যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে মিশরে আশ্রয় নেওয়া ৫ হাজার ফিলিস্তিনি পরিবারের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মানবিক সংগঠন ওয়ান ওয়ার্ল্ড উম্মা ফাউন্ডেশন।
তুরস্কের দুটি মানবিক ও দাতব্য সংস্থা গুন ইউজু দেরনেই এবং ইয়েনি বাশাক ইনসানি ইয়ারদিম দেরনেই এর সহযোগিতা ও অর্থায়নে এ খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
সহায়তা প্যাকেজে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, আটা, লবণ, ম্যাকারনি, সস, ঘি, চিনি, দুধ ও চা-পাতাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ছিল।
ওয়ান ওয়ার্ল্ড উম্মা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হুজাইফা খান বলেন, যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি ও স্বাভাবিক জীবন হারিয়ে মিশরে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো নানা সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। তাদের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা পূরণে এই সহায়তা কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে বলে আশা করেন তিনি।
তিনি বলেন, “মুসলিম হিসেবে আমরা সবাই এক উম্মাহ। বিপদের সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব। ফিলিস্তিনি জনগণের কঠিন সময়ে তাদের পাশে থাকার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
হুজাইফা খান জানান, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর ফিলিস্তিনিদের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা আগের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে। মিশরে আশ্রয় নেওয়া বেশ কয়েকটি ফিলিস্তিনি পরিবার তাদের খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনের কথা জানিয়ে সহযোগিতার আবেদন করছিল।
“তাদের পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা প্রথমে যুক্তরাজ্যের একটি চ্যারিটি সংস্থার কাছে বিষয়টি তুলে ধরি। পরে ওই সংস্থার সহযোগিতায় তুরস্কের দুটি মানবিক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে। তাদের সহযোগিতায় মিশরে আশ্রিত ৫ হাজার ফিলিস্তিনি পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে,” বলেন তিনি।
তবে এই সহায়তা সাময়িকভাবে কিছু পরিবারের খাদ্যসংকট কমাতে পারলেও তাদের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান নয় বলে মনে করেন হুজাইফা খান।
তিনি বলেন, “আমরা জানি, এই সহযোগিতা তাদের দীর্ঘদিনের কষ্টের সমাধান নয়। তবে একটি সংকটাপন্ন পরিবারের কয়েক দিনের খাবারের ব্যবস্থা করাও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই, ফিলিস্তিনি মানুষের প্রতি সহযোগিতার এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হোক।”
খাদ্য সহায়তা নিতে আসা ফিলিস্তিনি নাগরিক আবু আদওয়ানের পরিবারও চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। কিডনি ফেইলিউরে আক্রান্ত আবু আদওয়ানের দুই পা অ্যাম্পুটেশন করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনি অন্যান্য শারীরিক জটিলতায়ও ভুগছেন।
নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি তাকে সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস করাতে হয়। চিকিৎসা ও যাতায়াতের ব্যয় বহন করতে না পেরে আর্থিক সংকটে পড়েছে পরিবারটি।
আবু আদওয়ান বলেন, “আমার আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। নিয়মিত হাসপাতালে যেতে হয় এবং কিডনি ডায়ালাইসিস করাতে হয়। চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত খাবারেরও প্রয়োজন। কিন্তু আমার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ।”
তার একটি ছোট মেয়ে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শিশুটির পোশাক ও ভরণপোষণের খরচও বহন করা তার পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি তার বাম হাতে একটি অস্ত্রোপচার করানো প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
আবু আদওয়ান বলেন, “কোনো দয়ালু ব্যক্তি যদি আমার মেয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন অথবা আমার পরিবারের ভরণপোষণে সহযোগিতা করেন, তাহলে আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন।”
আবু আদওয়ানের স্ত্রী জানান, স্বামীর চিকিৎসা চালিয়ে নিতে প্রতি সপ্তাহে তিনবার হাসপাতালে যেতে হয়। প্রতিবার যাতায়াতেই প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মিশরীয় পাউন্ড খরচ হয়।
তিনি বলেন, “যাতায়াতের খরচের পাশাপাশি বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এবং চিকিৎসার ব্যয় রয়েছে। তার জন্য স্বাস্থ্যকর খাবারেরও ব্যবস্থা করতে হয়।”
ডায়ালাইসিসের পর অনেক সময় আবু আদওয়ানের রক্তে শর্করা কমে যায় বলেও জানান তার স্ত্রী। তখন তাকে মিষ্টিজাতীয় খাবার কিনে দিতে হয় বলে জানান তিনি।
গাজা থেকে মিশরে আসার পর তাদের পরিবারের কোনো আয়ের উৎস নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা গাজা থেকে আসা একটি পরিবার। সেখানে আমরা আমাদের সবকিছু হারিয়েছি। এখানেও আমাদের কোনো আয়ের উৎস নেই, কোনো উপার্জনকারী নেই।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্বামীর ওষুধের পেছনে মাসে প্রায় ৮ হাজার মিশরীয় পাউন্ড খরচ হয়। চিকিৎসা ও যাতায়াত মিলিয়ে ব্যয় প্রায় ১৫ হাজার পাউন্ডে পৌঁছায়। খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ যোগ করলে মাসিক ব্যয় ২০ হাজার পাউন্ডেরও বেশি হয়ে যায়।
আবু আদওয়ানের স্ত্রী বলেন, “আমরা মানুষের কাছে সাহায্য চাই। কিন্তু সবসময় এমন কাউকে পাই না, যিনি আমাদের সহযোগিতা করবেন। আমরা চাই না সবসময় মানুষের কাছে হাত পাততে। আমরা শুধু চাই, আল্লাহ যেন এমন একজনের ব্যবস্থা করে দেন, যিনি অন্তত তার চিকিৎসা ও যাতায়াতের দায়িত্ব নিতে পারেন।”
ভবিষ্যতেও সামর্থ্য অনুযায়ী মিশরে আশ্রিত ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ওয়ান ওয়ার্ল্ড উম্মা ফাউন্ডেশন।