Image description

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলায় সম্প্রতি বিক্ষোভ মিছিল করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। সেই ঘটনায় মধ্যনগর উপজেলা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ৪৮ জনকে আসামি করে একটি মামলা করা হয়েছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এই মামলায় মধ্যনগর উপজেলার পার্শ্ববর্তী উপজেলা তাহিরপুরের এক সাংবাদিককেও আসামি করা হয়েছে!

 

 

গত রোববার (৩০ আগস্ট) মধ্যনগর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলাটি করেছেন উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শাহাজাহান মিয়া। এর আগে গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) মধ্যনগর উপজেলার বংশিকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের সীমান্ত সড়কে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করেন।

 

মামলায় আরটিভির তাহিরপুর উপজেলার ডিজিটাল প্রতিনিধি শওকত হাসান সৈকত ছাড়াও অন্য আসামিরা হলেন- তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ এখলাছুর রহমান তারা মিয়া, আজিজুল হক, এমরান হোসেন বিপক, রাজন মিয়া, রাজন চন্দ্র, রোমান মিয়া, সাজিদ মিয়া, সুজন মিয়া, জুয়েল আখঞ্জী, সুজিত, শাহিন মিয়া, ইমন মিয়া, জিয়া উদ্দিন, মহিবুর রহমান, নজির হোসেন, আল আমিন, মুশাহিদ হোসেন রানু, হাসান মিয়া, জাবের আহমদ, শামীম আহমদ, সেলিম ভূঁইয়া, নজরুল ইসলাম, শাকিল আহমদ লিজান, জুনায়েদ মিয়া, কাদের পাশা, আলী হোসেন, শাহজাহান চৌধুরী, জাহাঙ্গীর মিয়া, ইকবাল হোসেন, সোহাগ মিয়া, রাসেল, ফারুক মিয়া, কবির মিয়া, সাজ্জাত, শাখাওয়াত হোসেন শিপন, আঙ্গুর মিয়া, এমরুল হাসান, মিয়া হোসেন, লিমন মিয়া, লিক্সন মিয়া, জাহেদ মিয়া, জোটন রায় জনি, আব্দুল আমিন, জিলানী, জাহেদ মিয়া, রাসেল আহমেদ, কবির মিয়া ও সজিব।

 

সাংবাদিক শওকত হাসান সৈকত সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের রতনশ্রী গ্রামের মৃত আইয়ুব আলীর ছেলে।

 
 

 

এদিকে মিছিলের বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও সেখানে সাংবাদিক সৈকতের উপস্থিতি দেখা যায়নি। তারপরও এ ধরনের মামলায় সাংবাদিক শওকত হাসান সৈকতকে আসামি করায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, মামলার সব আসামি আওয়ামী লীগের। কিন্তু সেখানে পাশের উপজেলার একজন সাংবাদিকের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া উদ্দেশ্যমূলক।

 

 

সাংবাদিকদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে সৈকতের কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলে তাকে মামলায় আসামি করা অনাকাঙ্ক্ষিত। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করার দাবি জানিয়েছেন।

 

ঢাকা পোস্টের সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি তামিম রায়হান বলেন, কারা মিছিল করেছে, সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। ওই মিছিলে কোথাও সাংবাদিক সৈকতকে দেখা যায়নি। এরপরও তাকে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে আসামি করা হয়েছে। মামলার বিষয়ে বাদীকে ফোন করেছিলাম তিনি সঠিক জবাব দিতে পারেননি। তাকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এমনটি করা হয়ে থাকলে আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

 

সুনামগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, সৈকত আপাদমস্তক একজন সাংবাদিক। ঘটনার দিন সে নিজেও সংবাদ করেছে এবং সে দিন তাহিরপুরেই ছিল। তাহিরপুরে থেকে কীভাবে মধ্যনগরের মিছিলের মামলার আসামি হয়, সেটি বোধগম্য নয়। আমরা এ ঘটনার নিন্দা জানাই এবং তাকে যাতে কোনো ধরনের হয়রানি করা না হয়, সে দাবি জানাচ্ছি।

 

মামলার বিষয়ে সাংবাদিক শওকত হাসান সৈকত বলেন, ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। আমি ঘটনাস্থলেও ছিলাম না। অন্য থানার একটি ঘটনায় আমাকে আসামি করা হয়েছে। আমাকে আসামি করার কোনো কারণ আমি বুঝে উঠতে পারছি না।

 

তিনি আরও বলেন, উপজেলায় সক্রিয়ভাবে সাংবাদিকতা করার কারণে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে আমাকে নিয়মিত সংবাদ করতে হয়। এ কারণে হয়তো আমার উপজেলার বিএনপির কিছু নেতার কাছে আমি বিরক্তির কারণ হয়ে থাকতে পারি। আমাকে হয়রানি ও জব্দ করার উদ্দেশ্যেই হয়তো এমন একটি মামলায় আসামি করা হয়েছে।

 

এদিকে মামলায় সাংবাদিক, রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ব্যক্তি ও মিছিলে সম্পৃক্ত নন, এমন ব্যক্তিদের আসামি করার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন তাহিরপুর উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক হাফিজ উদ্দিন। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেন, মিছিলে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার ও কারাবরণের ঝুঁকি জেনেই মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু মামলায় এমন কিছু লোককে আসামি করা হয়েছে, যাদের কেউ রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়, কেউ সাংবাদিক, আবার কেউ পবিত্র মক্কায় হজ পালনে ছিলেন কিংবা মিছিলের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত ছিলেন না। গ্রামীণ বিরোধের কারণে কেউ কেউ মামলায় আসামি হয়ে থাকতে পারেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

 

তবে সাংবাদিককে মামলায় আসামি করার বিষয়ে মামলার বাদী শাহাজাহান মিয়া বলেন, আমি সৈকত নামের কোনো সাংবাদিককে চিনি না। তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা সমন্বয় করে আসামিদের তালিকা থানায় দিয়েছেন। এতে আমি বাদী হয়েছি।

 

সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির স্বাক্ষরক্ষমতা প্রাপ্ত সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল হক বলেন, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। পুলিশ তদন্ত করবে। তদন্তে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেবে, আর সম্পৃক্ততা না পেলে নাম বাদ দেওয়া হবে।

 

মধ্যনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম সাহাবুদ্দিন শাহীন বলেন, স্থানীয় বিএনপি নেতা বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখব। সাংবাদিক শওকত হাসানের সম্পৃক্ততা না থাকলে তদন্ত শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তাকে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে।

 

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার বলেন, মামলার বাদী পুলিশ নয়, অন্য একজন। পুলিশ মামলাটি তদন্ত করবে। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়া গেলে পরবর্তীতে তার নাম বাদ দেওয়া হবে। নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হবে না।