ডেঙ্গুজ্বরের সবচেয়ে বড় আঘাত দেশের তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ওপর। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ১৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের মধ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। শুধু আক্রান্ত নয়, মৃতের তালিকায়ও এই বয়সসীমার মানুষের উপস্থিতি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী মানুষের আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে উদ্বেগের। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী মানুষই চলতি বছর ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। এই বয়সসীমার মধ্যে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। বিশেষ করে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা ঝুঁকির শীর্ষে রয়েছেন।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলেন, এডিস মশাজনিত ডেঙ্গুর বড় আঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ছে কর্মক্ষম ব্যক্তিদের ওপর। যাদের ওপর পরিবার, অর্থনীতি ও কর্মযজ্ঞ অনেকটা নির্ভরশীল। ১৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী মানুষের বড় অংশই প্রতিদিন বাড়ির বাইরে বের হন। কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নির্মাণকাজ কিংবা গণপরিবহনে তাদের দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়। অন্যদিকে এডিস মশার প্রজননস্থল শুধু বাড়ির আশপাশে নয়; অফিস, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত স্থাপনা, দোকানপাট কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আশপাশেও তৈরি হতে পারে। ফলে একজন মানুষ ঘরে যতটাই সতর্ক থাকুন না কেন, কর্মস্থল বা চলাচলের জায়গায় মশার সংস্পর্শে এলে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রচার কেবল পরিবারের নারী, শিশু কিংবা বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করেও জোরদার করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়। তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ দিনের বেশিরভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকেন। কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণাধীন ভবন, মার্কেট কিংবা যাতায়াতের বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার প্রজননস্থল থাকলে তারা সহজেই সংক্রমিত হতে পারেন। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কৌশলও মানুষের চলাচলের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
তিনি বলেন, ১৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। কারণ এই বয়সের মানুষ শুধু সংখ্যার দিক থেকে বড় একটি জনগোষ্ঠী নয়, দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তিও। এই বয়সী একজন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শুধু একজন ব্যক্তি অসুস্থ হন না, তার পরিবার ও কর্মক্ষেত্রও এর প্রভাবের মধ্যে পড়ে। আর মৃত্যু হলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও গভীর হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২ হাজার ৪৪৩ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২০ হাজার ৭৬৩ জন। তবে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৫ জন। এখনও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ৬১৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
১৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীরা শনাক্ত-মৃত্যুতে শীর্ষে: চলতি বছরের ডেঙ্গু সংক্রমণের বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ৬৬ শতাংশের বেশি ১৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী। বয়সসীমার মধ্যেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১৪ হাজার ৮৭৮ জন। তার মধ্যে ১৬-২০ বছর বয়সী ২ হাজার ৯৬৯ জন। ২১-২৫ বছর বয়সী ৩ হাজার ১৩১ জন। ২৬-৩০ বছর বয়সী ৩ হাজার ১৪০ জন। ৩১-৩৫ বছর বয়সী ২ হাজার ১৯৭ জন। ৩৬-৪০ বছর বয়সী ১ হাজার ৯৯৭ জন। ৪১-৪৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৪৪৪ জন। এদিকে পরিসংখ্যান বলছে, মৃত্যুর মিছিলেও ১৬-৪৫ বছর বয়সীরা শীর্ষে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হওয়া ৬৫ জনের মধ্যে ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সে মৃত্যু হয়েছে দুজনের। ২১ থেকে ২৫ বছরে ৪ জনের। ২৬ থেকে ৩০ বছরের ১২ জন। ৩১ থেকে ৩৫ বছরের ৭ জন। ৩৬ থেকে ৪০ বছরের ৭ জন। ৪১ থেকে ৪৫ বছরের ৪ জন। সব মিলিয়ে ১৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের মধ্যে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬ জনে। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে ৫৫ শতাংশেরও বেশি মানুষের বয়স ১৬ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে।
২৬-৩০ বছর বয়সীদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি পরিসংখ্যান বলছে, ২৬-৩০ বছর বয়সীরা ডেঙ্গু সংক্রমণের শীর্ষে। একই সঙ্গে মৃত্যুর হিসাবেও তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। চলতি বছরের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত এই বয়সের ১২ জন ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন। মোট মৃত্যুর হিসাবে একক কোনো বয়স শ্রেণিতে সর্বোচ্চ। এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ওপরই পরিবার ও দেশের অর্থনীতি অনেকটা নির্ভরশীল, ফলে তাদের এই অকাল মৃত্যু বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডেঙ্গু রোগীতে শীর্ষে পুরুষ, মৃত্যুতে নারী: আক্রান্তের ক্ষেত্রে পুরুষরা এগিয়ে থাকলেও মৃত্যুর হার নারীদের মধ্যে অনেক বেশি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ২২ হাজার ৪৪৩ জনের মধ্যে ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ, আর ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ নারী। অন্যদিকে মৃতের হিসাবে ৬৩ দশমিক ১ শতাংশ নারী, আর ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের কারণে পুরুষ বেশি আক্রান্ত হলেও নারীদের ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা বা চিকিৎসায় দেরির কারণে মৃত্যুর হার বেশি হচ্ছে।
জ্বর কমলেই ডেঙ্গুর বিপদ শেষ নয়: ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো রোগী ও স্বজনদের অসচেতনতা। জ্বর শুরু হলে অনেকেই প্রথমে এটিকে সাধারণ জ্বর হিসেবে ধরে নেন। পরীক্ষা করাতে দেরি করেন কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে নিজে থেকে ওষুধ সেবন করেন। আবার জ্বর কমে যাওয়ার পর অনেক রোগী মনে করেন বিপদ কেটে গেছে; কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এই সময়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই জ্বরের সঙ্গে শরীরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সরকারের জাতীয় ডেঙ্গু চিকিৎসা নির্দেশিকাতেও ডেঙ্গু রোগীর ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকির লক্ষণ শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়া মানেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমে গেছে—এমন নয়। যতদিন এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে আসবে না, ততদিন নতুন সংক্রমণের আশঙ্কা থেকেই যাবে।
বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কার্যকর ভেক্টর কন্ট্রোল। কোথায় এডিসের প্রজনন হচ্ছে, সেটি নিয়মিত শনাক্ত করে উৎস ধ্বংস করতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে বা মশা মারার ওষুধ ছিটিয়ে স্থায়ীভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বাড়ির পাশাপাশি অফিস, কারখানা, নির্মাণাধীন ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণেও নিয়মিত নজরদারি করতে হবে।
তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ—জ্বর কমে গেলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমার পর রোগীর অবস্থা খারাপ হতে পারে। তাই জ্বরের শুরু থেকেই রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রোগীর স্বজনদেরও ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।