Image description

২০০৫ সালের ২৯ মে শাহবাগ এলাকায় বাসচাপায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাম্মী আক্তার নিহতের প্রতিবাদে তৎকালীন উপাচার্য ও প্রক্টরকে অবরুদ্ধ করে রাখেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। সেসময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সাথে বর্তমান প্রক্টর ইসরাফিল রতন, চারুকলা অনুষদের বর্তমান ডিন (ভারপ্রাপ্ত) ও সিরামিক বিভাগের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম শেখ, সিরামিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক দেবাশীষ পাল, ভাষ্কর্য বিভাগের অধ্যাপক আবু আবেদিন মোহাম্মদ কাওসার হাসান টগর- এই ৪ শিক্ষক আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকেন একজন প্রক্টর। সেই দায়িত্বে বর্তমানে আছেন মো. ইসরাফিল প্রাং (ইসরাফিল রতন)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাররুলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের চারুকলা অনুষদের আহবায়ক।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে একজন প্রক্টরের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রক্টরের মূল দায়িত্ব হলো আবাসিক হলের বাইরের মূল ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সার্বিক শৃঙ্খলা ও সদাচরণ নিশ্চিত করা।

 

তবে বর্তমানে যিনি প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তার বিরুদ্ধে রয়েছে অতীতে শিক্ষার্থীদের উপর হামলার অভিযোগ। সম্প্রতি নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলে প্রবেশের সময়সীমা নিয়ে প্রক্টরের করা একটি মন্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর বিতর্ক সৃষ্টি। সেই বিতর্কের জেরে নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় সরকারের আমলে শিক্ষার্থীদের উপর তার হামলা করার অভিযোগটি।

 

কী ছিল ঘটনাটি

ঘটনাটি নিয়ে পুরোনো পত্রিকার সংখ্যা বিশ্লেষণ করে বেঙ্গল লেন্স পেয়েছে যে, ২০০৫ সালের ২৮ মে শাহবাগ এলাকায় বাসচাপায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাম্মী আক্তার নিহত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে বিচার চেয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ২৯ মে চারুকলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ও প্রক্টরকে অবরুদ্ধ করে রাখেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

 

তখন উপাচার্যকে উদ্ধার করতে এসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। সেসময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সাথে বর্তমান প্রক্টর ইসরাফিল রতন, চারুকলা অনুষদের বর্তমান ডিন (ভারপ্রাপ্ত) ও সিরামিক বিভাগের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম শেখ, সিরামিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক দেবাশীষ পাল, ভাষ্কর্য বিভাগের অধ্যাপক আবু আবেদিন মোহাম্মদ কাওসার হাসান টগর এই চারজন চারুকলা অনুষদের শিক্ষক আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।

 

পুরোনো পত্রিকার প্রতিবেদন যাচাই করে দেখা যায়, যুগান্তর-এর ৩০ মে ২০০৫ সংখ্যায় ‘শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদলের হামলা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ছাত্রদলের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী শিক্ষকরাও ওই হামলায় অংশ নেন।

 

প্রতিবেদনের শেষাংশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলনের একটি অংশ তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, "কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নির্যাতনবিরোধী শিক্ষার্থীদের ব্যানারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করে। এ সময় তারা জানায়, চারুকলার ছাত্রছাত্রীরা উপাচার্য ও প্রক্টরকে অবরুদ্ধ করে দাবি আদায়ের আন্দোলন করছিলেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাদের নেতৃত্বে শতাধিক ক্যাডার হামলা চালায়। এতে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সঙ্গে চারুকলার জাতীয়তাবাদী কয়েকজন শিক্ষকও হামলায় যোগ দেন। তারা হলেন— কাওসার হাসান টগর, দেবাশিস পাল, ইসরাফিল প্রামাণিক রতন ও আজহারুল ইসলাম শেখ।

 

ওই সময়ের প্রথম আলোর ৩০ মে সংখ্যার প্রথম পাতায় ‘চারুকলায় ক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদলের হামলা’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে একটি ছবি ব্যবহার করা হয়। ছবিটিতে উপাচার্যের সামনে ইসরাফিল রতন ও বর্তমানে চারুকলা অনুষদের ডিন আজহারুল ইসলাম শেখকে দেখা যায়। প্রথম আলোর পরের দিনের ৩১ মে ২০০৫ এর সংখ্যায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের দ্বিতীয় প্যারায় বলা হয়, "এসব হামলার প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল, ঘেরাও, সংহতি সমাবেশ, প্রতিবাদী গান ও কুশপুত্তলিকা দাহ কর্মসূচি পালন করেছে। এসব কর্মসূচি থেকে প্রক্টর ও উপাচার্যের পদত্যাগ, চারুকলায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী ছাত্রদল ক্যাডার, চারুকলার চার শিক্ষকের বিচারের দাবি উঠেছে।"

 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, "চারুকলার চার শিক্ষক দেবাশীস পাল, কওসার হাসান টগর, আজহারুল ইসলাম চঞ্চল ও ইসরাফিল প্রাং রতন শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় অংশ নেওয়ায় তাদের ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন নির্যাতনবিরোধী শিক্ষার্থীরা।"

 

দ্য ডেইলি স্টারের ৩০ মে ২০০৫ সংখ্যায় ‘JCD men maul DU students’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বলা হয়, ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সাথে এই তাণ্ডবে অংশ নেই ছাত্রদলের নেতাকর্মী থেকে শিক্ষক হওয়া চার চারুকলার শিক্ষক। ওই সংবাদের ভিতরে বলা হয়েছে, "The teachers who teamed up with the JCD men in the assault are Ishrafil Pramanik Ratan of graphics design department, Azharul Islam Sheikh Chanchal and Debasish Pal of ceramics department and Abu Abedin Mohammad Kawsar Hasan Togor of sculpture department, according to eyewitnesses."

