আফ্রিকার গিনি-বিসাউয়ের বোয়ে ন্যাশনাল পার্কের সাভানা ও বনভূমির পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়তে পারে অদ্ভুত এক দৃশ্য। কোনো কোনো গাছের গায়ে অসংখ্য দাগ, আর গোড়ার চারপাশে পড়ে আছে অনেক পাথর। আশপাশে কোনো শিম্পাঞ্জি নেই। তবু এই দৃশ্যই বলে দিতে পারে, সেখানে শিম্পাঞ্জিরা নিয়মিত আসে।
পশ্চিমাঞ্চলীয় কিছু শিম্পাঞ্জি নির্দিষ্ট গাছে পাথর ছোড়ে। শুধু একবার নয়, বারবার একই গাছের কাছে ফিরে আসে তারা। ফলে সময়ের সঙ্গে গাছের গোড়ায় পাথর জমতে থাকে, গাছের গায়েও তৈরি হয় দাগ। কেন তারা এমন করে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এর সঙ্গে শিম্পাঞ্জিদের যোগাযোগের কোনো বিশেষ ধরন জড়িত থাকতে পারে।
নির্দিষ্ট গাছেই পাথর ছোড়ে
এই আচরণ সাধারণত পূর্ণবয়স্ক পুরুষ শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে দেখা যায়। তারা নির্দিষ্ট কিছু গাছ বেছে নেয় এবং সেগুলোর দিকে পাথর ছোড়ে। পাথর ছোড়ার সময় তারা জোরে জোরে ডাকতেও থাকে। এই ডাককে বলা হয় ‘প্যান্ট হুট’। দূর থেকেও শোনা যায় এমন এই ডাক শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে যোগাযোগের একটি উপায়।
কখনো পাথর ছোড়ার পাশাপাশি তারা গাছের গুঁড়িতে হাত ও পা দিয়ে জোরে আঘাত করে। এই আচরণকে বলা হয় ‘বাট্রেস ড্রামিং’। ফলে পাথর ছোড়া, ডাকাডাকি এবং গাছে আঘাত করা মিলিয়ে সেখানে এক ধরনের বিশেষ আচরণ দেখা যায়।
গবেষকদের ধারণা, এসব আচরণের মাধ্যমে শিম্পাঞ্জিরা একে অপরকে কোনো বার্তা দিতে পারে। এমনও হতে পারে, নির্দিষ্ট গাছ বা জায়গাগুলোর তাদের কাছে বিশেষ কোনো অর্থ আছে। এমনও হতে পারে, এর কোনো প্রতীকী অর্থ রয়েছে এবং এসব জায়গা শিম্পাঞ্জিদের বিচরণক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে। তবে তারা আসলে কী বোঝাতে চায়, সেটি এখনো জানা যায়নি। এখন পর্যন্ত পশ্চিম আফ্রিকার মাত্র চারটি শিম্পাঞ্জি দলের মধ্যে এমন আচরণ দেখা গেছে।
বিজ্ঞানীরা এটিকে শিম্পাঞ্জিদের এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক আচরণ’ বলে মনে করছেন। কারণ, সব শিম্পাঞ্জি এমন করে না। কোনো জায়গায় গাছ ও পাথর থাকলেই সেখানে এই আচরণ দেখা যায় না। অর্থাৎ পরিবেশের চেয়ে শিম্পাঞ্জিদের নিজেদের শেখা ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া আচরণের ভূমিকা এখানে বেশি হতে পারে।
ক্যামেরায় ধরা হচ্ছে শিম্পাঞ্জিদের আচরণ
এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা গিনি-বিসাউয়ের বোয়ে অঞ্চলে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন। তাঁদের ঘাঁটি ছিল বেলি নামের একটি ছোট গ্রামে। গবেষকেরা সেখানে থাকার পাশাপাশি কাজ করার জায়গা ও সৌরবিদ্যুতের সুবিধাও পেয়েছেন।
বেলি থেকে সাইকেল ও হেঁটে প্রায় ২২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সাভানা ও বনভূমির ভেতরে যেতে হয়েছে। সেখানে গবেষকেরা মাঠে অস্থায়ী শিবির তৈরি করেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় মাঠসহকারী ও গ্রেট এইপ বিহেভিয়ার ল্যাবের টেলর টিপেট।
