Image description

নেপালের রসুয়াবাসির জন্য দুর্যোগ কেবল শুরু হয়েছে। যারা প্রাণ হারিয়েছেন তারা তো চলেই গেছেন, যারা বেঁচে আছেন তারা প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন বেঁচে থাকার জন্য। খাবার নেই, পানি নেই, মাথার উপর ছাদ নেই, ওষুধ, চিকিৎসা কিচ্ছু নেই। আছে শুধু কোথাও হয়তো আপনজন বেঁচে আছেন সেই আশা আর ধুকপুক করা একটা প্রাণ।

ভাদ্রের ১০ তারিখ (বুধবার), সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে বিকট শব্দে খসে পড়ল হিমবাহ, প্রকম্পিত হল চারিধার। ভোটেকোশি নদী দিয়ে নেমে আসতে থাকল পাহাড়ি ঢল। পাহাড়ি ঢল তো নয়, যেন বিশালাকৃতির সর্পিল এক দানব। চলার পথে যা পাচ্ছে গিলে খাচ্ছে। মানুষ, ঘরবাড়ি, গাছপালা, পশুপাখি, রাস্তা-ব্রিজ কিছুই রেহাই পাচ্ছে না। দিগ্বিদিক শূণ্য হয়ে ছোটাছোটি করছে মানুষ। ভয়ার্ত মানুষের চিৎকার, পশুপাখির আর্তনাদ কিছুই শোনা যাচ্ছে না। সব যেন ঢাকা পড়ছে সর্পিল দানবের গর্জনে।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ ড. গঙ্গারাম তুলাধরের মতে এমন দুর্যোগ যে নেপালে দেখা দিবে তা তিনি ছাত্রাবস্থায় জাপানের দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে জানতে পেরেছিলেন। তবে সে দুর্যোগ যে তার জীবদ্দশায়ই তিনি প্রত্যক্ষ করবেন তা তিনি ভাবেননি।

ড. গঙ্গারাম তুলাধরের মতো বিশ্ববাসিও হয়তো ভাবেনি এমন দুর্যোগ তারা কখনও দেখবে। এই আকস্মিক বন্যায় আপনজন হারানোর পাশাপাশি বাড়ি, সঞ্চয়, এমনকি পেশাও হারিয়েছেন অনেকে।

বন্যায় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন এখন খাবার ও নিরাপদ পানীয় জল। জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আপাতত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার নেপাল সেনাবাহিনীর ব্যারাকে অস্থায়ী আশ্রয়, খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও ওষুধের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

রাসুয়ার পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুতর উল্লেখ করে নুয়াকোটভিত্তিক সাংবাদিক নবদীপ শ্রেষ্ঠা বলেন, বর্তমানে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও বিভিন্ন সংগঠনের দেওয়া খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। প্রধান জেলা কর্মকর্তার অধীনে একদ্বার পদ্ধতিতে ত্রাণ বিতরণের জন্য সর্বদলীয় সমঝোতা হলেও বাস্তবে বিভিন্ন গোষ্ঠী পৃথকভাবে ত্রাণ বিতরণ করছে।

তবে আসল প্রশ্ন, ‘ত্রাণ এসেছে কি নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, ‘এই ত্রাণ কত দিন চলবে, আর তারপর কী হবে?’

যাদের বাড়িঘর আর বসবাসের উপযোগী নেই, তাদের অস্থায়ী আশ্রয়ে রাখা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা মানুষদের নেপাল সেনাবাহিনীর ব্যারাক ছাড়াও স্কুল, খালি জায়গা ও বিভিন্ন আশ্রয়স্থলে রাখা হয়েছে যেখানে বাস্তুচ্যুত মানুষ ও বহিরাগতরা অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে রাত কাটাতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা কাঞ্চা তামাং জানান, কিছু সাধারণ মানুষ বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় দিয়েছেন নিজেদের বাড়িতে। তবে যেসব পরিবারের বাড়ি পুরোপুরি ভেসে গেছে বা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে, তাদের সামনে বাড়ি পুনর্নির্মাণ, জমির ব্যবস্থা এবং নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার।

