মৃত মায়ের সরকারি পাওনার টাকা তুলতে ঘুষ দিতে হয়েছিল—বাবার এমন অভিজ্ঞতায় ক্ষুব্ধ হয়েছিল ১৭ বছরের শাহেদ শরীফ আহমেদ। নিজের পাসপোর্ট করাতেও ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা হয় তার। সরকারি সেবা পেতে ঘুষ কেন দিতে হবে—এই প্রশ্ন থেকেই অনলাইনে ঘুষের অভিযোগ জানানোর প্ল্যাটফর্ম ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরি করে ময়মনসিংহের এই কিশোর।
এই সংবাদ প্রকাশের পর এশিয়া পোস্টসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে আসে। ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে বলে জানায় শাহেদ শরীফ আহমেদ। এরপর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে ওঠে। আলোচনা-সমালোচনার ২০ দিনের মধ্যেই সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনকে বদলি করা হয়েছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অফিস আদেশে তাকে ময়মনসিংহের নান্দাইল সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-২) মোছাম্মদ রোখসানা হায়দার।
একই আদেশে নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছাকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়।
আদেশে বলা হয়, তারা বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্বভার ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের মধ্যে হস্তান্তর করবেন। অন্যথায় ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত বলে গণ্য হবেন। জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হয়েছে। এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন রয়েছে।
বক্তব্য জানতে চাইলে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন বলেন, আমাদের কার্যালয় নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমি আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে চেষ্টা করেছি। আদেশে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে বদলি করা হয়েছে। বদলির নির্দিষ্ট কোনো কারণ আছে কি না, আমার জানা নেই।
শাহেদের বাবা শরীফুল ইসলাম শামীম আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি পাওনা তুলতে গিয়ে ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতায় তিনি ক্ষুব্ধ হন। তার ভাষ্য, একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে ঘুষ দিতে হয়েছে। তবে বাকি টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে এবার তিনি আর ঘুষ দিতে রাজি নন।
শাহেদের মা আমিনা খাতুন ছিলেন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অসুস্থতাজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় তার চাকরির মেয়াদ ছিল ১৩ বছর।
ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বাবার সঙ্গে থাকে শাহেদ। ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়ছে সে। পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে ওয়েবসাইট তৈরির কাজ শিখেছে। সেই দক্ষতাই কাজে লাগিয়েছে ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরিতে।
পরিবারের ভাষ্য, আমিনা খাতুনের প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা ছিল প্রায় ৭ লাখ টাকা। সেই টাকা তুলতে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার টাকা এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। পরিবারের হিসাবে, সাত লাখ টাকা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।
পরিবারের দাবি, আমিনা খাতুনের কল্যাণ তহবিলের দুই লাখ টাকা এবং চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আরও ৮ লাখ টাকা পাওয়ার কথা। মোট ১০ লাখ টাকা পেতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কার্যালয়ের ব্যক্তিরা আবার ১ লাখ টাকা দাবি করছেন। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলেও জানানো হয়েছে।
এদিকে গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহ সদর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মুহাম্মদ মজিবুর রহমানকে শোকজ নোটিশ দেন সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তাদের জবাব দিতে বলা হয়।
গত ২১ আগস্ট ঘুষ ডট সাইট ওয়েবসাইটটি চালুর পর উদ্যোক্তাদের দাবি, ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমা পড়েছে প্রায় ২০ হাজার অভিযোগ। যেখানে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ ৫৫৭ কোটি টাকা। তবে সাইটে জমা পড়া প্রতিটি অভিযোগ সত্য—এমন দাবি করছে না উদ্যোক্তারা।
শাহেদের নিজেরও ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা রয়েছে। ও-লেভেল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য পাসপোর্ট করতে গিয়ে ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ করে সে। তার দাবি, এক হাজার ৫০০ টাকা দেওয়ার পর তিন ঘণ্টার মধ্যেই পাসপোর্টের কাজ এগিয়ে যায়। এরপর একটি ভারতীয় ওয়েবসাইট দেখে ঘুষের অভিযোগ জানানোর অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরির ধারণা পায় শাহেদ। নিজের কোডিং দক্ষতা কাজে লাগিয়ে মাত্র দুই ঘণ্টায় সাইটটির প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করে সে। পরে বন্ধু সাইফ কবিরের সহায়তায় ডোমেইন কেনা হয়। দুজন মিলে উদ্যোগটির কাজ এগিয়ে নেন।
শাহেদের ভাষ্য, তাদের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু বানানো নয়; বরং কোথায় কী ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠছে, তার একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করা। তার ধারণা, কোন দপ্তরে বেশি অভিযোগ, কোন ধরনের সেবায় বেশি ঘুষের দাবি এবং কী পরিমাণ অর্থ চাওয়া হচ্ছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা গেলে দুর্নীতির ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো শনাক্ত করা সম্ভব।
শাহেদের প্রত্যাশা, একদিন এমন সময় আসবে, যখন সরকারি কোনো সেবা পেতে কাউকে আলাদা করে টাকা দিতে হবে না। তার তৈরি ওয়েবসাইটে তখন হাজারো অভিযোগের তালিকা থাকবে না; বরং অভিযোগের সংখ্যা শূন্যের দিকে নামবে। তার চোখে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় সাফল্য।
উদ্যোক্তারা জানান, শাহেদ সাইটটির কারিগরি দিক সামলাচ্ছে, আর সাইফ দেখছে প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষয়গুলো। অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য চার সদস্যের একটি মডারেশন দলও রয়েছে। সাইটে জমা পড়া অভিযোগগুলো পর্যালোচনা ও স্ক্রিনিংয়ের পর ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে আইনি ঝুঁকি কমাতে অভিযোগকারীর নাম-পরিচয় কিংবা নির্দিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা থেকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে বদলি হওয়া ফজিলাতুন নেছাও আলোচিত নাম। তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। নান্দাইল উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে অর্থ আত্মসাৎ, বদলি-বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।
গত ২৪ জুন নান্দাইল উপজেলার শিক্ষকদের পক্ষে নগর কচুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুন্নাহার স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করা হয়। ফজিলাতুন নেছা ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন।
নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা থেকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় বদলি হওয়া ফজিলাতুন নেছার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, যেকোনো কর্মকর্তা সরকারি আদেশে যেকোনো সময় বদলি হতে পারেন। শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনকে বদলির পেছনে আলাদা কোনো কারণ আছে কি না, আমার জানা নেই।
তবে নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছা ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় বদলি হতে প্রধান কার্যালয়ে লিখিতভাবে আবেদন করেছিলেন বলে জানতে পেরেছি। জেলার কোনো শিক্ষা কর্মকর্তা বা কর্মচারী অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হওয়ার প্রমাণ মিললে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।