সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও টকশো আলোচনায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) তীর্যক ভাষায় সমালোচনা করে চলেছেন বিএনপিপন্থী টকশো আলোচক রেজাউল করিম রনি। সমালোচনার ক্ষেত্রে রনিকে প্রায়শই আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করতে দেখা গেছে। রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণে কখনো কখনো অপতথ্যও ব্যবহার করেছেন তিনি। প্রতিপক্ষকে আক্রমণের ভাষা প্রায়শই রাজনৈতিক সৌজন্যের সীমাকে অতিক্রম করে বলে অভিযোগ তার সমালোচকদের।
তবে রাজনৈতিক আক্রমণের জবাবে ‘কালা মাগুর’, ‘কালা পাঠা’, ‘কালা পাডা’সহ নানা বর্ণবাদী সম্বোধনে রনিকে উদ্দেশ্য করে আক্রমণ করতেও দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বেঙ্গল লেন্সের যাচাইয়ে দেখা গেছে, জামায়াত ও এনসিপির পক্ষে সক্রিয় ফেসবুক আইডি ও পেইজ থেকে মূলত এ ধরনের আক্রমণ করা হচ্ছে।
রনির পোস্ট, রিলস ও ভিডিও ক্লিপ বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটিতেই তাঁর বক্তব্যের যুক্তি খণ্ডন করার বদলে তাকে সরাসরি ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়।
সম্প্রতি জিটিভির একটি টকশোতে এনসিপি নেতা সারজিস আলমের সঙ্গে সহ-আলোচক ছিলেন রনি। সেই টকশোর ২ মিনিট ১০ সেকেন্ডের একটি ক্লিপ তার ফেসবুক পেইজে পোস্ট করেন তিনি। ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘সারজিস আলমের গুজব এবং ন্যারাটিভ প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে হাতেনাতে ধরলেন রেজাউল করিম রনি’। ১৩ অক্টোবর বিকেল ৫টা পর্যন্ত পোস্টটিতে ১৯ হাজার ৪০০ রিঅ্যাক্ট পড়ে। কমেন্ট আসে ৭৭৫টি, আর শেয়ার হয় ৩২৬ বার।
পোস্টের কমেন্টে যারা রনির বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেননি তাদের বেশিরভাগ মন্তব্যই ছিল ব্যক্তি আক্রমণকেন্দ্রিক। এর মধ্যে ‘কালা পাডা’ লেখা হয়েছে ৬ বার, ‘কালা মাগুর’ ৩ বার, ‘কালা পাঠা’ ২ বার এবং ‘kala pada’ ২ বার।
কারা রনিকে বর্ণবাদী আক্রমণ করে
র্যান্ডম সার্চে দেখা যায় Mahi khan নামে একটি ফেসবুক আইডিতে গত ২৮ সেপ্টেম্বরে একটি পোস্ট করা হয়, সেখানে উল্লেখ করা হয়- আমার বড় ভাই Rezaul Karim Rony ওরফে ‘‘কালা মাগুর’’ একটু আগে Jamuna Tv তে টকশো তে বললেন “Salman Muqtadir is a pathological Lier” কি রাগ ক্ষোভ তার চোখেমুখে!!! এত্ত রাগ হয়ে তো Salman এর ১৯৩ টা Ex ও তাকে নিয়ে কথা বলে নি। আমার বড়ভাই কালামাগুর রনি দিনের পর দিন চাটার ফলেও সে পদ টদ পাচ্ছে না, চাটতে চাটতে জিহ্বা খালাই যাচ্ছে! নেতা আশা করি আমার বড় ভাইটাকে মূল্যায়ন করবেন। (বানান অপরিবর্তিত)
Mahi khan এর ফেসবুক আইডিতে তথ্য অনুসারে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০ ব্যাচের শিক্ষার্থী। তিনি এনসিপির পক্ষে ফেসবুকে লেখালেখি করেন। শুধু Mahi khan না, এমন আরো একাধিক আইডি, পেইজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জামায়াত- এনসিপির পক্ষে অ্যাক্টিভিজম করা আইডি বা পেইজ থেকে রনিকে বডি শেমিং করা হয়।
Gen Z Shariatpur আইডি থেকে জিটিভির টাইমলাইন বাংলাদেশের টকশোর একটি ভিডিও ক্লিপ শেয়ার দিয়ে ক্যাপশনে বলা হয়, ‘Sarjis Alam তো জায়গা মতো খপ করে ধরছে কালা মাগুর রনিকে। চেহারাডা দেহেন একটু। এনসিপির সাথে টক শো করার যোগ্য ব্যক্তি বিএনপিতে নাই, আছে শুধু চাঁদাবাজ।’
MD Zakaria Hossian এর আইডি থেকে এনপিবি নিউজের একটি ক্লিপ শেয়ার করে ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘বিএনপির ১২ বাতারির মধ্যে কা'লা মাগুর রনি এখন চাঁদাবাজদের পক্ষ নিচ্ছে। চাদাবাজি এখন সিস্টেমের মধ্যে আানাতে কয়! বাই দ্য ওয়ে, পাডা রনি চাঁদাবাজির পক্ষে নাচতেছে কারণ এইটা বিএনপির লোকজন করতেছে। সামহাউ এইটা জামায়াত করলে কিসের সিঙ্গাপুর, কিসের ইউরোপ- প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার আলাপরে সালকুম করে দিতো। এই রকম কালা পাড়ার জন্য টকশো জয় বাংলা।’
