ছয় বছর প্রবাসে থেকে কষ্টার্জিত টাকায় পরিবারের জন্য কেনাকাটা করেছিলেন সৌদি প্রবাসী মনির হোসেন। দেশে ফেরার আনন্দে সঙ্গে এনেছিলেন স্বজনদের জন্য প্রয়োজনীয় ও পছন্দের নানা জিনিস। বিমানবন্দরে নামার পর ইমিগ্রেশন শেষ করে অপেক্ষা করছিলেন লাগেজের জন্য। কিন্তু বেল্টে আসা লাগেজ হাতে নিয়ে সেই আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় হতাশায়। দেখা যায় ব্যাগ কাটা, চেইন খোলা, মালামাল উধাও। মনিরের মতো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে অনেক প্রবাসীকে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ নিয়ে জমা পড়া অভিযোগের সংখ্যা বলছে, সমস্যাটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ বিমানের তথ্যেই এর ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। শুধু ২০২৫ সালেই লাগেজসংক্রান্ত অভিযোগ জমা পড়ে ১ হাজার ৩৮৭টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৭২টি নিষ্পত্তির দাবি করা হলেও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৫টি ক্ষেত্রে। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক অভিযোগ নিষ্পত্তি দেখানো হলেও ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন হাতেগোনা কয়েকজন। ২০২৬ সালে প্রথম কয়েক মাসে জমা পড়েছে ৯২২টি অভিযোগ। এর মধ্যে ৯১৪টি নিষ্পত্তির দাবি করা হলেও এসব অভিযোগের প্রকৃত ধরন, তদন্তের ফল এবং কতজন যাত্রী বাস্তবে প্রতিকার পেয়েছেন-তা নিয়ে রয়ে গেছে বড় প্রশ্ন।
মনিরের ঘটনা তাই নিছক একজন যাত্রীর দুর্ভোগের গল্প নয়। এটি শাহজালালের লাগেজ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল নজরদারি ও জবাবদিহির সংকটের একটি প্রতিচ্ছবি। বিমানবন্দরে লাগেজ খোয়ানোর বিষয় এখন খতিয়ে দেখছে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত স্বাধীন তদন্ত কমিটি। গত ৩০ আগস্ট বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তরে কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে লাগেজ ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপ সরেজমিন পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামীকাল রোববার সকাল ১০টায় কমিটির সদস্যরা বিমানবন্দরে গিয়ে লাগেজ গ্রহণ, বাছাই, পরিবহণ, লোডিং-আনলোডিং ও ডেলিভারি প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, লাগেজ চুরি, ক্ষতিসাধন, হারিয়ে যাওয়া এবং যাত্রী হয়রানির ধারাবাহিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন (রাসেল) রিট করেন। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বেবিচক ও সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না-তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। এরপর পিটিশনকারীর পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন আবেদন দাখিল করা হয়। ৯ জুলাই আদালত বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ১৫ দিনের মধ্যে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেন। সেই নির্দেশনার আলোকে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ১০ আগস্ট ১১ সদস্যের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির আহ্বায়ক ও বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমানের সভাপতিত্বে ৩০ আগস্ট দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, কমিটিকে তদন্ত শেষে দায় নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক সুপারিশসহ প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে হবে।
তদন্ত কমিটির বৈঠকে উঠে এসেছে গুরুতর অভিযোগ। লাগেজ ছুড়ে ফেলার পাশাপাশি সেগুলো কৌশলে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতার বাইরে নিয়ে যায় অসাধু কর্মীরা। পরে সেখান থেকে হাতিয়ে নেয় যাত্রীর মূল্যবান জিনিসপত্র। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের কর্মকাণ্ড নজরদারিতে বডি ক্যামেরা চালু করা হলেও অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে ক্যামেরা থাকলেও তা নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা বা যথাযথভাবে ফুটেজ সংরক্ষণ হচ্ছে কিনা সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। এ কারণে কমিটি বডি ক্যামেরা ব্যবহারের আগের ও পরের তুলনামূলক পরিসংখ্যানও চেয়েছে। বডি ক্যামেরা চালুর পর অনিয়মের অভিযোগ কমেছে কিনা, তা তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে যাচাই করতে চায় কমিটি।
তদন্ত কমিটির সদস্য কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর যুগান্তরকে বলেন, যাত্রী হয়রানির মতো বিষয় শুধু মিটিং করে তদন্ত করা সম্ভব নয়। সরেজমিন পুরো প্রক্রিয়াটি দেখতে হবে। কোথায় লাগেজ যাচ্ছে, কারা হ্যান্ডেল করছে এবং কোন পর্যায়ে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তা সরাসরি না দেখলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযোগের ফাইল বন্ধ করাই সমাধান নয়। অভিযোগের ধরন, তদন্তের ফল, দায় নির্ধারণ, ক্ষতির পরিমাণ এবং যাত্রীকে দেওয়া প্রতিকারের তথ্য প্রকাশ করা না হলে প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যায়।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, অভিযোগ নিষ্পত্তি আর যাত্রীকে প্রকৃত প্রতিকার দেওয়া এক বিষয় নয়। একটি অভিযোগ ফাইল বন্ধ করে দিলেই সেটিকে নিষ্পত্তি বলা যায় না। লাগেজ চুরি বা ক্ষতির অভিযোগে কী ঘটেছে, কার দায় ছিল, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রী কী প্রতিকার পেয়েছেন-এসব তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। হাজার হাজার অভিযোগের বিপরীতে হাতেগোনা কয়েকটি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলে পুরো প্রক্রিয়ার জবাবদিহি নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
তদন্ত কমিটির নথিতে ঝুঁকিপূর্ণ মালামাল নিয়েও অভিযোগের হিসাব এসেছে। এ ধরনের ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৩টি নিষ্পত্তি এবং আটটি ক্ষেত্রে পেমেন্ট বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার তথ্য জানানো হয়েছে। তবে এই অভিযোগগুলোর ধরন, ক্ষতির পরিমাণ এবং কীভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে-এসব তথ্যও আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছে কমিটি। এছাড়া অনিয়ম ও যাত্রীর মূল্যবান লাগেজ ছুড়ে ফেলার মতো ঘটনার সত্যতা পেয়ে ইতোমধ্যে ইউএস-বাংলার ২ জন এবং বিমান বাংলাদেশের ১ জন কর্মীসহ ৩ জনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে উঠে এসেছে কার্যবিবরণীতে। বিগত বছরগুলোতে কতজনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়েছে তদন্ত কমিটি।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের প্রতিটি ধাপে সিসিটিভি নজরদারি থাকার উদ্দেশ্যই হচ্ছে-কোন কর্মী কখন কোন লাগেজ কোথায় নিয়েছেন, সেটির গতিপথ শনাক্ত করা। সেই ব্যবস্থার বাইরে লাগেজ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলে পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।