রাত দেড়টা। ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন হিমেল ও সিঁথি দম্পতি। হঠাৎ হিমেল খেয়াল করলেন, সিঁথির ‘মুড অফ’। কী হয়েছে জানতে চাইতেই সিঁথির অনুযোগ, ‘আমাকে তুমি সময় দাও না।’
কথাটা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লেন হিমেল। বললেন, ‘অফিস শেষ করে বাসায় আসার পর একবারের জন্যও তো বাইরে যাইনি। সারাক্ষণ তোমার পাশেই তো আছি, ঘরেই আছি। তারপরও বলছ, আমি তোমাকে সময় দেই না? ডিনার করলাম তোমার সঙ্গে, মুভি দেখলাম... তাও এমন অভিযোগ কেন? তোমার সঙ্গেই তো আছি।’
সিঁথির অভিযোগ অন্য জায়গায়। তার কাছে পাশাপাশি বসে থাকা কিংবা একই ঘরে থাকা মানেই সময় দেয়া নয়। তার কণ্ঠে স্পষ্ট ঝাঁঝ, ‘সময় দেয়া মানে শুধু শুয়ে-বসে মোবাইল স্ক্রল করা না।’
এবার কিছুটা উত্তেজিত হয়ে হিমেল বলে উঠলেন, ‘তুমিও তো মোবাইল দেখো। আমি মোবাইল দেখলেই দোষ? আমি তো তোমাকে কিছু বলি না।’
সিঁথির উত্তর আরও তীব্র, ‘আমি তোমার অবহেলায় নিজের মন ভালো করতে মোবাইলে ডুবে থাকি। কিন্তু তুমি আমাকে ইচ্ছা করেই সময় দাও না।’
একপর্যায়ে অভিমান থেকে হিমেল বলে ফেললেন, ‘সারা দিন ঘরে থেকেও যদি তোমার মনই না পাই, তাহলে বাসায় আসার চেয়ে না আসাই ভালো।’
সিঁথির মুখে তখন একটাই কথা— ‘তুমি আমাকে কোনো দিনই বোঝো না।’
হিমেল ও সিঁথির এই চরিত্র দুটি মূলত কাল্পনিক। তবে এই চিত্র কি আপনার কাছে পরিচিত লাগছে? আপনার সঙ্গেও ঘটছে এমন ঘটনা? একই ঘরে দুজন মানুষ, পাশাপাশি বসে আছেন, অথচ মন পড়ে আছে আলাদা দুটি মোবাইলের পর্দায়।
প্রশ্নটা এখানেই—পাশে বসে মোবাইল স্ক্রল করাই কি পরিবারকে সময় দেয়া?
গণমাধ্যমকর্মী সেতুর মতে, পরিবারকে সময় দেয়ার অর্থ শুধু একই জায়গায় উপস্থিত থাকা নয়। তিনি বলেন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় মানসিকভাবেও কাছাকাছি থাকা জরুরি। পরিবারের কেউ কথা বললে মন দিয়ে শোনা, দিনের ছোট্ট কোনো ঘটনা নিয়ে গল্প করা, সন্তানের স্কুলের খবর নেয়া কিংবা সঙ্গীর মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করাই সময় দেয়া।
পরিবারকে সময় দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগে না। কয়েক মিনিট ফোনটা পাশে রেখে প্রিয় মানুষটির কথা মন দিয়ে শোনা, তার দিকে তাকানো কিংবা দিনের গল্প ভাগ করে নেয়াই হতে পারে সবচেয়ে মূল্যবান সময়।
কিন্তু বাস্তব জীবনের ব্যস্ততায় সেই মনোযোগটুকুই যেন সবচেয়ে বেশি হারিয়ে যাচ্ছে। খাবারের টেবিলে বসেও হাতে ফোন, টেলিভিশন দেখার সময়ও চোখ ফোনের পর্দায়। এমনকি পরিবারের কেউ কথা বলার সময়ও আঙুল থেমে থাকে না স্ক্রল করা থেকে। দিনের পর দিন এমন চলতে থাকলে একই ঘরে থাকা মানুষগুলোর মধ্যেও তৈরি হতে পারে অদৃশ্য দূরত্ব।
তবে সবাই যে বিষয়টিকে এভাবে দেখছেন, তা নয়। স্কুল শিক্ষক জামান হাসানের কাছে পরিবারের সঙ্গে সময় দেয়ার সংজ্ঞাটা অনেকটাই সহজ।
তিনি বলেন, ‘পাশে তো বসেই আছি। সে তার মতো মোবাইল দেখছে, আমিও মোবাইল দেখছি। চোখের সামনেই তো আছে সবাই, তাহলে আর সময় দিলাম না কীভাবে?’