Habibur Rahman নামের একটি আইডি থেকে ঠিকানা নিউজের টকশোর একটি ক্লিপ শেয়ার করে বলা হয়, 'প্রশ্ন কমন না পড়ায় কালামগুর কট।’
সিনিয়র সাংবাদিক সংঘ নামের একটি পেইজ থেকে এখন টেলিভিশনের টকশোর একটি ক্লিপ শেয়ার করে বলা হয়, ‘মুখ ফসকে সত্য কথা বলে ফেললেন কালা মাগুর রনি।’
বেঙ্গল লেন্সের যাচাইয়ে দেখা যায়, শুধু উপরের ফেসবুক আইডি-পেইজ নয়, এমন অসংখ্য ফেসবুক আইডি-পেইজ থেকে রনিকে বর্ণবাদী আক্রমণ করা হয়। তার বেশ কয়েকটি নমুনা দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে , এখানে, এখানে ও এখানে।
বেঙ্গল লেন্সের পর্যবেক্ষণে দেখা যায় এই আইডি ও পেইজগুলোর অধিকাংশ থেকেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষে প্রচারণা চালানো হয় এবং বিএনপির সমালোচনা করা হয়।
আক্রমণের প্রেক্ষাপট
রনির ওপর এই আক্রমণের প্রেক্ষাপট বুঝতে বেঙ্গল লেন্স তাঁর সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট, টকশোর ক্লিপ ও বিভিন্ন বক্তব্য বিশ্লেষণ করেছে। ফেসবুক পোস্ট, টকশো ও পডকাস্টে রনি জামায়াত-শিবির ও এনসিপিকে উদ্দেশ করে ‘নিরপেক্ষ ভণ্ড’, ‘গুপ্ত মুনাফিক’, ‘ভণ্ড জাশি’, ‘ফটকা’, ‘জানোয়ার’সহ নানা অভিধা ব্যবহার করেছেন।
একটি বক্তব্যে তিনি জামায়াতে ইসলামীকে গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান শত্রু বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের প্রধান শত্রু তো জামায়াতে ইসলাম। ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি, ইডিওসেন্ট্রিক পলিটিক্স; আমি ভালো বাকি সব খারাপ, এই মডেলের বিরুদ্ধেই তো হইছে। এটা আওয়ামী লীগ করলে খারাপ, আপনি করলে ভালো, এই সায়েন্স পাইলেন কোথায়? গণঅভ্যুত্থানের স্বার্থে প্রোপাগান্ডার রাজনীতি ঠেকাইতে হবে।’
সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহিদ হাদিকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর তার এক বক্তব্যে ‘হু ইজ হাদি’ বলে প্রশ্ন তোলেন। তিনি মন্তব্য করেন, কাজী নজরুল ইসলামের পাশে হাদিকে কবর দেওয়া উচিত হয়নি। এরপর হাদিকে নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা বক্তব্য আসতে থাকে।
এসব মন্তব্যকে রনি হাদির জন্য ‘অপমান’ বলে উল্লেখ করেন এবং এ জন্য জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করেন। রুফাইদা রহমান নামের একটি আইডি থেকে স্টার নিউজে রনির টকশোর একটি ক্লিপ শেয়ার করা হয়। সেটি পুনরায় শেয়ার করে রনি লেখেন, ‘হাদি বিজনেস এসোসিয়েশন হাদিকে অপমানিত করার জন্য দায়ী থাকবে... হাসিনা যেমন ভাসানীর হাতে গড়া লীগকে ধ্বংস করছে, জাশি তেমনি হাদিকে হাসির পাত্র করে তুলেছে।’
কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙার ঘটনা নিয়েও রনি মন্তব্য করেন।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙ্গার ইস্যুতে সালমান মুক্তাদিরকে ভিউখোর উল্লেখ করে গত ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে (সালমান মুক্তাদির) ‘জাতির পিতা’ বানাতে চাওয়া জামায়াত-শিবির ও আওয়ামী লীগকে ‘জানোয়ার’ বলেও অবহিত করেন তিনি। গত ২৪ জুলাই ফেসবুকে এক পোস্টের মাধ্যমে জামায়াত শিবির ও দলীয় বুদ্ধিজীবীদের হীনমন্য হিসেবে উল্লেখ করেন। আরেক ফেসবুক পোস্টে জাময়াত ও আওয়ামী লীগ মিলে মিডিয়াতে বিএনপিকে কোনঠাসা করে রেখেছে এবং বিএনপিতেও গুপ্ত হিসেবে জামায়াত আছে বলেও উল্লেখ করেন।
রনি যা বলছেন