 

দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার ৩১ মে ২০২৫ এর সংখ্যায় 'শিক্ষক না ক্যাডার' শিরোনামের সংবাদে বলা হয়েছে, "রতন, টগর, চঞ্চল, দেবাশীষ এই চারটি নাম এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার কাছে পরিচিত। চারজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের নবীন শিক্ষক। কাগজে কলমে শিক্ষক হলেও অতীত ইতিহাসের কারণে চারজনই শিক্ষার্থীদের কাছে এখনও ক্যাডার হিসাবে পরিচিত।" ঐ সংবাদে আরও বলা হয়েছে "নির্যাতনবিরোধী ছাত্রছাত্রী এই চারজনকে শিক্ষকরূপী নির্যাতক হিসাবে উল্লেখ করে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে তাদের ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কারের দাবি জানানো হয়েছে। অন্য শিক্ষকরা বলেছেন, যারা ছাত্রীদের ওপর হামলা করতে পারে তারা শিক্ষক নামের কলঙ্ক। ছাত্র-শিক্ষকদের অভিমত, যে শিক্ষক ছাত্রীদের ওপর হামলা করতে পারে তাদের শিক্ষকতায় থাকার নৈতিক অধিকার নেই।"

 

নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে মন্তব্যকে ঘিরেও বিতর্ক

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের রাতে হলে প্রবেশের সময়সীমা নিয়ে প্রক্টর মো. ইসরাফিল প্রাংয়ের (রতন) একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রক্টর প্রকাশিত ওই মন্তব্য অস্বীকার করে প্রতিবাদলিপি দিলেও সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা স্ট্রিম’ নিজেদের প্রতিবেদনে অটল রয়েছে। এর মধ্যে প্রক্টরের সঙ্গে প্রতিবেদকের ফোনালাপের একটি কললগ পাওয়া গেলেও কথোপকথনের অডিও রেকর্ড এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

 

গত ৩০ আগস্ট রাতে ঢাকা স্ট্রিমে ‘Where women’s safety means being locked out: DU students fight curfew’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে প্রক্টরের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়, রাতে মেয়েদের বাইরে থাকা স্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে প্রক্টর বলেন, "At what time at night do your mother and sister return home? No female in my household stays outdoors after 11 at night." প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পুরুষ শিক্ষার্থীরা রাতে শুধু হাঁটাচলা করেন, তখন মেয়েরা কী করেন—প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে কোনো মন্তব্য করতে চাননি প্রক্টর।

 

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এর প্রতিবাদে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়। এছাড়া নারী শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশের সময়সীমা বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনরত প্ল্যাটফর্ম ‘অবরোধবাসিনী’ ৩১ আগস্ট বিকেলে সিনেট ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে।

 

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৩১ আগস্ট বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ঢাবি প্রক্টরের দপ্তর থেকে ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক বরাবর একটি প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়। এতে প্রক্টর দাবি করেন, প্রতিবেদনে তাঁর নাম ব্যবহার করে যেসব বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অসত্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভ্রান্তিকর। গত এক সপ্তাহে এ বিষয়ে কোনো সংবাদকর্মী বা গণমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর কোনো কথা হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন এবং জনমনে বিভ্রান্তি নিরসনে প্রতিবাদলিপিটি হুবহু প্রকাশের অনুরোধ জানান।

 

এরপর ৩১ আগস্ট রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে প্রক্টরের প্রতিবাদের একটি জবাব প্রকাশ করে ঢাকা স্ট্রিম, যা ১ সেপ্টেম্বর ভোরে আপডেট করা হয়। সেখানে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, গত ২৩ আগস্ট রাত ৮টা ৫২ মিনিটে তাদের এক প্রতিবেদক প্রক্টরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। স্পিকারে হওয়া ১২ মিনিট ১৯ সেকেন্ডের ওই কথোপকথন নিউজরুমে উপস্থিত একাধিক সাংবাদিক শুনেছেন বলে তারা দাবি করে। সংবাদমাধ্যমটি জবাবে আরও উল্লেখ করে যে, প্রতিবাদলিপির বিষয়ে জেনে প্রতিবেদক পুনরায় ফোন করে তাদের কথোপকথনের কথা তাকে মনে করিয়ে দিলে প্রক্টর কল কেটে দেন এবং পরে আরও পাঁচবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। নিজেদের প্রকাশিত সংবাদের সত্যতার বিষয়ে তারা অটল রয়েছে বলেও জানায় ঢাকা স্ট্রিম।

 

বিষয়টি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বেঙ্গল লেন্স। ওই সাংবাদিক জানান, অফিসের অনুমতি পেলে প্রক্টরের সঙ্গে কথোপকথনের অডিও রেকর্ডটি তিনি সরবরাহ করতে পারবেন। তবে প্রক্টরের সঙ্গে যোগাযোগের দাবির সমর্থনে তিনি একটি কললগের স্ক্রিনশট দেন। বেঙ্গল লেন্স যাচাই করে দেখেছে, স্ক্রিনশটে থাকা নম্বরটি ঢাবি প্রক্টরের। কললগে ২৩ আগস্ট রাত ৮টা ৫২ মিনিটে প্রক্টরের সঙ্গে ১২ মিনিট ৯ সেকেন্ডের একটি ফোনালাপের প্রমাণ পাওয়া গেছে।