শুধু বাড়িঘরই নয়, অনেকেরেই ভেসে গেছে মানুষের নাগরিকত্বের সনদ ও অন্যান্য নথিপত্র, কাপড়চোপড়, খাদ্যসামগ্রী, ব্যবসা এবং বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সঞ্চয়।

তবে এই সব কষ্ট ছাপিয়ে গেছে একটাই অসহনীয় প্রশ্ন, আপনজন কোথাও বেঁচে আছে কিনা। অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে নেপাল সেনাবাহিনী, নেপাল পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে আকাশপথেও উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

বুধবার ও বৃহস্পতিবার নুয়াকোটের ব্যারাকে আটটি হেলিকপ্টার অবস্থান করলেও শনিবার সেখানে মাত্র তিনটি হেলিকপ্টার দেখা যায়। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ভেতরে আটকে পড়া মানুষ তখনো ছিলেন উদ্ধারের অপেক্ষায়। কিন্তু সরকার এখনো কিছু স্থানে পৌঁছাতে না পারায় জনমনে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে।

একদিকে মানুষ প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণায় ভুগছেন, অন্যদিকে অনেকেই চোখের সামনে স্বজনদের সাহায্যের আকুতি দেখেও কিছু করতে না পারার অসহায়ত্ব ও অপরাধবোধে ভুগছেন।

বন্যায় সৃষ্ট সবচেয়ে গভীর ক্ষত হলো মানুষের প্রাণহানি। অনেক পরিবারের সদস্য মারা গেছেন, আবার অনেকে এখনো নিখোঁজ। প্রিয়জনের মরদেহ উদ্ধার হলে পরিবার অন্তত শোকের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।

তাই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম কেবল সরকারের একটি ‘অপারেশন’নয়, এটি তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশা। মরদেহ শনাক্ত করা, ডিএনএ পরীক্ষা করা, স্বজনদের খবর দেওয়া এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করাও ত্রাণ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

চিতওয়ানের প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছেন, মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে এবং ভারতপুর মহানগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ডের দেবঘাটের একটি খোলা স্থানে মরদেহগুলোর ব্যবস্থাপনা করা হবে।

এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, অক্ষত অবস্থায় স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার হলে সেগুলোর শেষকৃত্য নিজেরা সম্পন্ন করার অধিকার তাদের থেকে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের আশঙ্কা, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহ শনাক্ত করতেও অনেক সময় লাগবে।

অবকাঠামো, ত্রাণ ও যোগাযোগ

বন্যায় রাসুয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা এক প্রকার ভেঙে পড়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভেসে গেছে ত্রিশুলি করিডরে ৩৫টি কংক্রিটের সেতু এবং ৪৫টি ঝুলন্ত সেতু। প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ত্রাণ কার্যক্রমেও। সড়ক যোগাযোগ না থাকায় কঠিন হয়ে পড়েছে খাবার, ওষুধ, পানি, নির্মাণসামগ্রী এবং অন্যান্য জরুরি পণ্য পরিবহন। উত্তরগয়া গ্রামীণ পৌরসভার চেয়ারম্যান মাধব আরিয়াল বলেন, রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া, স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা কিংবা মরদেহ পরিবহন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সড়ক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু হলেও আসন্ন ঝুঁকি ও পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় কাজটি অত্যন্ত দূরহ হয়ে পড়েছে। সাংবাদিক নবদীপ শ্রেষ্ঠার মতে, সূর্যগাধি রুট দিয়ে রাসুয়া পর্যন্ত একটি কাঁচা সড়ক চালু করা হয়েছে। তবে রাসুয়ার সাংবাদিক হেমনাথ খত্রী জানান, পথটি দীর্ঘ ও দুর্গম হওয়ায় এই রুট ব্যবহার করে ত্রাণ পৌঁছে দিতে সক্ষম মানুষের সংখ্যা এখনো অত্যন্ত কম।

বন্যাকবলিত মানুষ কোনো একটি সমস্যার মুখোমুখি নন। তবে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারের দিক থেকে নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাদ্য ও পানীয় জলের সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের অনুসন্ধানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