এই শিম্পাঞ্জিরা মানুষ দেখলেই পালিয়ে যায়। তাই গবেষকেরা তাদের সামনে থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারেননি। এর বদলে ব্যবহার করেছেন ক্যামেরা ট্র্যাপ ও শব্দ রেকর্ড করার যন্ত্র।
প্রতিটি পাথর ছোড়ার জায়গায় দুটি করে ভিডিও ক্যামেরা বসানো হয়। আশপাশের শব্দ রেকর্ড করার জন্যও রাখা হয় আলাদা যন্ত্র। গবেষকেরা নিয়মিত সেখানে গিয়ে ক্যামেরার ব্যাটারি ও মেমোরি কার্ড বদলেছেন। গাছের মাপ নিয়েছেন। গাছে ছোড়া পাথরের ত্রিডি ছবিও সংগ্রহ করেছেন।
গবেষকদের প্রতিদিনের কাজও ছিল বেশ পরিশ্রমের। সাধারণত সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে ঘুম থেকে উঠে নাশতা করে তাঁরা বেরিয়ে পড়তেন। দিনে দুই থেকে পাঁচটি পাথর ছোড়ার জায়গায় যেতেন। ক্যামেরা পরীক্ষা করতেন, ব্যাটারি ও মেমোরি কার্ড বদলাতেন। পাশাপাশি গাছ ও পাথর নিয়েও নানা তথ্য সংগ্রহ করতেন।
পথে শিম্পাঞ্জির বাসা, খাবার খাওয়ার চিহ্ন, তাদের ডাকাডাকি এবং দেখা পাওয়া গেলে সেই তথ্যও নথিবদ্ধ করা হতো। এসব ভিডিও ও অডিও থেকে গবেষকেরা জানতে চাইছেন, পাথরটি কোন শিম্পাঞ্জি ছুড়ছে, তার বয়স ও লিঙ্গ কী, তখন আশপাশে অন্য শিম্পাঞ্জি ছিল কি না এবং তারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে কি না।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নজরে এসেছে। ২০১৭ সালে চিহ্নিত করা পাথর ছোড়ার জায়গাগুলোর বেশির ভাগই সাম্প্রতিক সময়েও ব্যবহার হতে দেখা গেছে। অর্থাৎ শিম্পাঞ্জিরা একই জায়গা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহার করতে পারে। এতে ধারণা করা যায়, এসব জায়গা তাদের কাছে সাধারণ কোনো গাছের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শিম্পাঞ্জিদের এই ‘সংস্কৃতি’ও হুমকিতে
শিম্পাঞ্জিদের এই অদ্ভুত আচরণ নিয়ে গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কারণেও। তাদের আবাসস্থল এখন নানা হুমকির মুখে। গিনি-বিসাউয়ে বক্সাইটসহ বিভিন্ন খনিজ উত্তোলনের সম্ভাবনা বাড়ছে। মাঠপর্যায়ে গবেষকেরা বক্সাইট অনুসন্ধানের জন্য খোঁড়া গর্তও দেখেছেন।
বক্সাইটের খনি দেশটির অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু খনির কারণে বন ধ্বংস ও পরিবেশদূষণ হতে পারে। এতে শিম্পাঞ্জি, অন্য বন্যপ্রাণী এবং স্থানীয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। প্রতিবেশী দেশ গিনিতে খনিজ উত্তোলনের এমন প্রভাব ইতিমধ্যে দেখা গেছে।
গিনি-বিসাউয়ের অস্থিতিশীল শাসনব্যবস্থাও পরিবেশ রক্ষার জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তাই নতুন খনি বা বড় ধরনের শিল্প কার্যক্রম শুরু হলে পরিবেশগত নজরদারি ও কার্যকর বিধিনিষেধ নিশ্চিত করা জরুরি।
এই ধরনের সাংস্কৃতিক আচরণ নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে শিম্পাঞ্জি সংরক্ষণ, বৃহত্তর অর্থে জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা ও শিক্ষার জন্য প্রাইমেটদের সাংস্কৃতিক উপাদান সংরক্ষণে সহায়তা করতে চান গবেষকেরা।
• দ্য কনভারসেশন অবলম্বনে