শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুর কাজ তিন বছরেও শেষ হয়নি। উল্টো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাঝপথে কাজ ফেলে উধাও হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নদীর দুই পাড়ের মানুষ। বর্তমানে নদীর ওপর বাঁশের সাঁকো পেতে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন আশপাশের ১০ গ্রামের মানুষ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়ন থেকে মহনগঞ্জ সড়কের পাগলা নদীর ওপর প্রায় ৭৫ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় এলজিইডি। পরবর্তীতে যথাযথ টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেতুটির নির্মাণকাজের ঠিকাদারি পায় ‘মেসার্স ধ্রুব ট্রেড এজেন্সি’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পাঁচ কোটি ৮২ লাখ ১২ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর সেতুটির নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১৮ মাসের মধ্যে অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১১ জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এ পর্যন্ত সেতুটির মাত্র ৩৪ শতাংশ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজের প্রায় ২৯ শতাংশ বিল ইতোমধ্যে উত্তোলন করে নিয়েছে।
নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে কাজ শেষ না করায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বেশ কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং বারবার নোটিশ পাঠানো হয়। কিন্তু তাতেও কোনো সাড়া না মেলায় শেষ পর্যন্ত নিয়ম অনুযায়ী ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দরপত্র বাতিল করে এলজিইডি। ফলে বর্তমানে সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে এবং নদীর দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা কার্যত সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

সেতুটির ওপারে বাগেরভিটা, দক্ষিণ দাড়িয়ারপাড় ও উত্তর কান্দুলি এবং এপারে সারিকালিনগর, দড়িকালিনগর ও কোণাগাঁওসহ মোট ১০টি গ্রাম অবস্থিত। সেতুটির নির্মাণকাজ মাঝ পথে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব এলাকার মানুষকে প্রতিদিন বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করে নদী পার হতে হচ্ছে।
স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এই সেতুটির সঙ্গে এলাকার হাজার হাজার মানুষের শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার মতো মৌলিক বিষয়গুলো সরাসরি জড়িত। সেতুটির আশপাশে রয়েছে চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি কওমি বা আলিয়া মাদ্রাসা এবং একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। নদী পারাপারের এই মারাত্মক ঝুঁকির কারণে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, মুমূর্ষু রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটোই বহুগুণ বেড়ে গেছে।
ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেতুর কাজ দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ থাকলেও জনগণের যাতায়াতের জন্য কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের বিকল্প নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থার ব্যবস্থা করেনি। ফলে বাধ্য হয়েই প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে একটিমাত্র নড়বড়ে বাঁশের ওপর দিয়ে তাদের পারাপার হতে হচ্ছে। আর বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বেড়ে গেলে নৌকা কিংবা কলাগাছের ভেলা দিয়ে চরম কষ্টে নদী পার হতে হয়।
দক্ষিণ দাড়িয়ারপাড় গ্রামের বাসিন্দা এরশাদ আলী বলেন, ‘বাঁশের সাঁকো দিয়ে পারাপার খুবই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। আর বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বাড়ার সাথে সাথে এই সাঁকো দিয়ে আর পার হওয়া যায় না। আমরা চাই, যেভাবেই হোক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত সেতুর বাকি কাজটি শেষ করে।’
একই গ্রামের বাসিন্দা জহুরুল হক বলেন, ‘তিন বছর ধইরা সেতুর কাম বন্ধ পইড়া আছে। আমাগো ছেলে-মেয়েরা সময়মতো স্কুলে যাইবার পায় না। পরিবারে কোনো অসুখ-বিসুখ হইলে রোগী নিয়া হাসপাতালে যাইবার নানা বিপত্তিতে পড়তে হয়। আমরা সাধারণ মানুষ, কষ্ট করে ধান-সবজি চাষ করে বাজারে বেইচমু, কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় সেটা অনেক কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেতুটার নির্মাণকাজ শুরু করার আগে যদি আমাগো চলাচলের জন্য একটা বিকল্প রাস্তাও কইরি দিতো, তাইলে খুব বালা অইতো।’
উত্তর কান্দুলি গ্রামের বাসিন্দা জামাল হোসেন বলেন, ‘সেতুর কাম শুরু অইছে দেইখ্যা আমরা মনে করছিলাম, আমাগো কষ্টের দিন বুঝি অবসান অইল। কিন্তু ঠিকাদার সেই কামডা মাঝপথেই বন্ধ কইরা চইলা গেছে। এহন বাধ্য অইয়া আমাগো বাঁশের ওপর দিয়া পার অই লাগে। ছোট বাচ্চা আর বুড়া মানুষ এই পারাপার হইতে গেলে কলিজা কাইপে উঠে, কখন জানি পিছলে নদীতে পইড়া যায়। বর্তমানে এই এলাকাডা একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে গেছে।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ধ্রুব ট্রেড এজেন্সির মালিক সৈয়দ উজ্জলের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিনিধি দাবি করেন, সেতুটির প্রথম পাইলিংয়ের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় পাইলিংয়ের যে সুনির্দিষ্ট স্থানটি নির্ধারণ করা হয়েছে, তা ঠিক নদীর মাঝখানে পড়েছে। এই স্থানে পাইলিংয়ের কাজ করতে গেলে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন, যা মূল দরপত্রে উল্লেখ ছিল না। কিন্তু এলজিইডি আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সুরাহা বা আলোচনা না করেই একতরফাভাবে দরপত্র বাতিল করেছে। তাই আমরা বাধ্য হয়েই এই ঘটনার প্রতিকার চেয়ে আদালতে মামলা করেছি। আদালত যে রায় প্রদান করবে, আমরা তা মাথা পেতে মেনে নেব।
শেরপুর জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার মাহমুদুল আশরাফ বলেন, চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েক দফা সময় বৃদ্ধি এবং বারবার নোটিশ দেওয়ার পরও ঠিকাদার কাজ সম্পন্ন না করায় তাদের দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। আমরা এরই মধ্যে সেতুটির নতুন প্রাক্কলন বা এস্টিমেট তৈরি করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব সেতুটির বাকি থাকা নির্মাণকাজ শেষ করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।