যেসব পরিবারের বাড়ি ও দোকান ভেসে গেছে, তারা কীভাবে আবার ব্যবসা শুরু করবে? যারা চাকরি হারিয়েছে, তারা কোথায় কাজ করবে? কৃষকেরা যদি গবাদিপশু, ফসল বা মজুত কৃষিপণ্য হারিয়ে থাকেন, তবে তারা কীভাবে নিজেদের জীবিকা পুনর্গঠন করবেন? এই সব প্রশ্নে একর পর এক দেখা দিচ্ছে।

আগাম সতর্কবার্তার অভাব

স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য দুর্যোগটির আরেকটি বেদনাদায়ক দিক হলো এর আকস্মিকতা। প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১০ ভাদ্রের (বুধবারের) এই বন্যা থেকে বাঁচার জন্য মানুষ তেমন কোনো সময় পায়নি। একই সঙ্গে বন্যায় বাজার, জনপদ, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এতে একটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে—এ ধরনের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিমালয় অঞ্চলে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল?

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্যোগের পর রাসুয়া, ধাদিং ও নুয়াকোটের কিছু এলাকায় বন্যার আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, বন্যার আঘাতেই সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সময়মতো সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি।

ফলে স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ এখন আর শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাদের প্রশ্ন ভবিষ্যতের নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।

আবার কোনো দুর্যোগ হলে আমরা কীভাবে সতর্কবার্তা পাব? কোথায় যাব? নিরাপদ স্থান কোথায়?—এই সব প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে।

ত্রাণ, ক্ষতিপূরণ, পুণর্গঠন

সরকার তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান ও উদ্ধার, ত্রাণ এবং পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ ও হালনাগাদ করে এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিলের বাজেট ব্যবহার করার। ভূমির ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন ও দুর্যোগ মানচিত্র তৈরির ব্যবস্থাও এগিয়ে নিয়েছে জরিপ বিভাগ। তবে ক্ষতিপূরণ আর ত্রাণ একই বিষয় নয়।

ত্রাণ ক্ষুধা, আশ্রয় ও স্বাস্থ্যসেবার মতো তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটায়। অন্যদিকে ক্ষতিপূরণ এমন হওয়া উচিত, যাতে নাগরিকেরা হারানো সম্পদ ও জীবিকা পুনরুদ্ধার করতে পারেন। যেসব পরিবার পুরোপুরি বাড়িঘর হারিয়েছে, যেসব পরিবার সদস্য হারিয়েছে, যারা ব্যবসা হারিয়েছে, পাশাপাশি কৃষক ও শ্রমিকদের জন্য ক্ষতিপূরণের সুস্পষ্ট মানদণ্ড ও সময়সীমা প্রয়োজন।

বন্যায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১২টি বিদ্যুৎ প্রকল্পে ক্ষয়ক্ষতির কারণে ৪৩১.১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বোঝা যায়, পুনর্গঠনের কাজ কতটা ব্যাপক হতে যাচ্ছে।

তবে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের আগে রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো নাগরিকদের নিরাপত্তা, আশ্রয় এবং জীবিকা নিশ্চিত করা।

রাসুয়ার বন্যাকবলিত মানুষের এখন খাবার প্রয়োজন। তাদের মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ প্রয়োজন। তারা খোঁজ পেতে চান তাদের নিখোঁজ প্রিয়জনদের।

কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর এই চাহিদা বদলে যাবে। সময়ের সঙ্গে নাগরিকদের প্রয়োজন যেভাবে পরিবর্তিত হবে, সরকারকে সেই পরিবর্তিত প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে এবং তাদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করতে হবে। কেবল তখনই নাগরিকেরা সত্যিকার অর্থে অনুভব করবেন যে তাদের একটি সরকার আছে।

পানি নেমে গেলেই দুর্যোগ শেষ হয়ে যায় না। দুর্যোগ তখনই শেষ হয়, যখন বেঁচে যাওয়া মানুষ আবার নিজেদের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎকে নিরাপদ বলে দেখতে শুরু করেন।

এই মুহূর্তে রাসুয়ার বন্যাকবলিত মানুষের প্রয়োজন কেবল এক বস্তা ত্রাণসামগ্রী নয়। তাদের প্রয়োজন বেঁচে থাকার উপায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। আর সেই আস্থা তৈরি হতে পারে কেবল সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে।