Image description

দেশের বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট গত ১৭ বছরের সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, অতীতে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কারণে দেশে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। এখন সরকার জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুতের গ্রাহকদের উৎপাদক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে।

শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সম্মেলনকক্ষে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর আওতাধীন ফাউন্ডেশনগুলোর ১৮০ দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের অগ্রগতি, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার এবং ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, সরকারের সংস্কার ও উন্নয়নের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন ফাউন্ডেশনগুলো পাঁচটি ক্লাস্টারে কাজ করবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব ফাউন্ডেশন ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দর্শন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ থেকেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিতুমীর বলেন, ‘বাংলাদেশকে যদি সবার আগে রাখতে হয়, তাহলে সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন’। 

আজকের বৈঠককে নজিরবিহীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আজ আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি, আমাদের জানা মতে, বাংলাদেশে এর আগে এমন কিছু হয়নি।’

অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও সমৃদ্ধির জন্য পুনর্গঠন-এই তিন ধাপে পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল অনুমোদন দিয়েছেন। এরই মধ্যে ১৮০ দিনের মধ্যে পরিবর্তনের বিভিন্ন মাইলফলক অর্জিত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বৈঠকে নেওয়া প্রথম সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরে ড. তিতুমীর বলেন, ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ কর্মসূচির মাধ্যমে সারা দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ফাউন্ডেশন কাজ করবে।

দ্বিতীয় বিষয়টি বিদ্যুৎ খাত নিয়ে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মানুষ বিদ্যুতের ভোক্তা। এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে তাদের বিদ্যুতের ভোক্তা থেকে উৎপাদকে পরিণত করা যায়।

তৃতীয় বিষয় হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বলার মতো কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থা নেই। এটি ভেঙে পড়েছে।’ তবে এ খাতে বাজেটে বড় ধরনের বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

ড. তিতুমীর বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাসপাতালগুলো ২০ শয্যার করা হয়। পরে, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে তা বাড়িয়ে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এরপর আর হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো হয়নি। বর্তমান সরকার এখন উপজেলা পর্যায়ে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

চতুর্থ বিষয় হিসেবে তিনি সারা জীবনের জন্য সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। এর আওতায় প্রতিটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে অধিকারভোগী হিসেবে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হবে।

ড. তিতুমীর বলেন, এ কর্মসূচির বিকল্প অর্থায়নের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে জাকাত বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’ 

কীভাবে জাকাতের অর্থ এই কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করা যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

পঞ্চম বিষয় হলো- বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ। উপদেষ্টা বলেন, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের দেওয়া প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে। এ তথ্য একটি ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করা হবে।

তিনি বলেন, ‘সরকার তাদের ওপর এ দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়নি। তারা নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়েছে।’

‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ কর্মসূচি আগের জেলাভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচির মতো ব্যর্থ হবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময়কার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদাহরণ দেন।

ড. তিতুমীর বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেওয়া হলে দারিদ্র্য বাড়ার কথা নয়। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত সরকারের গৃহীত কর্মসূচির কারণে দেশে দারিদ্র্য ৮০ লাখ থেকে এক কোটি পর্যন্ত বেড়েছে।

তিনি বলেন, সরকার জ্বালানি ব্যবস্থায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি মিশ্রণ গড়ে তুলতে চায় এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে চায়।

আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সরকারি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিভিন্ন ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যে দুই গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান ড. তিতুমীর।

তিনি বলেন, ছয় মাসে ৩০০টির বেশি ঝুলে থাকা নেট মিটারিং আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এরই মধ্যে ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎ খাতে বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া দুই হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এই অর্থ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (আইডকল) ও বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) মাধ্যমে দেওয়া হবে।

এ ক্ষেত্রে উৎপাদককে দিতে হবে ২০ শতাংশ অর্থ। পিকেএসএফের সহযোগী এনজিওর মতো কোনো অ্যাগ্রিগেটর দেবে ২০ শতাংশ এবং সরকারের ঋণ থাকবে ৬০ শতাংশ। 


তিনি বলেন, এ ব্যবস্থায় ঋণের সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে নেমে আসবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের তুলনা করে ড. তিতুমীর বলেন, গ্যাস দিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪ থেকে ৫ টাকা খরচ হয়। অন্যদিকে এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় ৬৪ টাকা।

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এক গিগাওয়াটের বিষয়টি বিবেচনা করি, তাহলে ভর্তুকির পরিমাণ কমবে। এই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করা সম্ভব হবে।’

বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগকারীদের পাঁচটি প্রধান চাহিদার কথাও তুলে ধরেন উপদেষ্টা। এগুলো হলো-পাঁচ বছরের জন্য নির্ধারিত করকাঠামোর মাধ্যমে নীতির ধারাবাহিকতা, নিয়ন্ত্রণমুক্ত পরিবেশ ও অনুমোদনের ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাক ব্যবস্থা, অর্থায়নের উৎস, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ।

ড. তিতুমীর বলেন, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০ হাজার কোটি টাকার ব্যবস্থা করেছে। এ জন্য ৪০টি ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে এ ঋণ বিতরণ শুরু হবে।

ঋণের সুদহারের পার্থক্যজনিত ব্যয় অর্থ বিভাগ বহন করবে বলেও জানান তিনি।

উপদেষ্টা বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই, যা অর্জন করা সম্ভব নয়।’

সরকারের এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।