ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মাদকবিরোধী অভিযানের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারুফ হোসেন দুখু মিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন তার মা সেলিনা বেগম।
তার অভিযোগ, তিনি থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ প্রথমে অসহযোগিতা করেছে, পরে নিজেরা এজাহার লিখে তার টিপসই নিয়েছে। এমনকি মামলার কপিও দেয়নি তদন্তের কথা বলে।
পুলিশের এলিট ফোর্স এসআরবি ফাঁকা গুলির যে দাবি করেছে, সেটিও উড়িয়ে দিয়েছেন সেলিনা। বলেছেন, ‘ফাঁকা গুলি হলে তো আমার ছেলেটা মারা যেত না। এটা ফাঁকা গুলি ছিল না, আসল গুলি।’
সেলিনা টাইমসকে বলেন, তিনি মামলা করতে গেলে তাকে দীর্ঘ সময় থানায় বসিয়ে রাখা হয়। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে থানায় যাওয়ার পর বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এ সময় তাকে নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে কম্পিউটারে এজাহার লিখে সেখানে টিপসই নেওয়া হয়। তবে মামলার কাগজ চাইলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তা দেওয়া যাবে না বলে জানানো হয়।
এ বিষয় জানাতে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজুর একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলান টাইমসকে বলেন, ‘যেহেতু পুলিশ মামলার কাগজ দেয়নি, তাই এখানে নিশ্চয় কোনো ঝামেলা আছে। বাদীপক্ষ এখন সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি পরিষ্কার করতে পারে।’
এই ঘটনায় বুধবার এসআরবি যাত্রাবাড়ী থানায় যে দুটি এজাহার জমা দিয়েছে, তার কোনোটিতে মারুফের মৃত্যুর উল্লেখ পর্যন্ত নেই। বাহিনীটির দাবি, তাদের সদস্যরা পাঁচটি ফাঁকা গুলি ছুড়েছিলেন।
এজাহারে মাদক উদ্ধার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা, তাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং ফাঁকা গুলি ছোড়ার কথা বলা হয়েছে।
মামলার বাদী এসআরবি-১০ লালবাগ ক্যাম্পের করপোরাল বদরুদ্দোহজা টাইমসকে বলেন, ‘দুর্বৃত্তদের গুলিতে মারুফের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। এ কারণেই এসআরবির মামলায় মারুফের মৃত্যুর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।’
তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের পরিবারের অভিযোগ, সাদা পোশাকে থাকা এসআরবি সদস্যরাই এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়েছিলেন।
মারুফের বড় বোন রোকসানা বেগমের অভিযোগ, ঘটনার দিন সাদা পোশাকধারী ১০ থেকে ১২ জন এসআরবি সদস্য স্থানীয় কয়েকজনকে আটক করেন। এ সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও টাকা নেওয়া হয়। আটক ব্যক্তিরা সাদা পোশাকধারীদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে চিনতে না পারায় তাদের মারধর করেন।
রোকসানা বলেন, ‘এরপর এসআরবি সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। আটক লোকজন তখন বিভিন্ন দিকে দৌড়াতে থাকে। গুলির শব্দ শুনে আমার ছোট ভাই কী হচ্ছে দেখতে বের হয়। তখন তার গায়ে গুলি লাগে।’
মারুফের মা সেলিনা বেগমও অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার ভাষ্য, তাদের গায়ে র্যাবের কোনো পোশাক ছিল না, পরিচয়পত্রও ছিল না। সবাই সাধারণ পোশাকে ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘প্রথমে হাতে হাতে মারামারি করেছে। পরে গুলি চালিয়েছে। অভিযান চালাতে এলে যাকে সন্দেহ হবে, তাকে ধরবে। কিন্তু এভাবে উড়াধুরা গুলি চালানোর নিয়ম তো নেই।’
কাজ শেষে বাসায় ফিরে বাইরে গিয়েছিলেন মারুফ
মারুফের বাবা নেই। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তার মা সেলিনা বেগম মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করেন। মারুফ একটি সিলভার বা অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। তার আয় ও মায়ের গৃহকর্মের টাকায় চলত সংসার।
মারুফের স্ত্রী মীম আক্তার রুনা জানান, ঘটনার দিন সকালেও স্বাভাবিকভাবে কাজে যান তার স্বামী। বিকাল ৫টার দিকে বাসায় ফিরে জামাকাপড় পরিবর্তন করে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যান। যাওয়ার সময় মীমকে খাবার রান্না করে রাখতেও বলে যান।
সেলিনা বেগম জানান, কাজ শেষে বাসায় ফিরে পোশাক পরিবর্তন করে বন্ধুদের সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে বাইরে গিয়েছিলেন মারুফ। পরে বন্ধুদের কাছ থেকে খবর পান, ওই এলাকায় মারামারি হচ্ছে। অনেক মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছে। ছেলেও ঘটনাটি দেখতে গিয়েছিলেন।
‘ওখানে একটা হোটেল আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে দেখছিল। হঠাৎ দৌড়াদৌড়ি ও গুলি শুরু হয়। সেই গুলি এসে ডান পাশে গলায় লেগেছিল’, বলেন তিনি।
সেলিনা বলেন, ‘একজন পুলিশের লোক খবরের মধ্যে বলছে, আমার ছেলে মাদকের সঙ্গে জড়িত ছিল। এসব মিথ্যা কথা। এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখবেন, আমার সোনার টুকরা ছেলে।’
প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, এলাকায় মারুফের ব্যাপারে কোনো প্রকার অভিযোগ নেই। মানুষের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল। ছেলেটির বিরুদ্ধে আগে কোনো খারাপ কাজ বা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ নেই।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ওই ঘটনার পরদিনই পুলিশি অভিযানে নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরীসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়।
এজাহারে যা বলছে এসআরবি
এসআরবির এজাহার অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর বিকেল পৌনে ৬টার দিকে যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে আউটফল কোয়ার্টারের কাছে একটি ভবনে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটের দিকে অভিযানকারী দল সেখানে পৌঁছে ভুট্টো, নাসির, আরমান ও আরিফ নামের চারজনকে আটক করে।
এ ঘটনায় দুটি মামলায় তাদের আসামি করা হয়। এজাহারে বলা হয়, আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে ২৪৫টি ইয়াবা বড়ি, ১২৯ প্যাকেট হেরোইন, ১ হাজার ৫৪০ টাকা এবং দুটি ফিচার ফোন উদ্ধার করা হয়।
এজাহারের অভিযোগ অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের স্বজনসহ প্রায় ১২০ থেকে ১৩০ জন দেশীয় অস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্র ও ইটের টুকরা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। আটক ব্যক্তিদের ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং এলোপাতাড়ি গুলিও চালানো হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
একপর্যায়ে দুই কর্মকর্তার সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তারা পাঁচটি ফাঁকা গুলি ছোড়েন বলে এজাহারে দাবি করা হয়। পরে আটক চার ব্যক্তি পালিয়ে যান।
এসআরবি-১০ লালবাগ ক্যাম্পের এক কর্মকর্তা অভিযান নিয়ে একটি মামলা করেন। যদিও ওই ক্যাম্প থেকেই প্রথমে সেদিন রাতে কোনো অভিযানে অংশ নেওয়ার কথা অস্বীকার করা হয়েছিল।
মারুফের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাহিন হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে তার শরীরে দুটি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মৃত ব্যক্তির পিঠ ও কাঁধে আঘাত ছিল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (মিডিয়া) আকতার হোসেন বলেছেন, ধলপুরে সেদিন এসআরবি সদস্য ও মাদক চোরাকারবারিদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে এক কিশোর আহত হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।