Image description
♦ ১৫ বছরে ২ শতাধিক দুর্ঘটনা ♦ নিহত ২৫০

পুরোনো জাহাজ কেটে পাওয়া প্রতি কেজি স্ক্র্যাপ লোহার বর্তমান বাজারমূল্য ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা। আর জাহাজভাঙা শিল্পে ব্যবহৃত এক একটি মুখের মাস্কের দাম আকার, ধরন ও মানভেদে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সে হিসেবে ৬০-৬৫ কেজি লোহার দামে কেনা একটি মাস্কও অনেক দিন মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে। কিন্তু এ মাস্ক ব্যবহার না করার কারণে বছরের পর বছর ঝরে যাচ্ছে জাহাজভাঙা শিল্পে কর্মরত অনেক শ্রমিকের অমূল্য তাজা প্রাণ। এসব শ্রমিকের প্রাণের মূল্য যেন লোহার চেয়েও কম!

গত দেড় দশকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোয় ছোটবড় ২ শতাধিক দুর্ঘটনায় অন্তত ২৫০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। যাঁদের অনেকের তথ্য গোপনেরও অভিযোগ আছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫ শতাধিক শ্রমিক। সর্বশেষ শুক্রবার সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে একটি স্ক্র্যাপ জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে নিমেষেই ঝরে গেছে ৯ শ্রমিকের প্রাণ। এর আগেও বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাহাজভাঙা শিল্পের উদ্যোক্তারা একটি ইয়ার্ড কিংবা স্ক্র্যাপ জাহাজ কিনতে শতকোটি টাকা ব্যয় করলেও শ্রমিকদের জীবন রক্ষাকারী স্বল্পমূল্যের নিরাপত্তা সরঞ্জাম কিনতে উদাসীন। কিছু ইয়ার্ডে এসব সরঞ্জাম ব্যবহার হলেও অনেক ইয়ার্ডে শ্রমিকদের এসব নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। মালিকপক্ষের মনোযোগ থাকে কেবল লোহা কাটা কিংবা অন্যান্য সরঞ্জামের দিকে।

জানা গেছে, একসময় এলএনজি বহনকারী দক্ষিণ কোরিয়ার পতাকাবাহী আনুমানিক ৩০ হাজার টন ওজনের ‘এমভি রাশি’ নামের স্ক্র্যাপ জাহাজটি গত বছরের জুলাইয়ে কিনে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি উপকূলে নিজেদের গ্রিনইয়ার্ডে আনে ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং। গত এক বছর পরিবেশ, বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার অনুমতি সাপেক্ষে জাহাজটির কিছু অংশ কাটা হয়েছে। কিন্তু শুক্রবার সকালে জাহাজটির ‘ব্যালাস্ট ট্যাংক’ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ শ্রমিক। এখনো চিকিৎসাধীন দুজন। জাহাজভাঙা শ্রমিকদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ তৈরি, স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন উন্নয়ন সংস্থা ইপসার সিনিয়র কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী শাহীন। তিনি দীর্ঘদিন ব্রাসেলসভিত্তিক এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত। দুর্ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ফেরদৌস শিপব্রেকিং একটি অত্যাধুনিক গ্রিনইয়ার্ড। উনাদের অবকাঠামোগত কোনো ঘাটতি নেই। সব নিয়ম মেনে গ্রিনইয়ার্ড সনদ পেয়েছে। তাদের পর্যাপ্ত মাস্কও কিনতে বলা হয়েছে, কিনেছেও। কিন্তু তারা শ্রমিকদের মাস্ক না দিয়ে কাজে পাঠিয়েছে। ছুটির দিনে কাজ করিয়েছে। এটা কোনোভাবে কমপ্লায়েন্সের আওতায় পড়ে না।’

