দেশে গত ৯ আগস্ট ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি হয়েছিল, যা গত ৫৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে দাবি করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলাম বুলবুল। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে এক সম্পূরক প্রশ্নে তিনি এ দাবি করেন।
জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের কারণে দেশের মানুষ কষ্টে আছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
সংসদে বুলবুল বলেন, তার নির্বাচনি এলাকা এবং দেশের অধিকাংশ স্থানে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। প্রশ্নোত্তরে দেওয়া বিদ্যুৎ পরিস্থিতির চিত্র বাস্তবসম্মত নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘৯ আগস্ট ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি হয়েছিল, যা এ বছরের সবচেয়ে বেশি ঘাটতি নয়, গোটা ৫৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি।’
এই ঘাটতি পূরণে সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ কী এবং ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কতদিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তা জানতে চান তিনি।
‘বর্তমানে মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের কারণে কষ্টে আছে’
সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘নিছক কথামালার আড়ালে প্রকৃত সত্যকে আমরা লুকাতে চাই না। বলতে কোনও দ্বিধা নেই, বর্তমানে সাম্প্রতিককালের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের সরবরাহের কারণে কষ্টে আছে।’
তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতির কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।’ বর্তমান সংকটকে দীর্ঘদিনের ভুল নীতির অনিবার্য পরিণতি হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। এই সক্ষমতা কাজে লাগাতে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। অথচ দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজির মাধ্যমে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। ফলে বিদ্যুৎ, শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে গ্যাস সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে।
পায়রা-মাতারবাড়ির ইউনিট বন্ধ
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে। এগুলো দ্রুত পূর্ণ ক্ষমতায় চালু করার চেষ্টা চলছে।
আদানির সঙ্গে আগের সরকারের করা চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে দিনে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার দিকে প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ
চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি মোকাবিলায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব।
তিনি জানান, এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে সরকারের পুঞ্জীভূত বকেয়া রয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এই অর্থ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দেওয়া হবে, যাতে উৎপাদন বাড়ানো যায়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পায়রা ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত চালু করা এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা গেলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
‘আমরা আশা করছি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে। আগস্ট মাসে বাংলাদেশের মানুষ যে কষ্ট পোহাতে হয়েছে, অন্তত সেপ্টেম্বর মাসে যেন এই কষ্ট না পোহাতে হয়, সে ব্যাপারে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি,’ বলেন তিনি।
রুফটপ সোলারে জোর
বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যমেয়াদি সমাধানে রুফটপ সোলারকে বড় উৎস হিসেবে দেখছে সরকার। সরকারি ও বেসরকারি ভবনের ছাদে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গত ১ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এর আওতায় রুফটপ সোলার থেকে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সায় সরকারের কাছে বিক্রি করা যাবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা সোলার সিস্টেম স্থাপন করবেন, তারা তিন বছর পর্যন্ত নিজেদের ব্যবহারের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ওই দরে সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতেও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ভোল্টেজ রেগুলেটর ও ইনভার্টারসহ প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে শুধু এক শতাংশ কাস্টমস ডিউটি দিতে হবে। ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর দিতে হবে না।
নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ
জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে নতুন একটি এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের আশা করা হচ্ছে। নতুন এফএসআরইউ ২০২৮ সালের মধ্যে চালু করা সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ সময় বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাত ৮টার মধ্যে বিপণিবিতান ও দোকানপাট বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তা যথাযথভাবে প্রতিপালন হচ্ছে না। সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জ্বালানির উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।