লং মার্চ ও ফাঁকা গ্যাস সিলিন্ডার দেখিয়ে দেশের জনগণকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছেন, হুমকি-ধমকি ও আন্দোলনের পথ বেছে না নিয়ে সংসদে এসে কথা বলুন। সংসদের বাইরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এসেও সরকারের কাছে পরামর্শ ও প্রস্তাব দিতে পারেন। দেশ পরিচালনায় বিরোধী দলের গঠনমূলক সহযোগিতা চায় সরকার।
একই সঙ্গে কৃষির উদ্বৃত্ত উৎপাদন কাজে লাগিয়ে আলু থেকে স্টার্চ (মাড়) তৈরির শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) ১৪তম আন্তর্জাতিক কৃষি প্রযুক্তি মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিরোধী দলের আন্দোলন কর্মসূচির সমালোচনা করে মীর শাহে আলম বলেন, যদি গ্যাস-বিদ্যুৎ লংমার্চ করে পাওয়া যেত, ঘাটতি যদি মেটানো যেত, সবচেয়ে বড় লং মার্চ আমরাই করতাম। মসুর ডালের ঘাটতি যদি আমরা মেটাতে পারতাম, তাহলে সবচেয়ে বড় লং মার্চ আমরাই করতাম।
লং মার্চ করে আর ফাঁকা সিলিন্ডার দেখিয়ে এ দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করা যাবে না।
সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, জনগণ পাঁচ বছরের জন্য সরকারকে নির্বাচিত করেছে। এই সময়ে সাধারণ মানুষ ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকার কী করে, জনগণ তা দেখতে চায়। পাঁচ বছর পর ব্যালটের মাধ্যমে জনগণ আবার তাদের মূল্যায়ন করবে।বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আমি বিরোধীদলীয় বন্ধুদের অনুরোধ করব, আমাদের হুমকি-ধমকি, আন্দোলনের পথ বেছে না নিয়ে সংসদে আসুন। সংসদের বাইরে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এসে আমাদের সাজেশন দেন, দেশ পরিচালনায় আমরা কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারি। এ ব্যাপারে আপনাদের সাজেশন, উপদেশ, পরামর্শ আমরা কামনা করছি।
অনুষ্ঠানে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আমদানি নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা তুলে ধরে মীর শাহে আলম বলেন, বেকারি, গ্লুকোজ, বস্ত্রশিল্পের ফিনিশিং, ওষুধ উৎপাদন এবং কাপড় ধোয়ার কাজে স্টার্চ পাউডার ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার এই পণ্য আমদানি করে। অথচ দেশে উৎপাদিত আলুর একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে এবং নষ্ট হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই আলু থেকে যদি আমরা স্টার্চ তৈরি করার ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলি, তাহলে বাংলাদেশের এই ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে যে স্টার্চ পাউডার আমদানি করছি, এখানে তা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে।
এ বিষয়ে দেশি-বিদেশি গবেষক ও কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, ছোট কিংবা বড়— দুই ধরনের শিল্পই গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে হবিগঞ্জে সীমিত পরিসরে একটি কোম্পানি নিজেদের প্রয়োজনীয় স্টার্চ উৎপাদন করছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী তিনিও ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে কাজ করছেন এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে আলু থেকে স্টার্চ উৎপাদনের জন্য আট থেকে দশটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তার মতে, মানুষের খাদ্যচাহিদা মেটানোর পর যে উদ্বৃত্ত আলু থেকে যাচ্ছে, তা শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
আলু ও সবজি রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরে মীর শাহে আলম বলেন, উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য দ্রুত বিদেশে পাঠানোর জন্য বগুড়াকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর এবং সেখানে কার্গো সুবিধা চালুর বিষয়ে সরকার কাজ করছে। এতে উত্তরাঞ্চলের আলুসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা সহজ হবে।
এর আগে, কৃষি গবেষকদের মূল্যায়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কৃষি গবেষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং সমাজে সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে। এ বিষয়ে গবেষকদের কাছ থেকে প্রস্তাবনা চাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর একটি দেশ। আমরা যারা রাজনীতি করি, দেশ পরিচালনা করি, তারা মুখে বলি কৃষিনির্ভর দেশ, কৃষি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু দিন শেষে কৃষি, কৃষক এবং কৃষি নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাদের জন্য আমরা কতটুকু করেছি, তা ভাববার সময় এসেছে।
গবেষকদের যথাযথ মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের কিংবা পৃথিবীর যেকোনো দেশের সবচেয়ে মেধাবী মানুষরা হচ্ছেন গবেষক। আমরা কি আদৌ গবেষকদের সেই মূল্যায়ন করতে পারছি?
তিনি জানান, গবেষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এসেছে। সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, ১৪তম আন্তর্জাতিক কৃষি প্রযুক্তি মেলায় ১২টি দেশের প্রায় ২০০টি কোম্পানি অংশ নিয়েছে। মেলায় ৪৭৩টি স্টল রয়েছে। তুরস্ক, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের কৃষি প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য উদ্ভাবন ও যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নিয়েছে।
শীর্ষনিউজ