তিনি বলেন, ‘একসময় যে-যার খুশিমতো জাহাজ কাটলেও এখন সে সুযোগ নেই। এখন সব নিয়মনীতি মেনেই জাহাজ কাটতে হয়। এলএনজিবাহী জাহাজগুলো ক্রিটিক্যাল স্ট্রাকচারের। এগুলো গ্যাসমুক্ত করতে হয়। এখানে করা হয়নি। এমন দুর্ঘটনা ঘটলে বুঝতে হবে মালিকপক্ষের উদাসীনতা আছে। এখানে শ্রমিকের দোষ নেই। কোনো শ্রমিক মাস্ক না পরলে তাঁকে কাজে না নিলেই হয়। এটা জাহাজভাঙার দুর্ঘটনায় এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্যমতে গত দেড় দশকে জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোয় ছোটবড় ২ শতাধিক দুর্ঘটনায় অন্তত আড়াই শ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে সালে ৩৪ দুর্ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু হয়, আহত হন ২৮ জন। ২০২৪ সালে সালে ২৮ দুর্ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু হয়, আহত হন ৩৬ জন। ২০২৫ সালে ৪৮ দুর্ঘটনায় চারজনের মৃত্যু ও আহত হন ৫৮ জন। এ ছাড়া ২০২০ সালে ১০ জন, ২০১৯ সালে ২২ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৭ সালে ১৮ জন ও ২০১৬ সালে ১৮ জন শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

সংস্থাটির সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইয়ার্ডগুলোয় ২৮ দুর্ঘটনায় তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়, আহত হন ২৫ জন। এসব দুর্ঘটনার ৮০ শতাংশ ঘটেছে ওপর থেকে গার্ডার কিংবা অন্যান্য ভারী বস্তু পড়ে, ক্রেন হুক খোলা এবং গ্যাস লিকেজ ও বিস্ফোরণের কারণে। দুর্ঘটনার পেছনে অনিরাপদ আচরণ ও কর্মপরিবেশ, সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাব, তদারকির ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবকে দায়ী করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্যমতে একসময় সীতাকুণ্ড উপকূলে ১৩০টির মতো জাহাজভাঙা ইয়ার্ড থাকলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিতে গ্রিনইয়ার্ড নিশ্চিত করতে না পেরে বেশির ভাগ ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে গেছে। ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো দেশে গ্রিনইয়ার্ডের প্রচলন শুরু হয়। বর্তমানে হংকং কনভেনশন অনুযায়ী দেশে গ্রিন সনদপ্রাপ্ত ইয়ার্ডের সংখ্যা ২৫টি। চলতি বছর আরও কয়েকটি ইয়ার্ড গ্রিন সনদ অর্জন করতে পারে। দিনদিন এমন ইয়ার্ডে বিনিয়োগ বাড়ছে।

বিএসবিআরএর তথ্যমতে ২০২০ সালের পর থেকে গ্রিনইয়ার্ডে বিপুল বিনিয়োগ করছেন উদ্যোক্তারা। গত ছয় বছরে যেসব ইয়ার্ড গ্রিন সনদ পেয়েছে সেগুলোর অবকাঠামো ও অন্যান্য খাতে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন তাঁরা। এসব অর্থ দিয়ে আধুনিক ক্রেন, ভারী যন্ত্রপাতি, উন্নত মেঝে, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত মানোন্নয়ন এবং শ্রমিক নিরাপত্তা অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হয়েছে।

তবে বিলস চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সমন্বয়ক ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, ‘এ খাতে বিনিয়োগ বাড়লেও মূল বিনিয়োগ হচ্ছে অবকাঠামো খাতে। কিন্তু এখনো কাজ করছেন পুরোনো শ্রমিকরা। তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। একটা প্রশিক্ষণকেন্দ্রের জন্য আমরা অনেক দিন দাবি জানিয়ে আসছি। যাতে এ খাতের প্রত্যেক শ্রমিক প্রশিক্ষিত হন। প্রশিক্ষিত শ্রমিক হলে দুর্ঘটনা অনেক কমবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গ্রিন সনদ অর্জনে যেসব শর্ত পূরণ করতে হয় সেগুলো যথাযথ পালনও করতে হবে।’ শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ চার দাবিতে গত সপ্তাহেও চট্টগ্রামে মানববন্ধন করেছিল জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরাম। সংগঠনটির আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, ‘মালিকপক্ষের উদাসীনতায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটে শ্রমিকের মৃত্যু হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক শিরোনাম হচ্ছে। এটা সম্ভাবনাময় খাতটির জন্য শুভ হবে না।’