Image description

রাজধানীর ভাটারা থানাধীন পুলিশ হাউজিং-১ এলাকায় পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের একটি বাড়ি রয়েছে। সাড়ে ছয় কাঠা জমির ওপর নির্মিত তিনতলা বাড়িটি তিনি অনলাইনে এয়ারবিএনবি (Airbnb) অ্যাপের মাধ্যমে ভাড়া দিতেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি বাড়িটি ভাড়া নিয়ে কেউ রাত্রিযাপন করতেন, আবার কেউ পার্টি করতেন। বাড়িটি দেখাশুনার জন্য মাহবুব আলম নামে একজন কো-হোস্টও নিয়োগ দিয়েছিলেন আব্দুল্লাহ আল জহির। ওই বাড়ি ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন পার্টির নামে মাঝেমধ্যেই চলত অসামাজিক কর্মকাণ্ড। মদ, নারী ও অসামাজিক কার্যকলাপ—সবই চলত ফ্রি স্টাইলে। বাড়িটি এক পুলিশ কর্মকর্তার হওয়ায় ভয়ে কেউ ওদিকে তাকানোর সাহসও পেত না। অনলাইনে এয়ারবিএনবি অ্যাপের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া ওই বাড়ি থেকে আয়ের ৭০ ভাগ যেত জহিরের অ্যাকাউন্টে, আর বাকিটা নিতেন তার নিয়োগ দেওয়া কো-হোস্ট মাহবুব।

অবশেষে সোমবার গভীর রাতে ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্য ও নারীসহ ৮৪ জনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উত্তরা বিভাগ। আটককৃতদের মধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তার দুই মেয়েও রয়েছে; তবে তাদের নাম প্রকাশ করেনি ডিবি। পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে অবাধে অপকর্ম চললেও এতদিন প্রশাসন ছিল নিশ্চুপ, এমন দাবি স্থানীয়দের।

এদিকে এ ঘটনার পর অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার বিষয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু করেছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও। এছাড়া ভাটারা থানা এলাকায় তার সাড়ে ছয় কাঠা জমি কেনার টাকার উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। 

 

 

গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির যুগান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ হাউজিং-১ এর ওই বাড়িটিতে অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে নারী-পুরুষসহ ৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে। এয়ারবিএনবি অ্যাপের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া ওই বাড়িতে উঠতি বয়সি ছেলে-মেয়েরা অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালাতো। ডিজে পার্টির নামে সেখানে অবাধে অসামাজিক কার্যকলাপ চলত। মদ, গাঁজা, কনডমসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে।’ 

তিনি আরও জানান, বাড়িটিতে মোট ৫টি রুম রয়েছে এবং অনলাইনে বুকিং নেওয়া হতো। একেকটি রুম ১০ জনে ভাড়া নিতো। অতিরিক্ত লোকজন থাকলে প্রতি ব্যক্তির জন্য ৬০০ টাকা করে রেজিস্ট্রেশন ফি নেওয়া হতো। সেখানে পুরো ডিজে পার্টি বসত। দুপুর ১২টা থেকে পরের দিন সকাল ৮টা বা ১১টা পর্যন্ত এসব কর্মকাণ্ড চলত। মাসে ১৮ থেকে ২০টি প্রোগ্রাম হতো এবং প্রতি প্রোগ্রামে লাখ খানেক টাকা ভাড়া আদায় করা হতো।

জানা গেছে, এয়ারবিএনবি হলো একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস বা প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে মানুষ তাদের বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, ভিলা বা রুম স্বল্প ও দীর্ঘ সময়ের জন্য পর্যটক বা অতিথিদের কাছে ভাড়া দিতে পারেন এবং অতিথিরা বুকিং করতে পারেন। অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের বাড়িটি এক কাঠার ওপরে (মূলত সাড়ে তিন কাঠা জমির ওপর নির্মিত)। সেখানে কনটেইনার দিয়ে বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দিতেন তিনি এবং সেখান থেকে মোটা অঙ্কের টাকাও আসত।

ডিবি জানিয়েছে, রাতভর ডিজে পার্টি ও মাদকসেবনসহ মাদকের কারবার পরিচালিত হয়—এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভাটারা থানাধীন পুলিশ হাউজিং-১ এর ওই বাড়িতে অভিযান চালায় গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের একটি দল। অভিযানে ২৬ জন নারী ও ৫৮ জন পুরুষকে আটক করা হয়েছে। আটকদের মধ্যে একজন আফগানিস্তানের নাগরিকও রয়েছেন। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ডিবি পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই বাড়ি থেকে গাঁজা, ইয়াবা, মদ ও কনডম জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া ইয়াবাসেবনের সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে। 

 

 

এ ঘটনার পর মঙ্গলবার পুলিশের আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির সই করা এক অফিস আদেশে আব্দুল্লাহ আল জহিরকে রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি অনলাইনে বাড়িটি ভাড়া দিয়ে থাকি এবং সেখানে কিছু কঠোর নিয়মও আছে। সেখানে কোনো অবৈধ কাজ হয়ে থাকলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ আমার নেই; তবে অসৎ উদ্দেশ্যে আমি বাড়ি ভাড়া দিতাম না। দেশ-বিদেশের অনেকেই বাড়িটি ভাড়া নেন। কেউ ভাড়া নিয়ে কোনো অসামাজিক কাজ করতে চাইলে অতীতে সেগুলো প্রতিহত করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এবার একটি জন্মদিনের পার্টির কথা বলে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা যে এ ধরনের কাজ করবে বা মদ আনবে, সেটা তো আমি জানতাম না।’