Image description

সরকারি সেবা দিতে গিয়ে ঘুষ চাওয়া বা ব্যবসা বা অন্য কোনো কাজে চাঁদা দাবি—দুটিই এখন একই ধরনের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেনামে জানানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। সম্প্রতি ‘ঘুষ.সাইট’ ও ‘চান্দাবিডি ডট কম’ নামে দুটি ওয়েবসাইট চালু হয়েছে দেশে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুটি উদ্যোগ একই কর্তৃপক্ষের। লক্ষ্য, নাগরিকদের কাছ থেকে ঘুষ ও চাঁদা দাবির তথ্য সংগ্রহ করে তা এক জায়গায় প্রকাশ করা এবং এসব ঘটনার প্রবণতা সম্পর্কে একটি চিত্র তৈরি করা।

শুরুতেই এই দুই ওয়েবসাইটে মানুষের সাড়া বেশ বড়। ‘চান্দাবিডি ডট কম’ চালুর পর তিন দিনে ৩৭৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ ৮ কোটি ৪৫ লাখ ১৮ হাজার ৪০১ টাকা। আর ‘ঘুষ.সাইট’ চালুর পাঁচ দিনে অভিযোগ এসেছে ৩ হাজার ৮০০টির বেশি। অভিযোগে দাবিকৃত ঘুষের পরিমাণ প্রায় ৬৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই দুই প্ল্যাটফর্মে উঠে এসেছে বিপুল অঙ্কের অর্থের দাবি। এত অভিযোগ ও এত টাকার হিসাব প্রকাশ পেলেই কি ঘুষ ও চাঁদাবাজি কমবে?

‘চান্দাবিডি ডট কম’-এর তিন দিনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিযোগের সংখ্যা এবং দাবিকৃত অর্থ—দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা বিভাগ। সেখানে ১৫২টি অভিযোগে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির তথ্য দেওয়া হয়েছে। মোট দাবিকৃত অর্থের প্রায় ৬৩ দশমিক ৯ শতাংশই ঢাকার অভিযোগে।

অভিযোগের সংখ্যায় দ্বিতীয় চট্টগ্রাম বিভাগ। সেখানে ৭৪টি অভিযোগে প্রায় ৪০ লাখ ১৭ হাজার টাকা চাঁদা দাবির তথ্য পাওয়া গেছে। রাজশাহীতে ৩৮টি অভিযোগে প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং রংপুরে ৩১টি অভিযোগে প্রায় ৮৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা দাবির কথা জানানো হয়েছে। বরিশালে ২৫টি অভিযোগে প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার, খুলনায় ২৪টি অভিযোগে প্রায় ২৫ লাখ ৪২ হাজার, ময়মনসিংহে ২০টি অভিযোগে প্রায় ১২ লাখ ৬৪ হাজার এবং সিলেটে ১২টি অভিযোগে প্রায় ২৮ লাখ ৫৭ হাজার টাকা দাবির তথ্য এসেছে।

এই হিসাবেই দেখা যায়, অভিযোগের সংখ্যা বেশি হলেই দাবিকৃত অর্থ বেশি—এমন সরল সম্পর্ক নেই। চট্টগ্রামে অভিযোগের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও টাকার অঙ্ক কম। আবার রাজশাহী ও রংপুরে অভিযোগ কম হলেও দাবিকৃত অর্থ তুলনামূলক বেশি।

চাঁদার অভিযোগগুলো বোঝাতে ওয়েবসাইটটিতে তৈরি করা হয়েছে ‘চাঁদার ম্যাপ’। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা বা থানা অনুযায়ী অভিযোগের অবস্থান দেখা যায় সেখানে। কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগে ক্লিক করলে ঘটনার স্থান, ধরন, দাবিকৃত অর্থ, ফলাফল ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায়। একই এলাকার কাছাকাছি একাধিক অভিযোগ থাকলে সেগুলো প্রথমে গুচ্ছ আকারে দেখানো হয়। মানচিত্র বড় করলে আলাদা অভিযোগও দেখা যায়।

অভিযোগের সঙ্গে ঘটনাস্থলের গুগল ম্যাপের সংযোগও দেওয়া হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট ঠিকানা না থাকলে উপজেলা, থানা বা এলাকার আনুমানিক অবস্থান দেখানো হয়। ফলে মানচিত্রে কোনো স্থান দেখানো হয়েছে বলেই সেটিকে নিশ্চিত ঘটনাস্থল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটি অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি একটি আনুমানিক অবস্থান।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব অভিযোগের কোনোটিই আদালত, তদন্তকারী সংস্থা বা স্বাধীন তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রমাণিত নয়। অভিযোগকারীর পরিচয়ও প্রকাশ করা হয় না। নাম, ফোন নম্বর বা ই-মেইল ঠিকানা না দিয়েই অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। সঙ্গে ঘটনার ধরন, দাবিকৃত অর্থ, ফলাফল, বিস্তারিত বিবরণ ও প্রমাণ হিসেবে ছবি যুক্ত করা যায়।

দর্শনার্থীরা একটি অভিযোগকে ‘সঠিক’ অথবা ‘সঠিক নয়’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেন। প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজারবার ‘সঠিক’ প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো অভিযোগে কয়েক শ বা কয়েক হাজার মানুষ ‘সঠিক’ বললেই সেটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হয়ে যায় না। এ জায়গাতেই এমন প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—তথ্যের পরিমাণের সঙ্গে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা।

অন্যদিকে ‘ঘুষ.সাইট’-এ মাত্র পাঁচ দিনে ৩ হাজার ৮০০টির বেশি অভিযোগ জমা পড়া এবং প্রায় ৬৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা ঘুষ দাবির তথ্য আসা দেখাচ্ছে, নাগরিকদের মধ্যে এমন তথ্য প্রকাশের চাহিদা রয়েছে। সাইটটিতে কোন দপ্তরে, কোন সেবার জন্য, কোথায় এবং কত টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছে—এসব তথ্য জানানো যায়।

এই ধারণাটি অবশ্য বাংলাদেশে প্রথম নয়। প্রায় দেড় দশক আগে ভারতে শুরু হয়েছিল ‘আই পেইড আ ব্রাইব’ বা ‘আই পেইড আ ব্রাইব’ নামে পরিচিত উদ্যোগ। ২০১০ সালে বেঙ্গালুরুতে জনাগ্রহ সেন্টার ফর সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ডেমোক্রেসি এটি চালু করে। ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, সাইটটিতে ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি ভিজিট এবং প্রায় ৩৬ হাজার ঘুষের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। একই সময় প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, ১ হাজারের বেশি শহর ও নগর থেকে এসব তথ্য এসেছিল এবং উদ্যোগটি বিশ্বের আরও বহু দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া ২০১৭ সালে প্ল্যাটফর্মটিকে জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী উদ্ভাবন পুরস্কার পাওয়ার খবরও প্রকাশ করেছিল।

তবে এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও আছে। ‘ইউরোপিয়ান ইকোনমিক রিভিউ’-এ ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বেনামে ঘুষের অভিজ্ঞতা জানানোর এমন প্ল্যাটফর্ম নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়। গবেষণাটির অন্যতম সিদ্ধান্ত ছিল, শুধু একটি অভিযোগ জানানোর প্ল্যাটফর্ম থাকলেই ঘুষ পদ্ধতিগতভাবে কমে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং ঘুষের পরিমাণ ও ঘটনার স্থান সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য থাকলে নাগরিকেরা কম দুর্নীতিগ্রস্ত সেবা বা কর্মকর্তার বিষয়ে ধারণা পাওয়ার সুযোগ পান।

ভারতের অভিজ্ঞতার পর উগান্ডাতেও ‘আই পেইড আ ব্রাইব’ নামে উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেখানে নাগরিকদের ঘুষের অভিজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি সরকারি সেবার বিভিন্ন খাতে কোথায় ঘুষ চাওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছে। উগান্ডায় অ্যাকশনএইডের প্রকাশিত উপকরণেও এমন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘুষের ঘটনা জানানোর প্রচারের তথ্য পাওয়া যায়।

সিয়েরা লিওনে আবার ‘পে নো ব্রাইব’ নামে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। দেশটির দুর্নীতিবিরোধী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নাগরিকেরা বিনা পরিচয়ে ফোন, মুঠোফোন অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ঘুষের ঘটনা জানাতে পারেন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুলিশ, বিদ্যুৎ, পানি ও পয়োনিষ্কাশনের মতো খাতে পাওয়া তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ভাগ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

নাইজেরিয়াতেও ২০১৭ সালে ‘রিপোর্ট ইয়োরসেলফ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়। দ্য গার্ডিয়ান নাইজেরিয়া ও ‘আফ্রিকা নিউজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, নাগরিকেরা দৈনন্দিন দুর্নীতি ও ঘুষের ঘটনা জানাতে পারতেন। প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল।

কিন্তু আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণটি বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে চলতি আগস্টে ‘ব্রাইবস ডট এফওয়াইআই’ নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নাগরিকেরা বেনামে কোথায়, কোন দপ্তরে এবং কত টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছে, তা জানাতে পারতেন। কিন্তু ১৯ আগস্ট প্ল্যাটফর্মটি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ভারতের এনডিটিভি জানিয়েছে, শেষ ৪৮ ঘণ্টায় ওই সাইটে ৫০ লাখের বেশি অনুরোধ আসে এবং প্রায় ২ লাখ নতুন ব্যবহারকারী যুক্ত হন। উদ্যোক্তারা বলেন, এত বিপুল চাপ সামলানোর মতো প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তাদের ছিল না। একই সঙ্গে এত বড় পরিমাণ সংবেদনশীল তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও তাঁদের ছিল না।

এই ঘটনাটি দেখায়, কোনো ওয়েবসাইট জনপ্রিয় হয়ে ওঠা যেমন সাফল্যের লক্ষণ, তেমনি সেটি বড় ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। বিপুল অভিযোগ এলে তথ্য যাচাই, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, মানহানির অভিযোগ, মিথ্যা তথ্য, সাইবার হামলা এবং আইনি দায়—সবকিছুর চাপ একসঙ্গে সামলাতে হয়।

বাংলাদেশের নতুন উদ্যোগটির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন সামনে আসছে। অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা নাগরিকদের নিরাপদে তথ্য দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু পরিচয় গোপন থাকার কারণে কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে মিথ্যা অভিযোগ করলে সেটি যাচাই করাও কঠিন। আবার কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের পর তা সত্য প্রমাণিত না হলে ক্ষতির দায় কে নেবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

চান্দাবিডি ডট কমে অবশ্য ভুল তথ্য, ব্যক্তিগত পরিচয়, আপত্তিকর ভাষা, ভুল স্থান বা টাকার অঙ্কের মতো বিষয় থাকলে দর্শনার্থীদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। প্রকাশিত অভিযোগ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয় এবং অন্য দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাছে ই-মেইলে পাঠানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত ৫২৫টির বেশি ই-মেইল সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানোর কথা উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।

এখানেই উদ্যোগটির সম্ভাবনা এবং সীমাবদ্ধতা—দুটিই পাশাপাশি দেখা যায়। শুধু অভিযোগের সংখ্যা প্রকাশ করা হলে এটি একসময় একটি অভিযোগের ভাণ্ডারে পরিণত হতে পারে। কিন্তু অভিযোগগুলো যাচাই করে কোন দপ্তরে বেশি ঘুষ চাওয়া হচ্ছে, কোন সেবায় বেশি টাকা দাবি করা হচ্ছে, কোন এলাকায় প্রবণতা বেশি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা গেলে এটি একটি কার্যকর নাগরিক তথ্যভান্ডারে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশে ঘুষের ব্যাপকতার বাস্তবতাও এই উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা বোঝায়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ—টিআইবির ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে বিভিন্ন সেবা খাতে আনুমানিক ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার মনে করেছে, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সুখবর ডটকমকে বলেন, পরিচয় গোপন রেখে ঘুষের অভিজ্ঞতা জানানোর সুযোগ তৈরি হওয়া ইতিবাচক। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সংগৃহীত তথ্য দিয়ে কী করা হচ্ছে তার ওপর। তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানকে জানানো এবং তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে উদ্যোগটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যথায় মানুষ একসময় অভিযোগ জানিয়ে কোনো ফল না পাওয়ার হতাশায় ভুগতে পারে।

‘ঘুষ.সাইট’-এর উদ্যোক্তা সাইফ কবিরও বলছেন, শুধু কত মানুষ অভিযোগ করল, সেটিকে তারা সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখছেন না। তাদের লক্ষ্য, নাগরিকেরা যেন আগে থেকেই সরকারি সেবার প্রকৃত খরচ সম্পর্কে ধারণা পান এবং কেউ ঘুষ চাইলে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। ভবিষ্যতে তথ্যের মান উন্নত করা, দপ্তর ও সেবাভিত্তিক হিসাব তৈরি, জেলাভিত্তিক তথ্য বাড়ানো এবং সাংবাদিক ও গবেষকদের জন্য তথ্য উন্মুক্ত রাখার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

অর্থাৎ তিন দিনে ৩৭৬টি চাঁদার অভিযোগ কিংবা পাঁচ দিনে ৩ হাজার ৮০০টির বেশি ঘুষের অভিযোগ—এই সংখ্যা নিঃসন্দেহে দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো। কিন্তু সংখ্যাই এই উদ্যোগের সাফল্যের শেষ কথা নয়। ভারত, উগান্ডা, কেনিয়া, নাইজেরিয়া ও সিয়েরা লিওনের অভিজ্ঞতা বলছে, নাগরিকের অভিযোগকে কার্যকর জবাবদিহিতে রূপ দিতে হলে তথ্য সংগ্রহের পরবর্তী ধাপটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কোন অভিযোগ যাচাই হলো, কোনটি মিথ্যা প্রমাণিত হলো, কোন সরকারি দপ্তর ব্যবস্থা নিল, কোথায় ঘুষের প্রবণতা কমল এবং কোথায় একই অভিযোগ বারবার আসছে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি নিয়মিত পাওয়া যায়, তখন ‘ঘুষ.সাইট’ ও ‘চান্দাবিডি ডট কম’ শুধু অভিযোগ জানানোর ওয়েবসাইট থাকবে না; এগুলো সরকারি সেবার দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির প্রবণতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক তথ্যভান্ডারে পরিণত হতে পারে।

আর যদি অভিযোগ জমা পড়ার পর সেগুলো শুধু মানচিত্রে সংখ্যা হয়ে থাকে, কোনো যাচাই না হয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাব না আসে এবং অভিযোগকারীরা কোনো পরিবর্তন দেখতে না পান, তাহলে কয়েক হাজার অভিযোগও শেষ পর্যন্ত কেবল একটি বড় সংখ্যাই হয়ে থাকবে। তাই বাংলাদেশের এই উদ্যোগ সফল হবে কি না, তার আসল পরীক্ষা ওয়েবসাইটে কত অভিযোগ জমা পড়ল—সেখানে নয়; বরং সেই তথ্য থেকে বাস্তবে কতটা জবাবদিহি তৈরি হলো, সেটিতেই।