বিপুল খেলাপি ঋণ ও দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের চাপ সামাল দিতে দ্রুত দুটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে সরকারকে তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রস্তাবিত আইন দুটি হলো—‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ২০২৬’ এবং ‘অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩’-এর সংশোধন।
গত ৩১ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে দেওয়া এক ডিও (ডেমি-অফিশিয়াল) চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান চলমান জাতীয় সংসদ অধিবেশনে আইন দুটি উত্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন।
চিঠিতে গভর্নর বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে বন্ধ ও মূলধন সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংক খাতে সুশাসন জোরদার করে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, ডিজিটাল আর্থিক সেবা সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার উদ্যোগ রয়েছে। তবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের ক্রমবর্ধমান পরিমাণ আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খেলাপি ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে ‘অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩’-এ পাঁচটি বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে হাইকোর্টের মর্যাদাসম্পন্ন একটি আপিল ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা, নিলামে ওঠা সম্পদের সংরক্ষিত মূল্য নির্ধারণ, আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে পৃথক রিকভারি অফিসার নিয়োগ, মামলা নিষ্পত্তির আইনি সময়সীমা কমানো এবং আপিলের ক্ষেত্রে জমা দেওয়ার অর্থের পরিমাণ বাড়ানো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এসব পরিবর্তন কার্যকর হলে ঋণসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি ব্যাংকের পাওনা আদায়ের গতি বাড়বে।
অন্যদিকে, খেলাপি ও দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্সশিট থেকে আলাদা করে ব্যবস্থাপনা ও আদায়ের জন্য ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রস্তাবিত আইনের আওতায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (ডিএএমসি) গঠনের কথা বলা হয়েছে।
এসব কোম্পানি ব্যাংক থেকে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ কিনে নিয়ে আইনগতভাবে পৃথক ট্রাস্টের মাধ্যমে তা পরিচালনা করবে।
একই সঙ্গে জামানত বাস্তবায়ন, ঋণ পুনর্গঠন এবং ঋণকে মূলধনে রূপান্তরের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খেলাপি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ৬০ দিনের নোটিশ দেওয়ার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় এসব কোম্পানির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট’ (ডিএএমইউ) গঠনের কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যাংকের ব্যালান্সশিট থেকে খেলাপি ও দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ সরিয়ে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা ও আদায় করা হবে। এতে ব্যাংকগুলোর ওপর খেলাপি ঋণের চাপ কমার পাশাপাশি স্বাভাবিক ঋণ বিতরণ ও অন্যান্য কার্যক্রমে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
গভর্নর চিঠিতে জানান, আইন দুটির খসড়া ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে আইন দুটি জাতীয় সংসদে উত্থাপনের ব্যবস্থা নিতে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ব্যাংকিং খাতে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশের সমান।
শীর্ষনিউজ