গত সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে ‘‘দূরবীনে 'অ'-দূরদর্শী-১’’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয় দৈনিক মানবজমিনের ওয়েবসাইটে। কলামটিতে লেখকের নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘শেখ তাপস’। তবে লেখকের আর কোনো পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।
শেখ তাপস লেখাটিতে আওয়ামী লীগকে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ওপর গড়ে ওঠা গণমানুষের দল হিসেবে আখ্যায়িত করার পাশাপাশি শেখ হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত ৩টি জাতীয় নির্বাচনের সমালোচনা করেছেন।
তার মতে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলো গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে 'অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য' হয়নি। এছাড়া আওয়ামীলীগের আজকের দুরাবস্থার জন্য তৃণমূলের মতামত অবহেলাকে দায়ি করেছেন। তিনি তার লেখায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তনকে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফসল হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। লেখাটি শেষ হয়েছে “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান দিয়ে।
স্বভাবতই রাজনৈতিক অঙ্গনে লেখকের পরিচয় নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই এটিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের লেখা বলে চিহ্নিত করেছেন।
পলিসি পেপার নামক একটি অনলাইন পোর্টালে “ফুপুর সমালোচনায় তাপস, আয়নায় নিজের মুখ দেখলেন না” শিরোনামে ওই লেখাটি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে লেখাটি শেখ ফজলে নূর তাপসের লেখা হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে।
পলিসি পেপার নামের পোর্টালটি পরিচালনা করেন মানবজমিনের সাবেক চিফ নিউজ এডিটর সাজিদ হক।
তবে বেঙ্গল লেন্সের পক্ষ থেকে দৈনিক মানবজমিনের কাছে লেখকের পরিচয় জানতে চাইলে ‘লেখাটি আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপসের না’ বলে দাবি করেছে দৈনিকটি।
লেখাটি যদি আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপসের হয়ে থাকে তাহলে গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায় এই প্রথম শেখ পরিবার ও আওয়ামী লীগের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রকাশ্যে আওয়ামী আমলের ৩টি বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা মুখর হলেন। যদিও শেখ তাপস নিজেও ২০১৪ ও ২০১৮ এর নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া ২০২০ সালের যে নির্বাচনে তাপস ঢাকা সিটি দক্ষিণের মেয়র নির্বাচিত হন সেটিও অবাধ নিরপেক্ষ ছিলো না।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই সমালোচনার উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া লেখা প্রকাশের জন্য মামবজমিনকেই বা কেন বেছে নিলেন তিনি, এনিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
কারণ লেখাটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে যখন শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার ঘোষণা, দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন এবং সেটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।
মানবজমিন যা জানিয়েছে
প্রশ্নের জবাবে মানবজমিনের নগর সম্পাদক লুৎফর রহমান বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, ‘‘আপনি আওয়ামী লীগের যেই তাপসের কথা বলছেন তার নাম শেখ ফজলে নূর তাপস। আর আমাদের প্রকাশিত লেখাটিতে লেখকের নাম শেখ তাপস। দু’জন এক ব্যক্তি নয়।”
তবে সেই লেখকের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “উনি ধারাবাহিকভাবে আরও লিখবেন। সেগুলো পড়লে বুঝতে পারবেন ভদ্রলোক কে বা কী।’’
‘‘আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও তাদেরকে নিয়ে লেখা যাবে না এমন তো না। জয় বাংলা তো বাংলাদেশের স্লোগান। লেখাতে পুরোটাই লেখকের বক্তব্য। আমরা গণমাধ্যম হিসেবে সবার মতামতই প্রকাশ করি। উনি আরও কয়েকটি পর্বে লিখবেন, এরপর লেখক নিজেই হয়ত তার পরিচয় দিবেন।’’ যুক্ত করেন লুৎফর রহমান।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার মানবজমিনের বার্তা সম্পাদক কাজল ঘোষের সঙ্গে কথা হয় বেঙ্গল লেন্সের। প্রকাশিত লেখাটি শেখ ফজলে নূর তাপসের কি-না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা একটু আমাদের এডিটোরিয়াল টিমের সাথে কথা বলে দেখতে হবে। আপনি আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে পরিচয়সহ কি জানতে চান লিখে দিন, আমি খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছি।”
তবে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বেঙ্গল লেন্সের মেসেজের কোনো উত্তর দেননি তিনি। এছাড়া একাধিকবার কল দেওয়া হলেও এরপর আর কল রিসিভ করেননি তিনি।
বেশ কয়েকবার ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে চেষ্টা করেও মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
কী লিখেছেন তাপস?