কবে থেকে এবং কারা এ ধরনের আক্রমণ করছে, জানতে চাইলে রেজাউল করিম রনি বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, ‘এটা শুরু হয়েছে পাঁচ তারিখের পরে, যখন আমরা এখানে একটা আল্ট্রা ফ্যাসিস্ট বা সেক্যুলার রাইট উইং রাজনীতির বিরোধিতা শুরু করলাম। আমি যখন সরাসরি তাদের মুনাফিকের রাজনীতিটাকে যুক্তি, তথ্য ও তত্ত্বের মধ্য দিয়ে, আমার মতো করে বিশ্লেষণ করা শুরু করলাম, তখন তারা আমার ওপর সেই একই জিনিস প্রয়োগ শুরু করল। হাসিনা যেরকম তাদের ওপর পলিটিক্স অব হিউমিলিয়েশন চালাত, অপমান আর তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত, সেটাই।’
তিনি জানান, শুরুতে ফটোকার্ড বানানো হয়। এরপর তাঁর বক্তব্যের বিক্ষিপ্ত অংশ জোড়াতালি দিয়ে কাটপিস তৈরি করা হয়, যাতে তাঁর সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়। রনি বলেন, ‘মূলত তারা আমার ব্যাপারে একটা পারসেপশন তৈরি করতে চায় যে আমি খুব খারাপ, একটা দলের পক্ষ হয়ে কাজ করি। ওরা যেরকম ইয়ানতের টাকা খেয়ে চলে এবং বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীকে মাসোহারা দেয় বা নানাভাবে আর্থিক সুবিধা দিয়ে চালায়, ওরা মনে করে আমরা যারা ফ্রি থিংকার, স্বাধীনভাবে কথা বলার চেষ্টা করি, তারাও একইভাবে ফাংশন করি।’
রনির ভাষ্য, ‘তাদের প্রচেষ্টা হলো সমাজে আমার যে বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা আছে, সেটাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। আমার নামে বিভিন্ন ভুয়া পেইজও তারা খোলা শুরু করেছে। এটা তারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল লেভেলে, ম্যাসিভলি শুরু করেছে। যখন থেকে আমি তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্রিটিক্যাল পজিশন নিয়েছি, তখন থেকেই। এর আগে তারা এটা করেনি।’
তবে মানুষ শেষ পর্যন্ত বিষয়টি বুঝতে পারে বলে মনে করেন রনি। তিনি বলেন, ‘জনগণ প্রথম প্রথম একটু বিভ্রান্ত হইলেও শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারে। তারা যা প্রচার করে, প্র্যাকটিক্যালি যখন দেখে আমার অবস্থান সেরকম না, তখন জনগণ এমনিতেই বুঝতে পারে।’
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য অনলাইনে বর্ণবাদী আক্রমণের প্রবণতা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, ‘আমি এমন একজনকে কমেন্ট করলাম, যাকে চিনিও না। তাহলে তাকে সরি বলারও সুযোগ নেই। সামনাসামনি বললে আমার আচরণটা সেখানেই থেমে যেত। কিন্তু অনলাইনে করলে সেটা এমন অনেক মানুষের কাছে চলে যাচ্ছে, যারা আমাকে চেনে না, আমিও তাদের চিনি না। এটা যত ছড়াচ্ছে, সেলফ রেসপেক্ট ততটাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারও কাছে এটা ফান মনে হতে পারে, আবার অনেকের কাছে মেন্টাল ভায়োলেন্সও মনে হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কারও প্রতি আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে না বলে অনেক শোভন ভাষায় বলা যেতে পারে। একজনকে ক্রিটিসাইজ করা যেতেই পারে, তবে তা কনস্ট্রাকটিভ হওয়া উচিত। এটা কোনোভাবেই সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদা রওনক খান বলেন, ‘গণমাধ্যমই একমাত্র বড় মাধ্যম, সেই অবস্থা এখন আর নেই। হাতে মোবাইল আছে, যা ইচ্ছে লেখা যায়। আমার মতের সঙ্গে মিলল না, আমার দলের সঙ্গে মিলল না, তাই তাকে ধোলাই করে দাও, এমন একটা অবস্থা দাঁড়িয়েছে। সমাজ দিনদিন এগোচ্ছে, কিন্তু নৈতিকতা, শব্দচয়ন ও শ্রদ্ধাবোধের জায়গা কমে যাচ্ছে।’
তার মতে, অনেক সময় না পাওয়ার আক্ষেপ বা কারও মতো হতে না পারার হতাশা থেকেও বডি শেমিং ও বাজে মন্তব্য করা হয়। আবার অনেকে কোনো ইস্যু ছাড়াই হুটহাট মন্তব্য করেন।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. ইসা শাহেদী। বেঙ্গল লেন্সকে তিনি বলেন, ‘কাউকে বিকৃত নামে ডাকা কুরআনে সরাসরি নিষেধ রয়েছে, এটা হারাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে বিকৃত নামে হেয় করা উচিত নয়।’