির্দিষ্ট ধরন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিমান বিশেষজ্ঞগণের মতে, এ ধরনের ভুয়া অ্যালার্ট প্রতিদিন পাওয়া গেলেও সংক্ষিপ্ত সময়ে এতগুলো দৃশ্যত বিশ্বস্ত হুমকি পাওয়া একটি সমন্বিত চক্রান্তের সংকেত দেয়। স্ক্যানিং ও বহুমাত্রিক নিরাপত্তা বলয়ের কারণে জাহাজে ভারী বিস্ফোরক বহন করা প্রায় অসম্ভব হলেও প্রায় ৩৫০০০ ফুট উঁচুতে বিমানের সামান্য ক্ষতিও মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। বিমান ডাইভার্ট করা যেমন ব্যয়বহুল, তেমনই ভোগান্তির কারণ। তবু সামান্যতম সন্দেহ হলেও এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের বিকল্প কোনো পথ খোলা থাকে না। ইন্টারনেটে উড্ডয়ন সংক্রান্ত সব তথ্যের সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে চক্রান্তকারীরা আজকাল সহজেই বিমানের সময়সূচী ও কারিগরি তথ্যাদি হাতের মুঠোয় পেয়ে যাচ্ছে।

ওসপ্রে ফ্লাইট সলিউশনস-এর এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ রিস জোন্স মনে করেন যে, বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোড়ালো থাকা সত্ত্বেও স্বাভাবিক প্রোটোকল পরিবর্তন করা উচিত নয়। তবে তিনি সতর্ক করে জানান যে, এই ধরনের ঘটনার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় নিরাপত্তা বাড়াবে, যা সাধারণ ভ্রমণকারীদের মধ্যে অতিরিক্ত উৎকণ্ঠা ও গণমাধ্যমের কভারেজ বাড়িয়ে তুলবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান