দীপ্ত টিভির সম্প্রচার কর্মকর্তা তানজিল জাহান ইসলাম তামীম হত্যার মামলা থেকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিট থেকে তার নাম বাদ দেওয়ায় আদালত তাকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়।
তামীমের পরিবারের পক্ষ থেকে তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে করা নারাজি আবেদন আদালত নিষ্পত্তি করার আগেই রবিউলকে অব্যহতি দেওয়া হয়। এতে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে নিহতের পরিবার।
ঢাকার রামপুরা মহানগর প্রজেক্ট এলাকায় একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে ডেভেলপার কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষে ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর খুন হন তামীম। ঘটনার পর তার বাবা সুলতান আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ মামুনকে প্রধান আসামি এবং ‘প্লিজেন্ট প্রোপার্টিজ’-এর তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক রবিউলকে তিন নম্বর আসামি করা হয়।
মামলাটির প্রাথমিক তদন্ত হাতিরঝিল থানা পুলিশ করলেও পরে তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে স্থানান্তর করা হয়। পিবিআই আদালতে যে চার্জশিট জমা দেয়, তাতে ১৩ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও রবিউল ও মামুনের নাম বাদ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে পিবিআইর তদন্ত কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর মো. জাকারিয়া আলম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঘটনায় কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় মোহাম্মদ মামুন ও শেখ রবিউল আলমসহ কয়েকজনের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’
বাদীর নারাজি আবেদন উপেক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর বিষয়ে জানতে চাইলে জাকারিয়া বলেন, ‘আমি তদন্তে যা পেয়েছি, সেটাই জমা দিয়েছি। আর অনেক দিন আগের ঘটনা হওয়ায় অনেক কিছু এখন আমার স্পষ্ট মনে নেই।’
এমনকি প্রতিবেদনটি ঠিক কোন তারিখে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছিল, তা-ও তিনি বলতে পারেননি।
তদন্তের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে তামীমের বাবা সুলতান আহমেদ বলেন, ঘটনার মূল জায়গাতেই হাত দেওয়া হয়নি। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘বিরোধটা ছিল ফ্ল্যাট বিক্রেতা আর ফ্ল্যাটের দখল নেওয়া মানুষের মধ্যে। মূল ঘটনা তাদের নিয়েই। কিন্তু তাদের নামই চার্জশিট থেকে গায়েব করে দেওয়া হলো। আমরা মানসিকভাবে পুরো ভেঙে পড়েছি। টাকা আর ক্ষমতার জোরে সব কিছু ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’
ঘটনার পটভূমি বর্ণনা করে সুলতান জানান, মহানগর প্রজেক্টের ডি-ব্লকে নিজেদের যৌথ জমিতে নয়তলা ভবন তৈরির জন্য তিনিসহ তিনজন জমির মালিক প্লিজেন্ট প্রোপার্টিজের সঙ্গে চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী ২৭টি ফ্ল্যাটের মধ্যে প্রত্যেক জমির মালিকের পাঁচটি করে ফ্ল্যাট পাওয়ার কথা থাকলেও তিনি পান মাত্র দুটি ফ্ল্যাট।
সুলতানের অভিযোগ, রবিউল বাকি তিনটি ফ্ল্যাটের মধ্যে একটি ফ্ল্যাট মামুনের শাশুড়ির কাছে বিক্রি করে দেন এবং অন্য দুটি ফ্ল্যাট প্লিজেন্ট প্রপার্টিজের দখলে রাখেন। ঘটনার দিন তামীম ও তার বাবা ওই দুটি ফ্ল্যাটে ভেতরের কাজ (ইন্টেরিয়ার) করাতে গেলে প্লিজেন্ট প্রোপার্টিজের কর্মচারীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে গুরুতর আহত হন তামীম। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সুলতান দাবি করেন, হামলার সময় রবিউল নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনার পরপরই সংঘর্ষের একটি ভিডিও ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে রহস্যজনকভাবে মুছে যায়। মামলায় নাম আসার পর সাময়িক বরখাস্ত হওয়া মামুন দাবি করেন, মূল বিরোধ ছিল জমির মালিক আর ডেভেলপার কোম্পানির। ঘটনার সময় তিনি নিজের ফ্ল্যাটের ভেতরেই ছিলেন।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে মামুনের দাবি, সেটি ছিল তার ঘরের সিসিটিভির ফুটেজ। কেউ একজন তার বাসায় ঢুকে ফুটেজ থাকা ডিভিআর মেশিন চুরি করে নিয়ে গেছে।
তবে হাতিরঝিল থানার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আরাফাত বিন ইউসুফ জানান, তিনি তদন্তের সময় সেই ডিভিআর পাননি।
ঘটনার দুই দিন পর তেজগাঁও বিভাগের তৎকালীন উপ-পুলিশ কমিশনার রুহুল কবির খান জানিয়েছিলেন, প্রাথমিক তদন্তে মামুন ও বিএনপি নেতা রবিউলের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাতিরঝিল থানা পুলিশ শুরুতে মো. কুরবান আলী, মাহিন, বন্ধন ও রাসেল নামের চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়। কিন্তু মামলাটি পিবিআই’তে যাওয়ার পর চিত্র বদলে যায়।
পিবিআইর তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ মনে করতে পারেননি। এমনকি হারিয়ে যাওয়া ডিভিআর বা সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
মামলা থেকে নাম বাদ পড়ার পর মামুন নিজের চাকরি ফিরে পান। তার সাময়িক বরখাস্তের সময়টুকুও চাকরির মেয়াদ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তিনি বকেয়া বেতনসহ সব সুবিধা পান।
অন্যদিকে, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বিএনপি রবিউলের দলীয় পদ স্থগিত করে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার পদ স্থগিত থাকবে। তবে পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর বিএনপি তাকে ঢাকা-১০ আসনে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে।
এক বিবৃতিতে রবিউল দাবি করেন, ঘটনাটি শুধুই ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে ঘটেছে, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি নিজে ঘটনাস্থলে থাকার কথা অস্বীকার ও জোরপূর্বক দখল বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
পিবিআই’র দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে তামীমের বাবা আদালতে নারাজি আবেদন দিলেও তা শুনানির আগেই আসামিদের অব্যহতি দিয়ে দেওয়া হয়।
তামীমের ভাই শামভিল জাহান জানান, তাদের পরিবার এখন আদালতে নারাজি আবেদনের শুনানির অপেক্ষায় আছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নারাজি দিয়েছি, এখন শুনানির অপেক্ষা করছি। আদালতের সিদ্ধান্ত দেখে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’
রবিউল ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে শামভিল বলেন, ‘এখন বলা কঠিন। তারা এখন ক্ষমতায় আছেন, এ বিষয়ে বেশি কিছু বলতে আমরা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছি।’
মামুনের চাকরিতে ফেরার বিষয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘তিনি এখন একটি প্রভাবশালী পদে আছেন। যেকোনো সময় আমাদের ওপর আঘাত আসতে পারে। দেশের আইনশৃঙ্খলা এখন তাদের হাতে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মামুনের ফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। অন্যদিকে রবিউলের ফোনে যোগাযোগ করা হলে অন্য এক ব্যক্তি ফোন ধরে জানান, ‘তিনি একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত আছেন।’