তার এই কথার মধ্যেই বর্তমান সময়ের একটি বাস্তব চিত্র যেন ফুটে ওঠে। আমরা অনেকেই হয়ত মনে করি, প্রিয় মানুষটি চোখের সামনে থাকলেই তার সঙ্গে সময় কাটানো হচ্ছে। কিন্তু শারীরিক উপস্থিতির সঙ্গে মানসিক উপস্থিতির পার্থক্যটা সেখানেই।
বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে এর প্রভাব পড়ে। সারাদিনের ব্যস্ততার পর একসঙ্গে থেকেও যদি দুজনের চোখ থাকে আলাদা দুটি মোবাইলের পর্দায়, তাহলে কমে যায় কথোপকথন ও মনোযোগ। একসময় পাশে থেকেও সঙ্গীর মনে হতে পারে—‘আমি কি সত্যিই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ?’
ধীরে ধীরে জমতে পারে অভিমান, কমে যেতে পারে নিজেদের মধ্যে কথা বলা ও অনুভূতি ভাগ করে নেয়ার অভ্যাস। এক ছাদের নিচে থেকেও তখন দুজনের মধ্যে তৈরি হতে পারে অদৃশ্য দূরত্ব।
তবে এ বিষয়ে ডাক্তার আব্দুল্লাহ আল মামুনের ভাবনাও একেবারে আলাদা। তিনি বলেন, ‘সময় দেয়া বলতে তারা (পরিবারের সদস্যরা) কী বোঝায়, আমি আসলে জানি না। সারাদিন চোখের সামনে মোবাইলই তো চালাচ্ছি, অন্য কিছু তো করছি না। মোবাইল চালানো মানে তো আমার কান বন্ধ না। আমি তো সব কথাই শুনতে পাচ্ছি এবং রেসপন্স করছি। তাহলে কী সমস্যা?’
এই প্রশ্নের উত্তর হয়ত লুকিয়ে আছে ‘শোনা’ আর ‘মন দিয়ে শোনা’র পার্থক্যের মধ্যে। কেউ কথা বলছে আর আমরা একই সঙ্গে মোবাইলে স্ক্রল করছি—তখন কথাগুলো কানে পৌঁছালেও তার অনুভূতিটা কি সত্যিই আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে?
দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। সারাদিনের ব্যস্ততার পর স্বামী-স্ত্রী যখন রাতে একসঙ্গে বসেন, তখন যদি দুজনের হাতেই থাকে মোবাইল, তাহলে হয়ত কোনো ঝগড়া হচ্ছে না, কিন্তু কথোপকথনও হচ্ছে না। দিনের ক্লান্তি ভাগ করে নেয়া, ছোট কোনো অভিমান দূর করা কিংবা শুধুই একসঙ্গে হাসার মুহূর্তগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে।
তবে নারীদের ক্ষেত্রে সময় দেয়ার ভঙ্গিটা একটু ভিন্ন। গৃহিণী খাদিজা আক্তার তাই সময় দেয়াকে দেখেন অন্যভাবে।
তিনি বলেন, ‘কারও স্বামীই সারাদিন বাসায় থাকে না, দেখা হয় না। দিন শেষে অফিস করে যখন আসবে, একবারই দেখা হয়। তখনও যদি মোবাইলটা হাতে নিয়ে বসে থাকে, তাহলে এটা কী হয়? সময় দেয়া মানে তো কেবল একবার ঘরে থাকা না। আমাকে বোঝা, আমার সমস্যাগুলো শোনা, সুখ-দুঃখের সময় কাটানো—এগুলোই তো সময় দেয়া।’
খাদিজার কথায় হয়ত অনেক পরিবারের না-বলা অভিমান লুকিয়ে আছে। কারণ সম্পর্কের মানুষটি পাশে থেকেও যখন অন্য কিছুর প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ে যায়, তখন একাকিত্বটা আরও বেশি অনুভূত হতে পারে।
মোবাইল এখন জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ। কাজ, যোগাযোগ, বিনোদন কিংবা নানা প্রয়োজনেই এর ব্যবহার এড়িয়ে চলার সুযোগ নেই। তাই সমস্যা মোবাইল ব্যবহারে নয়; সমস্যা তখনই, যখন পরিবারের জন্য রাখা সময়টুকুও মোবাইলের পর্দা দখল করে নেয়।
একই ঘরে থেকেও যদি প্রত্যেকে নিজের নিজের পর্দায় ব্যস্ত থাকে, তাহলে শারীরিক দূরত্ব না থাকলেও মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। অথচ সেই দূরত্ব কমাতে খুব বেশি কিছু প্রয়োজন হয় না।
কখনও কয়েক মিনিট ফোনটা পাশে রেখে প্রিয় মানুষটির কথা মন দিয়ে শোনা, সঙ্গীর মনের কথা বোঝার চেষ্টা করা কিংবা একসঙ্গে বসে কিছুক্ষণ গল্প করাই যথেষ্ট।
কারণ পরিবার হয়ত মনে রাখবে না আপনি তাদের পাশে কত ঘণ্টা বসেছিলেন। তারা মনে রাখবে, যখন তারা আপনাকে চেয়েছিল, তখন আপনি সত্যিই তাদের পাশে ছিলেন কি না। মনে রাখবে, তাদের কথা বলার সময় আপনি মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে তাদের দিকে তাকিয়েছিলেন কি না।