চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরে ঢুকলে কানে ভেসে আসে আলাদা এক ভাষার টান। কিছুটা চট্টগ্রাম কিছুটা নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষার টোন মিলিয়ে এক মিষ্টি উচ্চারণে চায়ের আড্ডায় গল্প জমে। কথার ফাঁকে উঠে আসে সন্দ্বীপের সুখস্মৃতি। ভাষা, খাবার, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক যোগাযোগ সব মিলিয়ে হালিশহরজুড়ে গড়ে ওঠা এক টুকরো সন্দ্বীপ। এই জনপদ গড়ে ওঠার পেছনে আছে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। একসময় যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, তারাই আজ হালিশহরে গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন। একই সঙ্গে গড়ে তুলেছেন ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিজেদের শক্তিশালী সামাজিক বলয়।
বিহারী কলোনি থেকে সন্দ্বীপিয়ান ঠিকানা ১৯৬৪-৬৫ সালের দিকে হালিশহরের এই এলাকা পরিচিত ছিল ‘বিহারী কলোনি’ হিসেবে। ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে বিহারিরা পাকিস্তানে চলে যেতে শুরু করলে অনেক ঘর ফাঁকা হয়ে যায়। সেই সময় মেঘনার ভাঙনে ভিটেমাটি হারানো সন্দ্বীপের মানুষ এখানে আশ্রয় নিতে শুরু করে।
নদীভাঙন সন্দ্বীপের মানুষের জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৮৮০ সালে দ্বীপটির আয়তন ছিল প্রায় ৫০২ বর্গকিলোমিটার। ১৯৭৯ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ২৯০ বর্গকিলোমিটারে। বর্তমানে আয়তন আরও কমে ২৫৮ বর্গকিলোমিটারে ঠেকেছে। বছরের পর বছর ভাঙনে ইজ্জতপুর, আমিরাবাদ, রুহিনী, হুদ্রাখালী, দীর্ঘাপাড়, কাটগড় ও বাটাজোড়াসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ বসতভিটা হারিয়েছেন। বিলীন হয়েছে ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নের মতো জনপদও। ভিটেমাটি হারানো এসব পরিবারের অনেকেই নতুন ঠিকানা খুঁজে নেন চট্টগ্রামের হালিশহরে।
গড়ে ওঠে নতুন জনপদ
হালিশহরের এ-ব্লক, বি-ব্লক, আই-ব্লক এবং কে-ব্লকের কিছু এলাকায় সন্দ্বীপিয়ানদের বসতি তুলনামূলক বেশি। স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ রসিকতা করে বলেন, এই এলাকার ১০টি বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লে আটটিতেই মিলবে সন্দ্বীপের মানুষ। তবে এই বসতি গড়ে উঠেছে এক দিনে নয়। ১৯৭৬ সালে মাত্র ১ হাজার টাকায় একটি বাসার পজেশন কিনে হালিশহরে আসেন এ কে এম বেলায়েত হোসেন। তখন পুরো এলাকায় সন্দ্বীপের পরিবার ছিল ১৫ থেকে ২০টি। বিদ্যুৎ ও খাবার পানির সংকট ছিল তীব্র। রাস্তাঘাটও ছিল বেহাল।
সন্দ্বীপ থেকে আসা মানুষদের সংগঠিত করতে অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল অজিউল্লাহকে সভাপতি করে গড়ে তোলা হয় ‘সন্দ্বীপ নদী সিকস্তি কল্যাণ সমিতি’। পরে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কর্মরত সন্দ্বীপের কর্মকর্তা ও শ্রমিকেরা হালিশহরে জায়গা কিনতে শুরু করলে বসতি দ্রুত বাড়তে থাকে।
অধিকার আদায়ের লড়াই
১৯৯৪ সালে সমিতির সভাপতি হন বেলায়েত হোসেন। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এম এ আজিজ। তাদের নেতৃত্বে নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত সন্দ্বীপিয়ানদের জন্য হালিশহর হাউজিং এস্টেটের পরিত্যক্ত বাড়ি কম দামে বরাদ্দের দাবি ওঠে।
তৎকালীন সরকারের কাছে তাদের দাবি ছিল, ঢাকার মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের মতো চট্টগ্রামেও নদীভাঙা মানুষদের ৬০ হাজার টাকা মূল্যে পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হোক। নানা আপত্তি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিষয়টি আটকে যায়। কিন্তু বেলায়েত হোসেনরা হাল ছাড়েননি। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে তদবির চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ৬০ হাজার টাকা মূল্যে বাড়ি বরাদ্দের আদেশ আদায় করেন।
প্রথম দফায় ৮৪টি বাড়ি বরাদ্দ হলেও পরে নানা জটিলতায় প্রক্রিয়া থমকে যায়। আবারও তদবির করে তা চালু করেন তারা। শেষ পর্যন্ত একতলা ও এক কক্ষের ঘরগুলোও নির্ধারিত মূল্যে বরাদ্দ পায়।
এক টুকরো সন্দ্বীপ
সেই সময়ের এক কক্ষের ঘর কিংবা ছোট্ট বসতি এখন বদলে গেছে। কোথাও চারতলা, কোথাও ছয়তলা, আবার কোথাও ১০ তলা ভবন মাথা তুলেছে। একসময় যে জমির দাম ছিল তুলনামূলক কম, আজ তার মূল্য কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
নতুন প্রজন্মের অনেকেই হালিশহরেই জন্মেছেন। তবু কথাবার্তার টান, পারিবারিক খাবার কিংবা আড্ডার ভাষায় রয়ে গেছে সন্দ্বীপের সেই টোন।
ন্যাশনাল ব্যাংকের কর্মকর্তা মুহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন বললেন, ‘নদীভাঙন, যোগাযোগব্যবস্থাসহ নানা সমস্যার কারণে সন্দ্বীপের মানুষ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। হালিশহরের অনুকূল পরিবেশ প্রথমে তাদের টেনেছিল। পরে আপনজনের সান্নিধ্যে থাকার আকাঙ্ক্ষায় এখানে সন্দ্বীপিয়ানদের বসতি আরও বিস্তৃত হয়েছে।’
নদীভাঙন তাদের ভিটেমাটি কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু সেই বাস্তুচ্যুত মানুষই হালিশহরে গড়ে তুলেছেন জীবনের নতুন এক ঠিকানা।