সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটিতে অংশ নেওয়ার বিনিময়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ নিতে রাজি নয় বিরোধী দল। তাদের স্পষ্ট অবস্থান— কোনো পদ, সুবিধা বা রাজনৈতিক সমঝোতার বিনিময়েও তারা সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিতে যাবে না। তবে জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংসদে নিজেদের আসনসংখ্যার অনুপাতে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ পাওয়ার দাবি থেকে সরে আসারও প্রশ্ন নেই।
এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নতুন করে বিরোধ প্রকাশ্য হয়েছে। সরকারি দল বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে একই সনদের ভিত্তিতে স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দাবি করা স্ববিরোধী। অন্যদিকে বিরোধী দলের বক্তব্য, সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটিতে অংশ নেওয়া এবং সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ— দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। একটির সঙ্গে অন্যটিকে শর্ত হিসেবে যুক্ত করা গ্রহণযোগ্য নয়।
জুলাই জাতীয় সনদের ২৪ নম্বর সুপারিশে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে। সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠানবিষয়ক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধীদলীয় সদস্যদের দেওয়ার পাশাপাশি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ সংসদে দলগুলোর আসনসংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট এই প্রস্তাবে একমত হয়েছিল।
ত্রয়োদশ সংসদে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের সদস্যসংখ্যা ৯০। সেই হিসাবে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে প্রায় ১০টির সভাপতির পদ পাওয়ার দাবি করছে তারা। কিন্তু এখন পর্যন্ত গঠিত ১৫টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে বিরোধী দল পেয়েছে মাত্র একটির সভাপতির পদ। মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কোনো স্থায়ী কমিটির সভাপতি এখনো বিরোধী দলের কেউ হননি।
কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী প্রথম তিন অধিবেশনের মধ্যে ৫০টি সংসদীয় কমিটি গঠনের কথা। দুই অধিবেশনে গঠিত হয়েছে ১৫টি। বাকি ৩৫টি কমিটি চলতি অধিবেশনে গঠনের কথা রয়েছে। আর এই পদগুলো বণ্টনের আগ মুহূর্তেই সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে দুই পক্ষের বিরোধ সামনে এসেছে।
গত রবিবার সংসদে এ নিয়ে বিতর্কের সময় বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বললেন, সদস্যসংখ্যার অনুপাতে কমিটির সদস্যপদ ও সভাপতির পদে বিরোধী দলের অংশ থাকার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত গঠিত কোনো মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধী দলের কাউকে দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেছেন, সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটিতে যাওয়ার কোনো প্রতিশ্রুতি বিরোধী দল দেয়নি। ওই কমিটিতে অংশ না নেওয়াই তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত। সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ পাওয়ার সঙ্গে বিশেষ কমিটিতে যোগ দেওয়ার শর্ত যুক্ত করাকে তিনি ‘জোর-জবরদস্তি’ হিসেবে দেখছেন।
চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি অবশ্য বলেছেন, বিরোধী দলকে তাদের আসনসংখ্যার অনুপাতে প্রায় ১০টি স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দিতে সরকারি দলের নীতিগত আপত্তি নেই। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শুরু হওয়া সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলকে অংশ নিতে হবে।
বিরোধী দলের নেতারা বলছেন, তারা সংবিধান সংশোধন নয়, প্রয়োজনীয় সংবিধান সংস্কার চান। গণভোটে জনগণ যে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, তার ভিত্তিতেই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগকে তারা সমর্থন করবেন না।
গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি সদস্যপদ রাখা হলেও তারা প্রতিনিধি দেয়নি। প্রতিনিধি ছাড়াই কমিটি এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বললেন, সংবিধান সংস্কারের জন্য সংস্কার পরিষদ গঠন করা হলে তারা অংশ নিতেন। কিন্তু সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটিতে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। একই অবস্থানে রয়েছে এনসিপিও। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেছেন, জনগণ সংস্কারের পক্ষে যে রায় দিয়েছে, এনসিপি সেই অবস্থানেই অটল থাকবে।
বিরোধী দলের নেতাদের ভাষ্য, স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার বিনিময়মূল্য নয়। তারা বলছেন, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে তাদের অবস্থান আপসহীন। কোনো পদ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার বিনিময়ে এই অবস্থান পরিবর্তন করা হবে না। তাদের ভাষ্য, সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বিনিময়ে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার প্রশ্ন নেই।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেছেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে এনসিপি অংশ নেবে না। জনগণ সংস্কারের পক্ষে যে রায় দিয়েছে, দলটি সেই অবস্থানেই অটল থাকবে। সরকার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটি সরকারের বিষয়; তবে জনগণের রায়ের প্রতি এনসিপির অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে।