Image description

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে বরফ গলতে শুরু করেছে। গত কয়েক সপ্তাহের ধারাবাহিক কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২১ ও ২২ আগস্ট ভারত সফরে যাচ্ছেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সফরটি দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর সামনে রেখে ঢাকা ও নয়াদিল্লি উভয়পক্ষেই প্রস্তুতি চলছে। সময় স্বল্প হওয়ায় দুই দেশের কর্মকর্তারা সফরের বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

সফর প্রস্তুতির গতি বাড়ে গত ১০ আগস্ট। ওইদিন ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানান। বৈঠক শেষে সেদিনই নয়াদিল্লি যান ত্রিবেদী।

 

 

পরদিন তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। এর পর থেকেই দিল্লি সফর নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই আলোচনা চলছে। ভারতীয় হাইকমিশনারের ঢাকা ফেরার পর সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে তার আরও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতের অবস্থানও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

টানাপড়েনের মধ্যেই নতুন উদ্যোগ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর এমন সময়ে হচ্ছে, যখন দুই দেশের সম্পর্কে বেশ কিছু অস্বস্তিকর ইস্যু রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় বিষয়টি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, বিষয়টি যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে দিল্লি সফরে প্রত্যর্পণ ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে পারে।

এর আগে নয়াদিল্লিতে বসে শেখ হাসিনার বিভিন্ন বক্তব্য নিয়েও ঢাকা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব থেকে অনলাইনে তার বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়। এ ধরনের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করে।

তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় সেই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা স্পষ্ট হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ এবং ভারতীয় হাইকমিশনারের ধারাবাহিক যোগাযোগকে সেই উদ্যোগেরই অংশ হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা।

আলোচনায় থাকবে যেসব বিষয়

দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে— বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা। বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে গঙ্গা ও তিস্তার পানি। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। অন্যদিকে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে প্রায় এক যুগ ধরে কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে পানি ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রত্যাশা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হতে পারে। এ ছাড়া বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ, সীমান্তে হত্যা ও ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।

তারেক রহমানের এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে রাজনৈতিক যোগাযোগ। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ভারতকেও বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের নীতি সমন্বয় করতে হচ্ছে। অন্যদিকে ঢাকা চায়, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও স্বার্থের ভিত্তিতে। পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে গিয়ে নতুন সরকারের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে চায় ঢাকা। এ কারণে মোদি-তারেক বৈঠক শুধু দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কাঠামো নিয়েও রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারে।

সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী আগামীর সময়কে বললেন, ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীদের একটি। বৃহত্তর স্বার্থেই দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরি। এতে দুই দেশের জনগণই উপকৃত হবে। তবে তার মতে, সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। তিনি বলেছেন, ভারতকে পরিবর্তিত বাংলাদেশের বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। পুরনো দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করলে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব হবে না।

সাকিব আলীর ভাষ্য, দুই দেশের সামনে সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। পুরনো হিসাবনিকাশে আটকে না থেকে নতুনভাবে শুরু করতে পারলে উভয় দেশই লাভবান হবে।