তাপস তার পোস্টে লিখেছেন, ‘‘আওয়ামী লীগ এর অন্যতম মূলনীতি হলো 'গণতন্ত্র'। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল আদর্শও 'গণতন্ত্র'। আওয়ামী লীগ এর গঠনতন্ত্রের '২(ঘ)' বিধি অনুযায়ী সংগঠনের 'লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য' হলো — "মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়িয়া তোলা"।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে, বিশেষত আশির দশক হতে শুরু করে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এদেশের মানুষকে সাথে নিয়ে আন্দোলন, সংগ্রাম ও অবর্ণনীয় ত্যাগ স্বীকার করেছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আওয়ামী লীগ অনন্য, অসাধারণ এবং অসামান্য অবদান রেখেছে।
অগণতান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন 'নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার' ব্যবস্থা প্রবর্তন আওয়ামী লীগেরই আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ সাংবিধানিক উপায়ে, শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে— যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ও একমাত্র ঘটনা।
কিন্তু, সে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি। শুরু হয় আওয়ামী লীগকে তাঁর মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত করার প্রক্রিয়া। আওয়ামী লীগ সেই সময়ে 'পূর্ণমাত্রায় প্রয়োজনীয় দূরদর্শিতা' দেখাতে পেরেছিলো কিনা তা আজকের এই সময়ে বিবেচনার দাবি রাখে! এই প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে, দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা ব্যবস্থা পুনরায় প্রবর্তন করা হয়। ফলে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলো গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে 'অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য' হয়নি। অনেকেই নির্বাচনি রায় (vote) ব্যতীত বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আওয়ামী লীগ 'আদর্শ বিবর্জিত' কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা জনবিচ্ছিন্ন কোনো 'গোষ্ঠী' নয়। আওয়ামী লীগ এদেশের গণমানুষের দল। এই দলে দীর্ঘ সময় ধরে (বিশেষত ২০১১-২০২৪ সময়ে) সকল জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তৃণমূলের মতামতকে 'সুকৌশলে' অবজ্ঞা করা হয়েছে কিনা, সেটা ভাববার অবকাশ আছে বৈকি! কিংবা কোনো পর্যায়ে কোনো ধরনের আলোচনা, যুক্তি, বিতর্ক, মতামত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তৃণমূলকে অবহেলা করার খেসারত আজ দলকে দিতে হচ্ছে কিনা? অথবা তৃণমূলের ভাবনাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়াটা কি আওয়ামী লীগকে গণতান্ত্রিক আদর্শ হতে বিচ্যুত করেছিল কিনা, তা-ও পর্যালোচনার দাবি রাখে!
ইতিহাস শিক্ষা দেয় যে, আদর্শের প্রতি বলিষ্ঠতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হলে সেই রাজনৈতিক দল ক্রমান্বয়ে জনবিচ্ছিন্ন হতে থাকে। তাই, অতীত কৃতকর্মের ভুল-ত্রুটি পর্যালোচনা করে, গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে জনগণের কাছে ফিরে যাওয়াই হবে আওয়ামী লীগ এর জন্য অত্যাবশ্যকীয় পদক্ষেপ।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন আগামী নভেম্বর মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আওয়ামী লীগ এর জন্য উক্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ হবে জনগণকে আরো কাছে টানার, জনগণের সাথে মরচে ধরা সম্পর্ককে টেকসই রাজনৈতিক সম্পর্কে রূপান্তরিত করার এক সুবর্ণ সুযোগ। এক্ষেত্রে, পূর্বের সকল ঐতিহাসিক ক্রান্তিলগ্নের মতো, তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাই হবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর পূণর্জাগরণের পথপ্রদর্শক- নতুন পথের দিশারী। এরই মাধ্যমে দেশের 'ঘরে-ঘরে' আওয়ামী লীগ পুনরায় আদর্শিক রাজনীতির চূড়ান্ত ভরসাস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’’
উল্লেখ্য, শেখ ফজলে নূর তাপস হলেন শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে (সম্পর্কে ভাতিজা)। তাপসের বাবা শেখ ফজলুল হক মনি ছিলেন শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই। অর্থাৎ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে।
শেখ তাপস ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রথমবারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে বিতর্কিত ২০১৪ সালের দশম ও ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১০ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন।
২০১৯ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী হিসেবে তাকে মনোনয়ন দেওয়ার পর তিনি জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র হন তাপস। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় হাসিনা সরকারের পতনের দুই দিন আগেই ৩ আগস্ট সিঙ্গাপুরে পালিয়ে যান এই আ.লীগ নেতা।
প্রসঙ্গত, দিল্লি-ঢাকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমীকরণ বদলাচ্ছে। গত ৫ আগস্ট দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে (FCC) শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন এবং দেশে ফেরার ঘোষণা দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি করে। ঢাকার পক্ষ থেকে এর তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।
এরই প্রেক্ষিতে, গত ২৯ আগস্ট একই ফোরামে আওয়ামী লীগের সেমিনার আয়োজন করতে না দেওয়া এবং দিল্লি পুলিশের অনুমতি প্রত্যাখ্যানের ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, পূর্বের ঘটনাটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের যে পতন ঘটিয়েছিল, তা সামাল দিতেই ভারত এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও একে একটি 'ইতিবাচক পদক্ষেপ' হিসেবে দেখছে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, নতুন ঢাকার সঙ্গে কৌশলগত ও সুষম সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে ভারত এখন আর বাড়তি কোনো কূটনৈতিক ঝুঁকি বা বিতর্ক তৈরি করতে চায় না।